আনাদোলু খবর: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতায় এখনো নানা চাপে রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। এর মধ্যেও পণ্য বাণিজ্যে গতি বাড়ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের কারণে সাম্প্রতিক সময় ইলেকট্রনিক উপকরণের চাহিদা বেড়েছে। এতে আন্তর্জাতিক পণ্য বাণিজ্যও চাঙ্গা হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সর্বশেষ গুডস ট্রেড ব্যারোমিটার বা পণ্য বাণিজ্য সূচকে এ চিত্র উঠে এসেছে।
সংস্থাটি গত বুধবার জানায়, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়েও বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্য শক্তিশালী ছিল। জুলাইয়ে ডব্লিউটিওর পণ্য বাণিজ্য ব্যারোমিটারের সূচক বেড়ে ১০২ পয়েন্টে উঠেছে। জুনে এ সূচক ছিল ১০১ দশমিক ৭ পয়েন্ট।
ডব্লিউটিওর এ সূচকে ১০০ পয়েন্টকে স্বাভাবিক প্রবণতার মাত্রা বা বেজলাইন হিসেবে ধরা হয়। সূচক ১০০-এর ওপরে থাকলে বোঝায়, পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ স্বাভাবিক প্রবণতার চেয়ে বেশি। ১০০-এর নিচে নামলে বাণিজ্য কার্যক্রম দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ডব্লিউটিও বলছে, এআই প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত ইলেকট্রনিক উপকরণ ও অন্যান্য পণ্যের চাহিদা শক্তিশালী রয়েছে। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ায় চিপ, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন উপকরণের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও বাড়ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাবের একটি অংশ সামাল দেয়া সম্ভব হচ্ছে।
ডব্লিউটিওর বাণিজ্য ব্যারোমিটারের বিভিন্ন উপসূচকের মধ্যে ইলেকট্রনিক উপকরণে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। জুলাইয়ে এ সূচক ছিল ১০৪ দশমিক ৯ পয়েন্ট। এ সময় এআই প্রযুক্তি বিকাশ ও এর অবকাঠামো তৈরিতে প্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। এর প্রভাব বৈশ্বিক পণ্য আমদানি-রফতানিতেও পড়ছে।
ডব্লিউটিও বলছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের প্রভাব দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) বাণিজ্য পরিসংখ্যানে আরো স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে। পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশের পর সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাবের মাত্রা আরো পরিষ্কার হবে।
২০২৬ সালে ডব্লিউটিও বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ১ দশমিক ৯ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেশি থাকলে প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি।
এআই খাতে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্যের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ডব্লিউটিওর হিসাবে, এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ অব্যাহত থাকলে পণ্য বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি অতিরিক্ত দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়তে পারে।
অর্থাৎ বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর একদিকে যুদ্ধ, জ্বালানি ব্যয় ও বাণিজ্যনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তার চাপ রয়েছে। অন্যদিকে এআই প্রযুক্তি নতুন ধরনের পণ্যের চাহিদা তৈরি করছে। ফলে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যে একই সময় চাপ ও সম্ভাবনা দুই ধরনের প্রবণতাই দেখা যাচ্ছে।
২০২৪ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকেও আন্তর্জাতিক পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়তে দেখা গিয়েছিল। সে সময় বাণিজ্যের পরিমাণ ২০২২ সালের রেকর্ড মাত্রার কাছাকাছি ছিল এবং ২০২৩ সালের তুলনায় বেশি ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব বাণিজ্যে এখন শুধু পণ্যের দাম, চাহিদা কিংবা উৎপাদন সক্ষমতাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কোন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করা হবে, কোন দেশ থেকে কাঁচামাল আনা হবে এবং কোন পথে পণ্য পরিবহন করা হবে, এসব সিদ্ধান্তেও ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের প্রভাব বাড়ছে। ফলে কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তন আসছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এর বড় উদাহরণ। এসব ঘটনার কারণে বিভিন্ন দেশ আমদানির উৎস ও সরবরাহপথে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। ডব্লিউটিওর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বৈশ্বিক বাণিজ্যে এমন বিভাজনের প্রবণতা নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
ফলে ‘ফ্রেন্ড-শোরিং’ বা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার প্রবণতা বাড়ছে। এতে সরবরাহের ঝুঁকি কিছুটা কমলেও উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। কারণ সবচেয়ে কম খরচের উৎসের পরিবর্তে অনেক সময় নিরাপদ বা মিত্র দেশকে বেছে নিতে হচ্ছে।
সমুদ্রপথেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। হরমুজ, লোহিত সাগর ও কৃষ্ণ সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে সংঘাত ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় জাহাজ চলাচলের ব্যয় ও অনিশ্চয়তা বেড়েছে। সামুদ্রিক পরিবহন খাতের ১৮টি দেশের একটি জোটও সতর্ক করেছে, এসব সংকট বৈশ্বিক বাণিজ্যের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।