শিরোনাম
◈ শুক্রবার থেকে এমপিও শিক্ষকদের বদলির আবেদন, চলবে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত ◈ অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে নতুন উদ্যোগ, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে করার উদ্যোগ ◈ চোরাচালান ও আটক পণ্য নিষ্পত্তিতে এনবিআরের নতুন আদেশ জারি ◈ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি কেউ, ভোট বৃহস্পতিবার: ইসি সচিব ◈ সমাজের সবাই এগিয়ে এলে অনেক বড় সমস্যার সমাধান করা সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী ◈ সরকার কেন পাল্টালো অর্থবছরের সময়কাল, কি সুবিধা মিলবে? ◈ সরকারি চাকরি জনগণের সেবা করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ: আইনমন্ত্রী ◈ কোন-কোন রুটে চলবে পিংক বাস, ভাড়া কত ◈ ঘরে বসেই করুন ই-নামজারি, আবেদন পদ্ধতি ও খরচ জানুন ◈ আওয়ামী লীগ নেতাদের হাজতের ভিডিও ভাইরাল, ওসিসহ ৩ পুলিশ কর্মকর্তা বদলি

প্রকাশিত : ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:৫৫ বিকাল
আপডেট : ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:৩৭ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সরকার কেন পাল্টালো অর্থবছরের সময়কাল, কি সুবিধা মিলবে?

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন অর্থবছরের পরিবর্তে সরকার এখন ১ এপ্রিল থেকে পরের বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত নতুন অর্থবছর নির্ধারণ করেছে। ২০২৭-২৮ অর্থবছর হবে রূপান্তরের সময়— এই ৯ মাসের মধ্যবর্তী অর্থবছর শেষে ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে নতুন সময়সূচি পুরোপুরি কার্যকর হবে।

দেখতে এটি নিছক ক্যালেন্ডারের তিন মাসের পরিবর্তন মনে হলেও এর প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। সরকারের বাজেট প্রণয়ন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন, কর ব্যবস্থাপনা, সরকারি হিসাবরক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই নতুন সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে হবে। প্রভাব পড়বে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও করদাতাদের হিসাব-নিকাশেও।

তবে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ কোনও প্রশাসনিক সুবিধা নয়; বরং বাংলাদেশের প্রকৃতি, বিশেষ করে বর্ষাকালের সঙ্গে সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সময়সূচির দীর্ঘদিনের অসামঞ্জস্য দূর করা।

অর্থবছর আসলে কী?

অর্থবছর হলো সরকারের আর্থিক হিসাবের জন্য নির্ধারিত ১২ মাসের একটি সময়কাল। এই সময়ের ভিত্তিতেই সরকার হিসাব করে— কত টাকা রাজস্ব আদায় হবে, কত টাকা ব্যয় হবে, কোথায় কত বরাদ্দ দেওয়া হবে এবং কোন উন্নয়ন প্রকল্পে কত অর্থ খরচ করা হবে।

দেশের বাজেট, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), সরকারি আয়-ব্যয়, রাজস্ব আদায়, ঋণ ও দায়, সরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাবসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অনেক সূচক অর্থবছরকে ভিত্তি করে তৈরি হয়।

এত দিন বাংলাদেশে অর্থবছর ছিল জুলাই থেকে জুন। অর্থাৎ ১ জুলাই নতুন অর্থবছর শুরু হয়ে ৩০ জুন শেষ হতো। এখন সেই কাঠামো বদলে ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ করা হচ্ছে।

কেন অর্থবছর বদলানোর প্রয়োজন হলো?

সরকারের অন্যতম প্রধান যুক্তি হলো— উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে বাংলাদেশের মৌসুমি বাস্তবতার সমন্বয় ঘটানো। বাংলাদেশে বর্ষাকাল সাধারণত জুন থেকে শুরু হয়ে কয়েক মাস স্থায়ী হয়। এই সময়ে অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন, কাদা ও পানি জমে থাকার কারণে রাস্তা, সেতু, কালভার্ট, ভবন, ড্রেন, বাঁধসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণকাজ ব্যাহত হয়।

কিন্তু বর্তমান অর্থবছরের কাঠামোতে অর্থবছরের শেষ তিন মাস এপ্রিল, মে ও জুন— এসব প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। বিশেষ করে জুনে এসে অনেক প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার চাপ তৈরি হয়।

ফলে একদিকে প্রকৃতির বাধা, অন্যদিকে অর্থবছর শেষ করার প্রশাসনিক চাপ— দুইয়ের মধ্যে পড়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে তৈরি হয় অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ো। সরকার মনে করছে, অর্থবছর এপ্রিল থেকে শুরু হলে এই চিত্র অনেকটাই বদলানো সম্ভব।

‘জুন রাশ’ কমানোর বড় সুযোগ

বাংলাদেশের সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে বহু বছর ধরে একটি পরিচিত প্রবণতা হলো— অর্থবছরের শেষদিকে ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যাওয়া। বছরের প্রথম কয়েক মাস প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীরগতিতে চললেও অর্থবছর শেষ হওয়ার সময় এসে অর্থ ব্যয়ের গতি বাড়ে। এর ফলে জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ করার চাপ তৈরি হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে দ্রুত দরপত্র, দ্রুত কাজ এবং দ্রুত বিল পরিশোধের প্রবণতা দেখা যায়। এতে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, আবার কোথাও কোথাও বরাদ্দের অর্থ পুরোপুরি ব্যবহার করতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের ঝুঁকিও তৈরি হয়। এই প্রবণতাকে অর্থনীতির আলোচনায় অনেক সময় ‘জুন রাশ’ বলা হয়।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের একটি পরিসংখ্যান বিষয়টি স্পষ্ট করে। ওই অর্থবছরে এডিপিতে মোট প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জুন মাসেই খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ২৮ শতাংশের বেশি।

একটি অর্থবছরের ১২ মাসের মধ্যে এক মাসেই যদি প্রায় এক-চতুর্থাংশের বেশি উন্নয়ন ব্যয় হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক— বছরের বাকি সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি এত কম থাকে কেন? অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে এই শেষ মুহূর্তের ব্যয়ের চাপ কমানো।

এপ্রিল-মার্চ হলে সুবিধাটা কোথায়?

নতুন অর্থবছর শুরু হবে এপ্রিল মাসে। অর্থাৎ নতুন অর্থবছরের প্রথম তিন মাস হবে এপ্রিল, মে ও জুন। এই সময়ে অনেক নির্মাণ প্রকল্প শুষ্ক মৌসুমের শেষ ভাগে কাজ এগিয়ে নিতে পারবে। এরপর জুলাই-আগস্টের বর্ষাকাল এলেও অর্থবছর তখন একেবারে শুরু পর্যায়ে থাকবে। অর্থবছরের শেষদিকে প্রকল্প শেষ করার চাপ থাকবে না।

আর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়টি সাধারণত তুলনামূলক শুষ্ক। ফলে অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের বড় একটি অংশে রাস্তা, সেতু, ভবন, বাঁধসহ অবকাঠামো নির্মাণের জন্য অপেক্ষাকৃত অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যাবে।

অর্থাৎ নতুন কাঠামোয় সরকারের কাছে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বর্ষা এড়িয়ে পরিকল্পিতভাবে দীর্ঘ শুষ্ক সময় ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।

শুধু সময় বদলালেই কি প্রকল্পের সমস্যা দূর হবে?

এখানেই রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অর্থবছর পরিবর্তন করলেই বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে— এমনটা মনে করার কারণ নেই। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের পেছনে শুধু বর্ষা দায়ী নয়। জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, নকশা পরিবর্তন, দরপত্র প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, অর্থ ছাড়ে দেরি, প্রকল্প পরিচালনায় দুর্বলতা, ঠিকাদারের সক্ষমতার ঘাটতি, প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব এবং জবাবদিহির দুর্বলতাও বড় কারণ।

তাই নতুন অর্থবছরকে সফল করতে হলে সময় পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রকল্প ব্যবস্থাপনাতেও সংস্কার আনতে হবে। অর্থাৎ এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর একটি সুযোগ তৈরি করবে; সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে দক্ষতার সঙ্গে।

সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় কি পরিবর্তন আসবে?

নতুন অর্থবছর চালু হলে সরকারের বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পুরো চক্র নতুন সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা, সরকারি ব্যয় পরিকল্পনা, ঋণ ব্যবস্থাপনা, সরকারি হিসাব বন্ধ, আর্থিক প্রতিবেদন—সবকিছুর সময়সূচি নতুন করে সাজাতে হবে।

সরকারি বিভিন্ন দফতরের হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা ও সফটওয়্যারেও পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে তথ্য সংগ্রহ ও অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান প্রকাশের সময়সূচিও নতুন অর্থবছরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। এটি বড় ধরনের প্রশাসনিক কাজ। তবে সরকার ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে ৯ মাসের রূপান্তরমূলক বছর হিসেবে রাখায় প্রস্তুতির জন্য একটি সময় পাওয়া যাবে।

বেসরকারি খাতেও পড়বে প্রভাব

অর্থবছর পরিবর্তনের প্রভাব শুধু সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নতুন সময়সূচির সঙ্গে হিসাব-নিকাশ সমন্বয় করতে হবে। বিশেষ করে বড় প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি ও যেসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন সফটওয়্যারনির্ভর, তাদের হিসাব ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। আয়-ব্যয়ের হিসাব, আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা, কর-সংক্রান্ত হিসাব এবং বাজেট পরিকল্পনার সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে।

ফলে শুরুতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু অতিরিক্ত ব্যয় ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি হবে। সফটওয়্যার পরিবর্তন, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং হিসাব পদ্ধতি পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হতে পারে। তবে এটি মূলত এককালীন রূপান্তর ব্যয়। দীর্ঘমেয়াদে নতুন সময়সূচি যদি সরকারি ও বেসরকারি হিসাব ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত করে, তাহলে এর সুফল পাওয়া সম্ভব।

সাধারণ মানুষের কি পরিবর্তন হবে?

সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় অর্থবছর পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। তবে করদাতাদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আয়কর হিসাব, রিটার্ন দাখিল, কর রেয়াত পাওয়ার সময়কালসহ কর-সংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যবস্থাকে নতুন অর্থবছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে।

বর্তমানে যে সময়কাল ধরে আয় ও করের হিসাব করা হয়, নতুন কাঠামো কার্যকর হলে সেটিও পরিবর্তিত হবে। ফলে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা ও ব্যবসায়ীদের আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। এ কারণে পরিবর্তনের আগে সরকারকে ব্যাপকভাবে প্রচার ও নির্দেশনা দিতে হবে, যাতে করদাতা ও ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতি নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় পান।

আন্তর্জাতিক হিসাবের সঙ্গে সমন্বয়ও একটি বিষয়

অর্থবছর পরিবর্তনের আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক তথ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের হিসাবের সামঞ্জস্য বাড়ানো। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ জানুয়ারি-ডিসেম্বর ক্যালেন্ডার বছর অনুসরণ করে। আবার ভারত ও যুক্তরাজ্যের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর অনুসরণ করে।

বাংলাদেশের বর্তমান জুলাই-জুন কাঠামোর কারণে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে তুলনা করার সময় অতিরিক্ত সমন্বয় প্রয়োজন হয়। নতুন এপ্রিল-মার্চ কাঠামো দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক তথ্য তুলনা কিছুটা সহজ করতে পারে।

বিশেষ করে ভারত বাংলাদেশের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হওয়ায় এপ্রিল-মার্চ সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও আঞ্চলিক তুলনায় সুবিধা দিতে পারে।

ইতিহাসেও এপ্রিল-মার্চ নতুন কিছু নয়

অর্থবছরের এপ্রিল-মার্চ কাঠামো বাংলাদেশের জন্য সম্পূর্ণ নতুন ধারণা নয়। ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চলে রাজস্ব সংগ্রহের হিসাবের সঙ্গে এপ্রিলভিত্তিক সময়ের সম্পর্ক ছিল। ব্রিটিশ আমলেও এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরের প্রচলন ছিল। দেশভাগের পর পাকিস্তান জুলাই-জুন অর্থবছর গ্রহণ করে এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশও সেই কাঠামো ধরে রাখে।

অন্যদিকে ভারত এখনো এপ্রিল থেকে মার্চ পর্যন্ত অর্থবছর পরিচালনা করে। অর্থাৎ বাংলাদেশ যে নতুন সময়সূচিতে যাচ্ছে, সেটি আন্তর্জাতিকভাবে পরীক্ষিত একটি কাঠামো।

পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সুফল কী?

সবকিছু মিলিয়ে এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরের সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে সরকারি অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে বাস্তব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সময়ের সমন্বয়। বর্তমান ব্যবস্থায় অর্থবছরের শেষ দিকে এসে বর্ষার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন ব্যবস্থায় সেই চাপ কমানো সম্ভব।

এর ফলে— প্রথমত, উন্নয়ন প্রকল্পে তড়িঘড়ি কমতে পারে। দ্বিতীয়ত, বর্ষাকালে নির্মাণকাজের কারণে কাজের মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমবে। তৃতীয়ত, অর্থবছরের শেষ মাসে বরাদ্দ খরচ করার জন্য অস্বাভাবিক ব্যয়ের চাপ কমতে পারে। চতুর্থত, প্রকল্পের সময় ও অর্থ ব্যবস্থাপনা আরও পরিকল্পিত হতে পারে। পঞ্চমত, সরকারি ব্যয়ের গতি বছরজুড়ে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারে। ষষ্ঠত, এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর অনুসরণকারী ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক তথ্য ও নীতিগত বিশ্লেষণে কিছুটা সমন্বয় তৈরি হবে। সপ্তমত, অর্থবছর ও বাংলাদেশের মৌসুমি অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে সামঞ্জস্য বাড়বে।

তবে ঝুঁকিও কম নয়

এত বড় পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রূপান্তর ব্যবস্থাপনা। সরকারি হিসাব ব্যবস্থা, বাজেট পদ্ধতি, কর প্রশাসন, এডিপি, সরকারি আর্থিক প্রতিবেদন, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা—সবকিছু একই সময়ে নতুন কাঠামোয় নিয়ে আসতে হবে। এখানে সামান্য সমন্বয়হীনতাও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে ২০২৭-২৮ সালের ৯ মাসের রূপান্তরমূলক অর্থবছরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়কে শুধু ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের সময় হিসাবে না দেখে নতুন আর্থিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো পরীক্ষার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা প্রয়োজন।

অর্থবছর বদল, নাকি অর্থ ব্যবস্থাপনার সংস্কার?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিবর্তনকে শুধু ‘অর্থবছরের তারিখ পরিবর্তন’ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে পারে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের কিছু দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ। কারণ অর্থবছর হলো সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার একটি কাঠামো। কাঠামো বদলালে তার সঙ্গে কাজের সংস্কৃতিও বদলাতে হবে।

যদি এপ্রিল-মার্চ করার পরও প্রকল্প বছরের প্রথমার্ধে পড়ে থাকে এবং মার্চে এসে তড়িঘড়ি ব্যয় শুরু হয়, তাহলে শুধু ‘জুন রাশ’ বদলে ‘মার্চ রাশ’ তৈরি হবে। অর্থাৎ সমস্যার মূল জায়গা তখনও থেকে যাবে। তাই নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে বছরের শুরু থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়ন, অর্থ ছাড়, দরপত্র, জমি অধিগ্রহণ ও ক্রয়প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করা।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানের মতে, অর্থবছর ১ জুলাই-৩০ জুন থেকে ১ এপ্রিল-৩১ মার্চে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। বর্ষাকালের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচির অসামঞ্জস্য কমিয়ে প্রকল্পের গতি ও মান বাড়াতে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি মনে করেন, শুধু অর্থবছরের সময়সূচি বদলালেই উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব কিংবা দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতার মতো পুরোনো সমস্যা দূর হবে না। এজন্য বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আদায়, সরকারি হিসাব ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় দরকার। অর্থাৎ অর্থবছর পরিবর্তন হচ্ছে একটি দরজা খুলে দেওয়ার মতো— সেই দরজা দিয়ে এগিয়ে যেতে হলে প্রশাসনিক দক্ষতা, জবাবদিহি ও তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়