গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া 'রিং-টেইল্ড' প্রজাতির দুটি লেমুর ভারতে পাচার হওয়ার তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। বন্যপ্রাণী পাচারের সঙ্গে জড়িত আটজনকে গ্রেপ্তারের পর এই তথ্য উদ্ঘাটিত হলেও, লেমুর দুটি ভারতের গুজরাটে আম্বানি পরিবারের মালিকানাধীন 'ভানতারা' বন্যপ্রাণী কেন্দ্রে রয়েছে কি না—তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি সংস্থাটি। সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) ছুফি উল্লাহ বলেন, 'প্রাণী দুটি চুরির পর পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে এরপর সেগুলো ভারতে কোথায় নেওয়া হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি।'
সম্প্রতি কিছু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে সিআইডির বরাতে দাবি করা হয় যে, গাজীপুর থেকে চুরি হওয়া লেমুর দুটি হাতবদল হয়ে প্রায় ৪৮ লাখ রুপিতে আম্বানিদের ভানতারা বন্যপ্রাণী কেন্দ্রে বিক্রি হয়েছে। তবে সিআইডি কর্মকর্তা ছুফি উল্লাহ এই দাবি নাকচ করে বলেন, কোনো ধরনের ডিএনএ বা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এবং পাচারের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার ছাড়া ভানতারায় থাকা লেমুরগুলোই গাজীপুরের কি না, তা নিশ্চিত করার কোনো সুযোগ নেই।
ছুফি উল্লাহ টিবিএসকে বলেন, 'পাচার হওয়া লেমুরগুলো কোনো ডিএনএ প্রোফাইলিং করেনি কর্তৃপক্ষ। যে কারণে ভানতারায় থাকা লেমুরের ডিএনএর সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা সম্ভব হচ্ছে না। তবে উদ্ধার হওয়া যে লেমুরটি পরে মারা গিয়েছিল, সেটির একটি নমুন সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষের কাছে ছিল। যা পরে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য বন অধিদপ্তরের ল্যাবরটরিতে পাঠানো হয়েছে। তবে সেটির রিপোর্ট এখনো পাওয়া যায়নি।'
তিনি আরও জানান, 'লেমুরগুলো প্রথম কারা বাংলাদেশে আমদানি করেছিল সেই তথ্য কাস্টমস অধিদপ্তরের কাছে দুই দফায় চিঠি দিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা জানা যায়নি। যে কারণে এই পাচারের সঙ্গে যুক্ত অন্যদের এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।'
পাচার হওয়া লেমুর দুইটি ভানতারায় পৌঁছেছে—গণমাধ্যমের এই দাবির বিষয়ে আম্বানি পরিবারের মালিকানাধীন 'ভানতারা'র কাছে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকালে ই-মেইলের মাধ্যমে জানতে চেয়েছে টিবিএস। এর কয়েক ঘণ্টা পর ভান্তার তাদের ফেসবুক পেইজে এই বিষয়ে একটি পোস্ট দেয়।
পোস্টে ভানতারা জানায়, তাদের প্রতিষ্ঠানে থাকা প্রাণীগুলো ভারতীয় আইন ও কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি মেনেই রাখা হয়েছে। তারা কোনো বন্যপ্রাণী চুরির সঙ্গে জড়িত নয় এবং এ বিষয়ে কোনো তদন্ত সংস্থার কাছ থেকে কোনো নোটিশও পায়নি। তবে পুরো বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করার জন্য ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশের কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যেকোনো ধরনের আইনি সহযোগিতা ও ডিএনএ পরীক্ষাসহ বৈজ্ঞানিক যাচাই-বাছাইকে তারা স্বাগত জানিয়েছে।
যেভাবে চুরি হয়
'রিঙ-টেইলড' বা ডোরাকাটা লেজের লেমুর বাংলাদেশের স্থানীয় কোনো প্রাণী নয়। এদের আদি নিবাস আফ্রিকা মহাদেশের মাদাগাস্কার দ্বীপ। সেখান থেকে ধরে নিয়ে চোরাকারবারিরা প্রাণীগুলোকে বিভিন্ন দেশে পাচার করে। ২০১৮ সালে তেমনি পাচারের সময় ম্যাকাও, ময়ূরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির সঙ্গে লেমুর দুইটি ধরা পড়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। পরে সেগুলোকে গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত সাফারি পার্কে পাঠানো হয়।
সিআইডির কর্মকর্তা ছুফি উল্লাহ জানান, গাজীপুর সাফারি পার্কে থাকার সময় লেমুর দুইটি এক জোড়া পুরুষ বাচ্চার জন্ম দেয়। তবে ২০২২ সালের শুরুতে একটি বাচ্চা মারা যায়। এর প্রায় তিন বছর পর ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ রাতে বাচ্চাসহ লেমুর তিনটি চুরি হয়। এই ঘটনায় সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিসুর রহমান গাজীপুরের শ্রীপুর থানায় একটি মামলা করেন। মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে সিআইডি।
সিআইডি সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে বাসিন্দা নিপেল মাহমুদ (৩৩) আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ওই সাফারি পার্কে কাজ করতেন। একই এলাকায় বাড়ি হওয়ায় নিপেলের সঙ্গে সাফারি পার্কে গিয়ে প্রায়ই দেখা করতেন বন্যপ্রাণী পাচারকারী জুয়েল মিয়া (৪২)। তিনি নিপেলের কাছে লেমুর কেনা-বেচার কথা বলেন। নিপেল রাজী হলে ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ রাতে জুয়েলসহ অজ্ঞাত এক ব্যক্তি সাফারি পার্কে গিয়ে লেমুর তিনটি চুরি করে এবং জুয়েলের বাড়ি গফরগাঁওয়ে নিয়ে রাখে।
পরে জুয়েলের কাছ থেকে ৭ লাখ টাকায় লেমুরগুলো কিনে নেন দেলোয়ার হোসেন তাওসিফ (২২) নামের এক পাখি ব্যবসায়ী। তাওসিফ পরবর্তীতে ৯ লাখ টাকায় বাবলু ও শিপলু নামের দুই ব্যক্তির কাছে প্রাণীগুলো বিক্রি করেন। অভিযুক্তদের মধ্যে বাবলুর বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের এবং শিপলুর বাড়ি মুম্বাইয়ে বলে জানা গেছে। এই দুজন দুটি লেমুর অবৈধভাবে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করলেও একটি বাচ্চা ফেলে রেখে যান। পরে ২০২৫ সালের ১৮ এপ্রিল রাজধানীর সদরঘাটের শ্যামবাজার ঘাট এলাকা থেকে পরিত্যক্ত খাঁচায় বন্দি অবস্থায় সেই বাচ্চা লেমুরটি উদ্ধার করা হয়। সাফারি পার্কে ফেরত পাঠানোর কয়েক মাস পর সেটিও মারা যায়।
পাচারের এই ঘটনায় এ পর্যন্ত জহির মিয়া, নিপেল মাহমুদ, মো. দেলোয়ার হোসেন তাওসিফ, জুয়েল মিয়া, মো. ইসমাইল হোসেন হৃদয়, সাব্বির হোসেন তপন, মজনু মিয়া ও তফাজ্জাল হোসেন নামের আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এদের মধ্যে সাতজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তবে তদন্তে এই পাচারের সঙ্গে বাবলু ও শিপলু নামের দুই ভারতীয় নাগরিকের নাম উঠে এলেও তাদের এখনো শনাক্ত করতে পারেনি সিআইডি। ছুফি উল্লাহ টিবিএসকে বলেন, 'জিজ্ঞাসাবাদে ওই দুইজনের নাম আমরা পেয়েছি। কিন্তু তাদের কোনো পাসপোর্ট বা আধার কার্ড বা ছবি না পাওয়ায় তাদের এখনো শনাক্ত করা যায়নি। তারা ভারতীয় কিনা সেটাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে লেমুরগুলো চুরি হওয়ার সময় বাবলু নামের এক ব্যক্তি ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন বলে আমরা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানতে পেরেছি।'