মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে দূরত্ব বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ নিয়েছেন। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে চাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সবই ঘটছে ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সময় গত রোববার রাতে সামাজিক মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি পোস্ট দিয়ে কিমের প্রশংসা করেন। পাশাপাশি প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে নির্দেশ দেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নির্ধারিত ১১ দিনের বার্ষিক সামরিক মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ যেন কমিয়ে দেওয়া হয়।
ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপ নিয়ে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদালয়ের গবেষক রবার্ট লিটওয়াক টাইমসকে বলেছেন, ‘আমরা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে থাকা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছি। অথচ উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে তাদের নেতাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করছি। এমন এক দেশকে সন্তুষ্টের চেষ্টা করা হচ্ছে, যারা সরাসরি মার্কিন ভূখণ্ডকে পারমাণবিক অস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।’
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি ট্রাম্পের বিরাগভাজন হওয়ার কারণ, তারা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ট্রাম্প নিজেই এ কথা জানিয়েছেন। আর হোয়াইট হাউসের দাবি, নতুন বিনিয়োগের (প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের) প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে প্রেসিডেন্ট সিউলের ওপর ক্ষুব্ধ।
টাইমস লিখেছে, এসব উত্তেজনার পেছনে কাজ করছে ইরান যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বের হতে না পারার বিষয়টি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে যেমন বের হতে চেয়েছেন, তেমনি কিমের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংও গত জুন মাসে এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি জানান, ট্রাম্প সম্ভবত কিমের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে চান।
ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যমের পোস্টেও এমন ইঙ্গিত আছে। গত শনিবার তিনি কিমের সঙ্গে একটি ছবি পোস্ট করেন। ছবিটি ধারণ করা হয়েছিল ২০১৯ সালে। ক্যাপশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিখেন, ‘কিম জং উন ও আমার সম্পর্কটি দারুণ।’ সোমবার ট্রাম্প আরেকটি ছবি পোস্ট করেন। যেখানে সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ফোন করছেন কিম। ক্যাপশনে লেখা- ‘হে ডোনাল্ড, আমরা তো বন্ধু... তাই না?’
উত্তর কোরিয়ার প্রতি ট্রাম্পের হঠাৎ ঝুঁকে যাওয়ার পেছনে একটি কারণ উল্লেখ করেছেন জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভিক্টর ডি চা। তিনি জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের সময় এশিয়া বিষয়ক নীতির ওপর কাজ করেছেন। নিউইয়র্ক টাইমসকে ভিক্টর চা বলেন, সামাজিক মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি ট্রাম্পের ক্ষোভ মূলত ইরান যুদ্ধে চরম হতাশার লক্ষণ। একই সময় কিমের প্রতি তাঁর নমনীয় মনোভাব দ্বিমুখী নীতি প্রকাশ করছে।
ভিক্টর চা আরও বলেন, ট্রাম্প মূলত দুটি বিপরীত দিকে হাঁটছেন। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে তিনি আলোচনার দিকে ঝুঁকেছেন। অন্যদিকে ইরানের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আলোচনায় আসার বহু আগে- ১৯৮০ এর দশকের শেষ দিক থেকে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্টরা এই কর্মসূচি বন্ধের একাধিক উদ্যোগ নিলেও তা ব্যর্থ হয়। ২০০৬ সালে উত্তর কোরিয়া প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। ২০১৭ সাল পর্যন্ত তারা আরও পাঁচটি পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে।
ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে কিম জং উনকে ‘লিটল রকেট ম্যান’ অ্যাখ্যা দেন। এরপর সিঙ্গাপুরে দুই নেতা বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের পর ট্রাম্প টাইমসকে বলেছিলেন, ‘পিয়ংইয়ং দ্রুতই পারমাণবিক কর্মসূচি নিষ্ক্রিয় করবে।’ কিন্তু ভিয়েতনামে অনুষ্ঠিত দুই নেতার দ্বিতীয় শীর্ষ সম্মেলনটি ভেস্তে যায়। স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাবেক কূটনীতিক জোয়েল এস উইট বলছেন, ট্রাম্প কিমের সঙ্গে আরেকটি শীর্ষ সম্মেলনের দিকে পা বাড়াচ্ছেন। কিন্তু এটিও ব্যর্থ হতে পারে।
উইট বলেন, ‘আজকের কিম জং উন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উন্নত সম্পর্কের বিষয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহী নন। তিনি নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র রক্ষায়, মিত্র রাশিয়ার সমর্থনে ইউক্রেনে সেনা পাঠাতে এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে হুমকি দিতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু ট্রাম্প বিষয়টি বুঝতে পারছেন না।’
উত্তর কোরিয়ার প্রতি নমনীয় হওয়ার বিষয়ে সোমবার ট্রাম্পের কাছে জানতে চেয়েছিলেন সাংবাদিকরা। প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি কি মিত্রদের চেয়ে শত্রুর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন? জবাবে ট্রাম্প ওঠেন, ‘আমি পরিস্থিতিকে অনেক বেশি নিরাপদ করছি। কিম জং উন সবসময় আমাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখেছে। আমি তাঁকে বুঝি, তিনিও আমাকে বোঝেন।’
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কিম জং উনও ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। অধ্যাপক ভিক্টর চা-এর মতে, ইরান যুদ্ধ উত্তর কোরিয়াকে একটি বার্তা দিয়েছে। সেটি হলো- সামরিক হামলা এড়াতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ অবলম্বন করাটা তাদের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।