পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও উচ্চ প্রযুক্তি শিল্পের অপরিহার্য কাঁচামাল বিরল মৃত্তিকা মৌল বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস সরবরাহ ঘিরে বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। ২০২৪ সালে বিশ্বের মোট উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশই ছিল চীনের দখলে। বৈশ্বিক প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতার প্রায় ৮৫ শতাংশও দেশটির নিয়ন্ত্রণে। চীনা আধিপত্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ বিকল্প উৎসের সন্ধানে নেমেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপ, কক্সবাজার-টেকনাফ-মহেশখালীর সৈকতবালি ও ব্রহ্মপুত্র-যমুনার চর ও প্লাবনভূমির পলিতে একাধিক বিরল মৃত্তিকা মৌলের উপস্থিতি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সূত্র: বণিক বার্তা
সম্প্রতি দুটি গবেষণা এবং তাতে পর্যালোচিত আগের গবেষণাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকায় ল্যান্থানাম, সেরিয়াম, প্রাসিওডিমিয়াম, নিওডিমিয়াম, সামারিয়াম, গ্যাডোলিনিয়াম, টার্বিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, হলমিয়াম ও আর্বিয়াম পাওয়া গেছে। শনাক্ত হয়েছে এসব মৌলের বাহক মোনাজাইট ও জেনোটাইম। ব্রহ্মপুত্রের ২০টি নমুনায় সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের অপরিহার্য উপাদান কোয়ার্টজও পাওয়া গেছে। এসব রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন, শক্তিশালী চুম্বক, স্মার্টফোন, এলইডি, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশের বিরল মৃত্তিকা মৌল নিয়ে চলতি বছর প্রকাশিত গবেষণা দুটির একটি হলো ‘রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস ইন দ্য গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র মেঘনা ডেল্টা ইন বাংলাদেশ: আ রিভিউ অব দেয়ার ডিস্ট্রিবিউশন, এক্সট্র্যাকশন অ্যান্ড পাথওয়েজ ফর গ্রিন প্রসেসিং’। ‘হাইড্রোমেটালার্জি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এ গবেষণায় বদ্বীপে এসব মৌলের বিস্তৃতি ও উত্তোলন সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। অন্যটি হলো ‘মেজর অ্যান্ড ট্রেস এলিমেন্ট জিওকেমিস্ট্রি অব ব্রহ্মপুত্র রিভার সেডিমেন্টস ইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইমপ্লিকেশনস ফর প্রোভেন্যান্স অ্যান্ড কনটামিনেশন’। ‘ডিসকভার জিওসায়েন্স’-এ প্রকাশিত এ গবেষণায় ব্রহ্মপুত্রের নতুন চর ও পললভূমি থেকে সংগ্রহ করা ২০টি নমুনায় থাকা মৌল ও খনিজের পরিমাণ পরীক্ষা করা হয়েছে।
বিরল মৃত্তিকা মৌলকে আগামী দিনের শিল্প ও অর্থনীতির কৌশলগত কাঁচামাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, বৈদ্যুতিক পরিবহন, ডিজিটাল যোগাযোগ, মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির বিস্তার এসব মৌলের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে পাওয়া নিওডিমিয়াম ও প্রাসিওডিমিয়াম দিয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী স্থায়ী চুম্বক তৈরি হয়, যা বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন, রোবট, ড্রোন, হার্ডডিস্ক, হেডফোন ও শিল্প-কারখানার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে ব্যবহৃত হয়। উচ্চ তাপমাত্রায় এসব চুম্বকের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে প্রয়োজন ডিসপ্রোসিয়াম ও টার্বিয়াম। টার্বিয়াম এলইডি, ডিসপ্লে ও সেন্সরেও ব্যবহৃত হয়।
ল্যান্থানাম ব্যাটারি, বিশেষ কাচ, ক্যামেরার লেন্স ও তেল পরিশোধনের অনুঘটক তৈরিতে এবং সেরিয়াম গাড়ির ক্যাটালিটিক কনভার্টার, কাচ পলিশ ও ইলেকট্রনিক চিপের স্তর মসৃণ করার কাজে ব্যবহৃত হয়। সামারিয়াম উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল চুম্বক, উড়োজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক প্রযুক্তিতে প্রয়োজন হয়। গ্যাডোলিনিয়ামের ব্যবহার রয়েছে এমআরআই পরীক্ষা, পারমাণবিক চুল্লি ও বিশেষ ইলেকট্রনিক যন্ত্রে; হলমিয়াম চিকিৎসার লেজারে এবং আর্বিয়াম ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কে সংকেত শক্তিশালী করতে ব্যবহৃত হয়। জেনোটাইমে থাকা সম্ভাব্য ইট্রিয়াম এলইডি, লেজার, তাপ সহনশীল সিরামিক ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের যন্ত্রাংশে প্রয়োজন হয়।
অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্রের পলিতে পাওয়া কোয়ার্টজ বিরল মৃত্তিকা মৌল নয়। তবে অত্যন্ত উচ্চ বিশুদ্ধতার কোয়ার্টজ থেকে সেমিকন্ডাক্টর গ্রেড সিলিকন উৎপাদন করা যায়। যদিও এখানকার কোয়ার্টজ সেই মানের কিনা তা এখনো পরীক্ষা করা হয়নি। এসব উপাদানের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও অত্যন্ত বেশি। ২০২৪ সালে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ বিরল মৃত্তিকা মৌল চীন উৎপাদন করেছে এবং বৈশ্বিক প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতার প্রায় ৮৫ শতাংশ দেশটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে বাণিজ্যিক বিরোধ, রফতানি নিয়ন্ত্রণ কিংবা যুদ্ধের কারণে চীন থেকে সরবরাহ ব্যাহত হলে বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ইলেকট্রনিকস ও প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় সংকট তৈরি হতে পারে।
এ ঝুঁকি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ বিকল্প উৎস ও নিজস্ব প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। ২০৪০ সাল নাগাদ বিরল মৃত্তিকা মৌলের বৈশ্বিক চাহিদা ৭-১০ গুণ বাড়ার পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে নিওডিমিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়ামের চাহিদা দ্রুত বাড়তে পারে। তাই বাংলাদেশে অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য মজুদ নিশ্চিত করা গেলে এসব মৌল ভবিষ্যতে দেশের উচ্চ প্রযুক্তি শিল্পের কাঁচামাল, রফতানি পণ্য ও আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উপস্থিতি শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়, কোন এলাকায় কোন মৌল কত পরিমাণে রয়েছে, উত্তোলন ও পরিশোধনে কত ব্যয় হবে এবং বিশ্ববাজারে তা প্রতিযোগিতামূলক হবে কিনা—এসব নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ সম্পদ জরিপ, অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। এজন্য সরকারকে পৃথক নীতি প্রণয়ন, গবেষণা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে নদী ও উপকূলীয় পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে কঠোর নজরদারি ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া বলেন, ‘পলিতে রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস কী পরিমাণে রয়েছে এবং তা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য কিনা সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন অনুসন্ধানের মাধ্যমে দেখতে হবে, কী পরিমাণ বালি প্রক্রিয়া করে কতটুকু মোনাজাইট ও বিরল মৃত্তিকা মৌল পাওয়া যায়। মোনাজাইটে উচ্চ অর্থনৈতিক মূল্যসম্পন্ন বিভিন্ন মৌল থাকতে পারে। নিয়ন্ত্রিতভাবে এসব বালি থেকে উচ্চ মূল্যের খনিজ আলাদা করা গেলে তা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বিরল মৃত্তিকা মৌল পৃথক করা সম্ভব না হলেও মোনাজাইটসহ মূল্যবান খনিজগুলো আলাদা করে বাজারজাত করার সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববাজারে এগুলোর চাহিদা অনেক।’
মিয়ানমারে বিরল মৃত্তিকা মৌল পাওয়ার উদাহরণ দিয়ে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা মিয়া বলেন, ‘বাংলাদেশের পলিতেও এসব মৌলের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে ১০০ টন বালি প্রক্রিয়া করে যদি মাত্র এক গ্রাম মূল্যবান মৌল পাওয়া যায়, তাহলে সেটি উত্তোলনে যে ব্যয় হবে, বাজারমূল্য দিয়ে তা ওঠানো সম্ভব কিনা এ হিসাব করতে হবে। সম্ভাবনা অবশ্যই রয়েছে। নদীর বালির সঙ্গে মূল্যবান খনিজ প্রবাহিত হয়ে চলে যাচ্ছে।
সেগুলো অর্থনৈতিকভাবে ও পরিবেশসম্মত উপায়ে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ করা গেলে দেশের শিল্প ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোয়ার্টজেরও উচ্চ অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে এবং উচ্চ বিশুদ্ধতার কোয়ার্টজ সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ব্যবহৃত হয়। তাই নদী ও উপকূলীয় বালির মূল্যবান খনিজ অনুসন্ধান, সংগ্রহ ও ব্যবহারের জন্য সরকারের নজরদারির পাশাপাশি আলাদা নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বিশ্বজুড়ে এখন ন্যানোস্কেলসহ বিভিন্ন পর্যায়ে এসব খনিজ নিয়ে কাজ হচ্ছে।’
‘রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস ইন দ্য গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা ডেল্টা ইন বাংলাদেশ: আ রিভিউ অব দেয়ার ডিস্ট্রিবিউশন, এক্সট্র্যাকশন অ্যান্ড পাথওয়েজ ফর গ্রিন প্রসেসিং’ শীর্ষক গবেষণায় গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপ, বিশেষ করে কক্সবাজার-টেকনাফ-মহেশখালীর সৈকতবালি ও যমুনা-ব্রহ্মপুত্র নদী ব্যবস্থার চর ও প্লাবনভূমির পলিতে বিরল মৃত্তিকা মৌলবাহী খনিজের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। বদ্বীপের পলিতে বিরল মৃত্তিকা মৌলের সম্মিলিত ঘনত্ব প্রতি গ্রামে ৪০ দশমিক ৮৯ থেকে ৪৭২ দশমিক ৩৮ মাইক্রোগ্রাম।
এসব এলাকার পলিতে মোট ভারী খনিজের পরিমাণ স্থানভেদে ১-৩০ শতাংশ এবং ভারী খনিজ সমষ্টির মধ্যে বিরল মৃত্তিকা মৌলবাহী খনিজের অংশ প্রায় ৫-১৫ শতাংশ। প্রধান রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস বহনকারী খনিজ হিসেবে মোনাজাইট ও অল্প পরিমাণে জেনোটাইম পাওয়া গেছে। মোনাজাইটে মূলত সেরিয়াম ও ল্যান্থানামের মতো হালকা বিরল মৃত্তিকা মৌল এবং জেনোটাইমে ইট্রিয়াম ও ভারী বিরল মৃত্তিকা মৌল থাকে। পর্যালোচনায় উদ্ধৃত প্রাথমিক গবেষণায় বদ্বীপে ৫০ হাজার টন পর্যন্ত ভারী বিরল মৃত্তিকা মৌল থাকার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও কোন এলাকায় কোন মৌল কত টন রয়েছে, তার পৃথক হিসাব এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
‘মেজর অ্যান্ড ট্রেস এলিমেন্ট জিওকেমিস্ট্রি অব ব্রহ্মপুত্র রিভার সেডিমেন্টস ইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইমপ্লিকেশনস ফর প্রোভেন্যান্স অ্যান্ড কনটামিনেশন’ শীর্ষক গবেষণায় ব্রহ্মপুত্র নদের বাংলাদেশ অংশের ২০টি স্থান থেকে পলির নমুনা নেয়া হয়েছে। গবেষণার মানচিত্র অনুযায়ী, নমুনা সংগ্রহের স্থানগুলো গাইবান্ধার উত্তরাংশ ও কুড়িগ্রামের দক্ষিণাংশসংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পড়েছে।
নতুন জেগে ওঠা চর ও নদীর বাঁকে জমা পলি থেকে নমুনাগুলো নেয়া হলেও সংশ্লিষ্ট গ্রাম বা চরের নাম প্রকাশ করা হয়নি। নমুনাগুলোয় সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে সেরিয়াম। এছাড়া ল্যান্থানাম, নিওডিমিয়াম, প্রাসিওডিমিয়াম, সামারিয়াম, গ্যাডোলিনিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, আর্বিয়াম, হলমিয়াম ও টার্বিয়াম পাওয়া গেছে। এছাড়া পলিতে মোনাজাইট, ইলমেনাইট, গারনেট, জিরকন, রুটাইল, সিলিমানাইট, কায়ানাইট, এপিডোট ও ম্যাগনেটাইটও শনাক্ত হয়েছে। তবে এসব মৌল ও খনিজের মোট মজুদ কত টন, গবেষণায় তা নির্ধারণ করা হয়নি।
পলিতে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে কোয়ার্টজ। বিরল মৃত্তিকা মৌলগুলোর প্রধান বাহক হিসেবে মোনাজাইটকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ খনিজে সাধারণত সেরিয়াম, ল্যান্থানাম, নিওডিমিয়াম ও প্রাসিওডিমিয়ামের মতো হালকা বিরল মৃত্তিকা মৌল থাকে। অল্প পরিমাণে পাওয়া জেনোটাইম সাধারণত ইট্রিয়াম ও ভারী বিরল মৃত্তিকা মৌলের বাহক। তবে জেনোটাইমের উপস্থিতির তথ্য থাকলেও ইট্রিয়ামের ঘনত্ব বা মজুদ গবেষণা দুটিতে আলাদাভাবে দেয়া হয়নি। ব্রহ্মপুত্রের পলিতে কোয়ার্টজের পরিমাণ বেশি হলেও তা সেমিকন্ডাক্টর গ্রেড সিলিকন উৎপাদনের উপযোগী কিনা তা গবেষণায় পরীক্ষা করা হয়নি। অত্যন্ত বিশুদ্ধ কোয়ার্টজ থেকে উচ্চ বিশুদ্ধতার সিলিকা এবং পরে সেমিকন্ডাক্টর গ্রেড সিলিকন তৈরি করা যায়।
বিরল মৃত্তিকা মৌলের বিশ্ববাজারে চীনের বড় আধিপত্য রয়েছে। ২০২৪ সালে বিশ্বে মোট ৩ লাখ ৯০ হাজার টন বিরল মৃত্তিকা মৌল উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে চীন একাই উৎপাদন করেছে ২ লাখ ৭০ হাজার টন বা প্রায় ৭০ শতাংশ। দেশটিতে বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ টন মজুদও রয়েছে। ওই বছর ৪৫ হাজার টন উৎপাদন করে যুক্তরাষ্ট্র ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক এবং ৩১ হাজার টন উৎপাদন নিয়ে মিয়ানমার ছিল তৃতীয়। ব্রাজিলে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ টন মজুদ থাকলেও দেশটির উৎপাদন এখনো সীমিত। এ অবস্থায় বাংলাদেশে অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য মজুদ নিশ্চিত করা গেলে তা শুধু দেশের জন্য নয়, আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে বাংলাদেশে বিরল মৃত্তিকা মৌলবাহী খনিজের বাজার গড়ে না ওঠাকে বাণিজ্যিক উত্তোলনের পথে বড় বাধা বলে মনে করেন ইনস্টিটিউট অব মাইনিং, মিনারেলজি অ্যান্ড মেটালার্জির (আইএমএমএম) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও পরিচালক ড. মো. আমিনুর রহমান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এসব খনিজ উত্তোলনে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। দেশে এখনো এর বাজার ও চাহিদা তৈরি না হওয়ায় সরকারি পর্যায়ে বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান বিপুল বিনিয়োগে খনিজ উত্তোলন শুরু করলেও এখনো লাভের মুখ দেখেনি। তার পরও বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পদ কাজে লাগাতে বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে খনিজ অনুসন্ধান ও উত্তোলনের দিকে মনোযোগ দেয়া জরুরি।’
তবে বিরল মৃত্তিকা মৌল উত্তোলনের পরিবেশগত ঝুঁকিও রয়েছে। মোনাজাইটের সঙ্গে সাধারণত তেজস্ক্রিয় থোরিয়াম ও ইউরেনিয়াম থাকে। প্রচলিত অ্যাসিডনির্ভর প্রক্রিয়ায় মোনাজাইট ভাঙা ও পৃথক করার সময় তেজস্ক্রিয় বর্জ্য, অ্যাসিডযুক্ত পানি ও ভারী ধাতুদূষণ সৃষ্টি হতে পারে। অপরিকল্পিতভাবে নদীর চর বা উপকূলীয় বালি উত্তোলন করা হলে নদীর গতিপথ, জীববৈচিত্র্য, কৃষিজমি, মৎস্যসম্পদ ও স্থানীয় মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গবেষকরা এ কারণে প্রচলিত অ্যাসিডনির্ভর প্রক্রিয়ার পরিবর্তে বায়োলিচিং, ডিপ ইউটেকটিক সলভেন্ট ও পরিবেশবান্ধব হাইড্রোমেটালার্জির মতো প্রযুক্তি পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছেন।
ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের পরিচালক (ভূতত্ত্ব) মোহাম্মদ আশরাফুল কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপ ও ব্রহ্মপুত্র নদের পলিসহ সারা দেশের বালিতে কী ধরনের খনিজ সম্পদ রয়েছে, তা নিয়ে আমরা গবেষণা করছি। গবেষণা শেষ হলে কোথায় কোন ধরনের খনিজ কী পরিমাণে রয়েছে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। এরপর এসব খনিজের কতটুকু উত্তোলনযোগ্য এবং বাণিজ্যিকভাবে আহরণ করা সম্ভব কিনা সে বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। গবেষণা এখনো চলমান থাকায় এ মুহূর্তে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।’