দেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত সাত মাসে দেশের বিভিন্ন থানায় অন্তত ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। সে হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে ২ হাজার ১৪৫ জনের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
নিখোঁজ শিশুদের অনেকে পরে উদ্ধার হলেও কতজন উদ্ধার হয়েছে এবং কতজন এখনো নিখোঁজ—এর পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ পরিসংখ্যান নিয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা। এদিকে সন্তান হারিয়ে অনেক পরিবারকে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
একাত্তর টিভির এক বিশেষ প্রতিবেদনে নিখোঁজ শিশুদের পরিবারগুলোর দুর্ভোগ, শিশু উদ্ধারে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দীর্ঘদিন পর পরিবারের কাছে ফিরে আসার নানা ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।
সন্তান হারিয়ে দিশেহারা পরিবার
প্রতিবেদনে চার বছর বয়সী রূপার পরিবারের কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রায় এক বছর আগে খেলতে বের হয়ে আর বাড়ি ফেরেনি শিশুটি। রূপার বড় ভাই রিফাত এখনো বোনকে ফিরে পাওয়ার আশায় সাইকেলের পেছনের আসনটি খালি রেখেই ঘোরে।
সন্তানের সন্ধানে পরিবারটি একাধিকবার থানায় যোগাযোগ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রূপার মা দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেছেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুটির ছবি ও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
প্রযুক্তির সহায়তায় উদ্ধার
তবে নিখোঁজ সব শিশুর গল্প একই রকম নয়। প্রতিবেদনে পাঁচ বছরের মুসকান ও আট বছরের সাইফকে প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণের একটি ঘটনা তুলে ধরা হয়। তাদের একজন হোটেল কর্মচারী অপহরণ করেছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
মুসকানের বাবা থানায় জিডি করার পাশাপাশি নিখোঁজ শিশু অনুসন্ধানের টোল-ফ্রি প্ল্যাটফর্ম ‘মুন অ্যালার্ট’-এর ১৩২১৯ নম্বরে যোগাযোগ করেন। এরপর রাজধানীজুড়ে অ্যালার্ট জারি করা হয়। সদরঘাট টার্মিনালের ডিজিটাল বিলবোর্ডেও শিশুটির ছবি প্রচার করা হয়।
এতে চাপের মুখে অপহরণকারীরা শিশুটিকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরে মুসকানকে ফিরে পান তার বাবা।
আশ্রয়কেন্দ্রে কাটছে দীর্ঘ সময়
নিখোঁজের পর উদ্ধার হওয়া সব শিশু অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের কাছে ফিরতে পারে না। পরিচয় বা পরিবারের সন্ধান না পাওয়ায় অনেক শিশুকে বিভিন্ন শেল্টার হোমে থাকতে হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবারের সঙ্গে বাস থেকে হারিয়ে যাওয়া হালিমা নামের এক শিশু দীর্ঘ আট বছর ধরে একটি শেল্টার হোমে রয়েছে। পরিবারের কাছে ফেরার অপেক্ষায় কেটেছে তার শৈশবের বড় একটি সময়।
অন্যদিকে, নুরুন্নাহার নামের আরেক শিশু মাত্র দুটি শব্দ মনে রাখতে পেরেছিল। স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় সেই তথ্যের সূত্র ধরে দীর্ঘ আট বছর পর তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।
নিখোঁজের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টাই গুরুত্বপূর্ণ
সংশ্লিষ্টদের মতে, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়কে বিশ্বজুড়ে ‘গোল্ডেন আওয়ার্স’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নিখোঁজ হওয়ার পর যত দ্রুত অনুসন্ধান শুরু করা যায় এবং শিশুটির ছবি ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য যত দ্রুত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাকে দ্রুত উদ্ধার করার সম্ভাবনাও তত বাড়ে।
এ কারণে শিশু নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থানায় জিডি করার পাশাপাশি ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধান প্ল্যাটফর্মে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: একাত্তর টিভি