বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন।। বাংলাদেশের মাঠ-ঘাট, চরাঞ্চল ও পরিত্যক্ত জমিতে সাধারণত চোখে পড়ে লম্বা ও ঝোপালো এক ধরনের ঘাস। স্থানীয়ভাবে বিন্না, বেন্না, খসখস বা ছন নামে পরিচিত এই ঘাসের বৈজ্ঞানিক নাম ভেটিভার। সাধারণ দেখতে হলেও ভূমিক্ষয়, পাহাড়ধস ও নদীতীর রক্ষায় এর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরেই মাটির ক্ষয়রোধ ও ঢাল সুরক্ষায় ভেটিভার বা বিন্না ঘাস ব্যবহার করা হচ্ছে। এবার বাংলাদেশেও এর সম্ভাব্য ব্যবহার বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এ জন্য কোন কোন প্রকল্পে এই ঘাস ব্যবহার করা যায়, তা যাচাই করতে সম্প্রতি একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে বিন্না ঘাস ব্যবহারের জন্য একটি গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বিন্না ঘাস দেখতে অনেকটা সাধারণ লম্বা ঘাসের মতো। এটি বহুবর্ষজীবী এবং সাধারণত ঘন ঝোপের মতো বেড়ে ওঠে। এর উচ্চতা প্রায় দেড় থেকে তিন মিটার পর্যন্ত হতে পারে।
তবে এই ঘাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এর শিকড়। গবেষকদের মতে, বিন্না ঘাসের শিকড় অত্যন্ত শক্তিশালী এবং মাটির গভীরে দুই থেকে তিন মিটার, কখনো চার মিটার পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও দীর্ঘদিনের গবেষক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলামের মতে, ঘাসটির শিকড় দ্রুত মাটির গভীরে গিয়ে শক্তভাবে মাটিকে আঁকড়ে ধরে। ফলে মাটির স্তরগুলো অনেকটা প্রাকৃতিক জালের মতো আটকে থাকে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রিন্সিপাল এক্সপেরিমেন্টাল অফিসার মোহাম্মদ আব্দুর রহিমও মনে করেন, দেখতে সাধারণ হলেও বিন্না ঘাসের শিকড়ের কার্যকারিতা অসাধারণ। মাটির ভেতরে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা শিকড় ভূমিক্ষয় ঠেকাতে সহায়তা করে।
বৃষ্টির সময় ঢাল, বাঁধ কিংবা রাস্তার পাশ দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ার সময় মাটি ধুয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ ধরনের স্থানে বিন্না ঘাসের ঘন শিকড় মাটিকে ধরে রাখতে পারে।
থাইল্যান্ড, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ব্রাজিল, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে রাস্তার পাশের ঢাল, নদীতীর, বাঁধ, পাহাড়ি এলাকা ও কৃষিজমি সুরক্ষায় ভেটিভার ব্যবহারের নজির রয়েছে।
গবেষকদের মতে, রোপণের চার থেকে ছয় মাসের মধ্যেই এর শিকড় মাটির গভীরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ঢাল, বাঁধ কিংবা মাটির ক্ষয়রোধে এটি কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সব ধরনের জায়গায় বিন্না ঘাস ব্যবহার করা যাবে না। খরস্রোতা নদীর তীব্র স্রোত বা বড় ধরনের ভাঙনের ক্ষেত্রে শুধু ঘাস দিয়ে বাঁধ রক্ষা সম্ভব নয়। সেখানে জিওব্যাগ, কংক্রিট ব্লক, রড বা অন্যান্য প্রকৌশলগত ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন এলাকায় খাল খননের কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। খাল খননের পর পাড়ের মাটি বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যাওয়া এবং ভরাট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খালের পাড়ে উপযুক্তভাবে বিন্না ঘাস রোপণ করলে মাটি ধরে রাখা এবং ক্ষয় কমানো সম্ভব হতে পারে। একইভাবে বড় সড়কের পাশের মাটি, বাঁধ ও পাহাড়ি এলাকার উন্নয়ন প্রকল্পেও এর ব্যবহার করা যেতে পারে।
সরকারের গঠিত টেকনিক্যাল কমিটি মূলত কোন কোন খাতে, কী পরিমাণে এবং কোন পরিস্থিতিতে এই ঘাস ব্যবহার করা সম্ভব—তা যাচাই করবে।
এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রকল্পেও এর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বিন্না ঘাস ব্যবহারের অন্যতম আকর্ষণ হলো এর তুলনামূলক কম খরচ এবং পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্য।
গবেষকদের মতে, প্রচলিত অবকাঠামোগত ব্যবস্থার পাশাপাশি সঠিক জায়গায় বিন্না ঘাস ব্যবহার করলে ভূমিক্ষয় নিয়ন্ত্রণের ব্যয় অনেক কমানো সম্ভব। অধ্যাপক শরীফুল ইসলামের একটি উদাহরণ অনুযায়ী, কোনো বাঁধ সুরক্ষায় প্রচলিত উপকরণে ১০০ টাকা খরচ হলে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে বিন্না ঘাস ব্যবহারে তার তুলনায় অনেক কম খরচ হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কংক্রিট, জিওব্যাগ বা অন্যান্য প্রকৌশলগত ব্যবস্থা পুরোপুরি বাদ দেওয়া যাবে। বরং জায়গা ও ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী প্রকৌশলগত সমাধানের সঙ্গে বিন্না ঘাসকে সমন্বিতভাবে ব্যবহারের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিন্না ঘাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার রয়েছে। এর শিকড় থেকে সুগন্ধযুক্ত তেল পাওয়া যায়, যা সুগন্ধি, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহার করা হয়।
অর্থাৎ একই উদ্ভিদ একদিকে ভূমিক্ষয় ও পাহাড়ধস রোধে প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে, অন্যদিকে এর শিকড় থেকে অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান সুগন্ধি তেলও পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি ও কক্সবাজারের পাহাড়ি অঞ্চল যেমন ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে, তেমনি পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়কের পাশের মাটি, বাঁধ, খাল ও কৃষিজমিও বর্ষায় ক্ষয়ের শিকার হয়।
এ অবস্থায় যেখানে বিন্না ঘাস কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব, সেখানে এটি তুলনামূলক কম খরচে এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে মাটি ধরে রাখার একটি সম্ভাবনাময় পদ্ধতি হতে পারে।
সরকারের গঠিত টেকনিক্যাল কমিটির পর্যালোচনার মাধ্যমে এখন নির্ধারণ হবে—বাংলাদেশের কোন কোন এলাকায় এবং কোন ধরনের প্রকল্পে এই ঘাস সবচেয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের প্রত্যাশা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রকৌশলগত পরিকল্পনার ভিত্তিতে ব্যবহার করা গেলে মাঠে-ঘাটে অবহেলায় পড়ে থাকা এই সাধারণ ঘাসই বাংলাদেশের অবকাঠামো ও ভূমি সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।