ডেস্ক রিপোর্ট: স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষ করে তুলতে ২৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যানেজমেন্ট (বিআইএইচএম)।
২০২৩ সালের নভেম্বরে ভবনগুলোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। অথচ আজ পর্যন্ত এখানে কোনো চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হয়নি। চালু করা যায়নি প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম। এ ছাড়া জনবল কাঠামো চূড়ান্ত না হওয়ায় এই জাতীয় অবকাঠামো পড়ে আছে অরক্ষিত ও অযত্নে। অন্যদিকে দেশে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সময়োপযোগী প্রশিক্ষণের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে গত দুই বছরে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ চিকিৎসক কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ পাননি। আর যারা প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন, প্রশাসনিক ও সম্পদ সংকটের কারণে অর্জিত জ্ঞান কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারছেন না।
গত বৃহস্পতিবার সাভারের বিআইএইচএমে গিয়ে দেখা যায়, সুবিশাল বহুতল ভবন দাঁড়িয়ে থাকলেও প্রাঙ্গণজুড়ে সুনসান নীরবতা ও অযত্নের ছাপ। প্রকল্পটিতে রয়েছে চারটি ভবন। এর মধ্যে একটি ১৪ তলা প্রধান ভবন, একটি ৯ তলা, একটি ৮ তলা এবং দুটি ৫ তলা ডরমিটরি ভবন।
জনবল নিয়োগ ছাড়াই ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি প্রতিষ্ঠানটির উদ্বোধন করেন। তবে উদ্বোধনের আড়াই বছর পার হলেও এখনও কার্যক্রম শুরু হয়নি। প্রকল্প এলাকা ঘুরে কোনো প্রকল্প পরিচালক বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মতিনকেও পাওয়া যায়নি। পুরো ভবন দেখভাল করছেন মাত্র তিনজন কেয়ারটেকার। তারা জানান, এত বড় অবকাঠামোর নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত জনবল ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রয়োজন, যা তাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, চব্বিশের ৫ আগস্টের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সেখানে সেনাবাহিনী অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে। তবে গত ৫ জুন তারা চলে যায়। এর পর থেকেই ক্যাম্পাসের নিরাপত্তায় শিথিলতা দেখা দিয়েছে এবং সন্ধ্যার পর বখাটে ও মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়ে।
জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, সাভারের বিআইএইচএমের মতো বিশাল অবকাঠামো ফেলে রেখে সরকার বড় অঙ্কের আর্থিক বিনিয়োগকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। দ্রুত অর্গানোগ্রাম অনুমোদন করে স্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো গঠন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের মানোন্নয়নে শুধু আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না দিয়ে প্রয়োজনভিত্তিক প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণ-পরবর্তী কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার জোর সুপারিশ করেন তিনি।
সম্প্রতি বিআইএইচএমের সভায় জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানটি রাজস্ব খাতে পরিচালনার জন্য শুরুতে ১৩৮টি পদ সৃজনের প্রস্তাব করা হলেও বর্তমানে ৮৫টি পদ সৃজনের পুনঃপ্রস্তাব যাচাই-বাছাই শেষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিআইএইচএমের পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘২৩৫ কোটি টাকার প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০১১ সালে। পরিকল্পনা ছাড়াই ২০২৩ সালে উদ্বোধন করা হয়। এক বছর ধরে আমি পরিচালক হিসেবে রয়েছি। প্রতিষ্ঠানটি এখনও ব্যবহারের উপযোগী না হওয়ায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অফিস করি। কিছুদিন আগে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। ভবনটি বুঝে পেলে কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করা যাবে। তবে এখনও অনেক কাজ বাকি।’
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেশের স্বাস্থ্য খাতের প্রশিক্ষণের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমানের পরিচালনায় দেশের আটটি বিভাগের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ৯ মাসব্যাপী এই গবেষণা চালানো হয়। জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, গত দুই বছরে ৮৪ দশমিক ২ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী অন্তত একটি প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। তবে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ চিকিৎসক কোনো প্রশিক্ষণ পাননি। স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের হার ৫০ থেকে ৬২ শতাংশ। যারা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, তাদের অনেকেই এই প্রশিক্ষণ কাজে লাগাতে পারছেন না। প্রশিক্ষণ নেওয়া ১০০ জন চিকিৎসকের মধ্যে ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক মনে করেন, আংশিক প্রাসঙ্গিক মনে করেন ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ, আর কাজে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পেরেছেন ৪০ শতাংশ।
গবেষকদের মতে, প্রশিক্ষণের পর অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা প্রয়োজনীয় সম্পদ ও লজিস্টিক সহায়তার অভাব ৫৯ শতাংশ, সময়ের অভাব ৪৯ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার সহযোগিতার ঘাটতি ৪৯ শতাংশ।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, কেন্দ্রীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলেও উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের প্রান্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও পিছিয়ে রয়েছে। এ ছাড়া ঘন ঘন বদলির কারণে প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, দ্রুত চালু হচ্ছে হেলথ ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর প্রশিক্ষণে গতি বাড়াতে গত ১১ জুলাই প্রতিষ্ঠানটি চালুর বিষয়ে বৈঠক হয়েছে। এটি চালু হলে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য প্রশাসকদের ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে। --- সূত্র, সমকাল