শিরোনাম
◈ ঢাবির ফজলুল হক হলে মধ্যরাতে সংঘর্ষ, ভিপি-জিএসসহ আহত ৬ ◈ বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে চট্টগ্রাম-রানং শিপিং রুট চালু করতে আগ্রহী থাইল্যান্ড ◈ ‘ফার্স্ট বাংলাদেশ’ নীতিতে ৬ মাস : কূটনীতিতে কতটা এগোল বিএনপি সরকার? ◈ শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকেই সমাধান সম্ভব, তারেক রহমানের দ্রুত ভারত সফর চান দীনেশ ত্রিবেদী ◈ উড্ডয়নের আগমুহূর্তে বিমানের উইন্ডস্ক্রিনে ফাটল, নেপালে আটকা ১২৭ যাত্রী ◈ বড় ভূমিকম্পের আগেই মহাপরিকল্পনা সরকারের, ঢাকায় চিহ্নিত ৪৪৫ নিরাপদ আশ্রয়স্থল ◈ রাজধানীতে চালু হচ্ছে নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ সার্ভিস: নিরাপদ গণপরিবহনে নতুন দিগন্ত ◈ আরেকটি বড় জয় বাংলাদেশের, মাল‌য়ে‌শিয়া‌কে হোয়াইটওয়াশ কর‌লো জু‌নিয়র টাইগাররা ◈ বাংলাদেশকে অন্য দেশের মতো নয়, কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়তে চাই: তারেক রহমান ◈ রাজধানী থেকে দু’টি বোমা সদৃশ বস্তু উদ্ধার, যুবক গ্রেপ্তার

প্রকাশিত : ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:১৮ সকাল
আপডেট : ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৮:০০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

‘ফার্স্ট বাংলাদেশ’ নীতিতে ৬ মাস : কূটনীতিতে কতটা এগোল বিএনপি সরকার?

‘ফার্স্ট বাংলাদেশ’ নীতি সামনে রেখে পররাষ্ট্র ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা শুরু করেছিল বিএনপি সরকার। তবে ক্ষমতায় আসার ৬ মাস পর কূটনৈতিক বড় অর্জন থাকলেও সরকারের সামনে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পাড়ি দিতে হবে অনেক পথ। কূটনৈতিক মহল বলছে, বিশ্বের বৃহৎ শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যার যার ক্ষমতা প্রদর্শন এবং কে তাদের শত্রু-মিত্র তা বেশ রাখঢাক না রেখেই প্রকাশ করছে। উভয় দেশই সার্বক্ষণিক লক্ষ্য রাখছে, ইন্দোপ্যাফিসিক, ব্লু ইকোনমি ও ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে বাংলাদেশ কোন দিকে বেশি ঝুঁকছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির কোনো ছন্দপতন চায় না দেশটি। অন্যদিকে, চীনও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের আরও বিস্তৃতি চায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরে গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত আসায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে আছে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক। এদিকে, জুলাই আন্দোলন ও শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জল এখনো ঘোলা আছে। বিএনপি সরকারের শুরুর দিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত হয়ে উন্নতির দিকে যাওয়ার আভাস থাকলেও বারবার তা হোঁচট খাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একটি চলনসই জায়গায় পৌঁছাতে না পারলে তাতে দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। 

বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে হওয়া এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) শীর্ষক বাণিজ্য চুক্তির লাভ-ক্ষতির বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে চলে আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে করা এই চুক্তির সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জড়িত ছিল। এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পালটা শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশ হয়। এতে বাংলাদেশের জন্য ১৩১টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ৬টি শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সহজতর করা, শুল্ক ফাঁকি রোধ এবং নির্দিষ্ট মানদণ্ড মেনে খাদ্য ও কৃষি পণ্য আমদানি নিশ্চিত করার বিষয় রয়েছে এতে।

চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য কতটা সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য নিয়ে আসবে সে বিষয়ে এখনো আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও অদূর ভবিষ্যতে এর প্রভাব স্পষ্ট হবে বলে মনে করা হচ্ছে। 

সরকার গঠনের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম কোন দেশ সফরে যাচ্ছেন তা নিয়ে কৌতূহল ছিল সর্বমহলে। কৌশলগত নানা দিক বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তারেক রহমান বৈঠক করেন। ওই সফর শেষে ২৩-২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করেন। এই সফর অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশের।

সফরকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিবেচনায় মালয়েশিয়া-চীন সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। 

মালয়েশিয়া সফরে দেশটির শ্রম বাজার খুলে দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়ানো, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতে সহযোগিতা জোরদার ও ‘বৈশ্বিক ইসলামি অর্থনীতি’ হালাল শিল্প সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। 

অন্যদিকে, চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় যাওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। এই সফর ও বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হিসাবে ১৩টি সমঝোতা স্মারক ও ৪টি অতিরিক্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডরে চীনের প্রস্তাব, চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন এবং মোংলা বন্দরকে আপগ্রেড করা এবং তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়। 

বাংলাদেশ-চীন গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সেই সময় পুরো বিষয়টি নজরে রাখে ভারত।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দফায় প্রধানমন্ত্রীকে ভারতে সফরে নেওয়ার চেষ্টা ছিল দেশটির পক্ষ থেকে। কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশটিতে অবস্থান ও সেখানে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা, সীমান্তে পুশ-ইনসহ নানা ইস্যুতে খুশি নয় বর্তমান সরকার। এছাড়াও আছে গঙ্গা চুক্তি ও ভিসা সমস্যাসহ নানা ইস্যু। সর্বশেষ ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসে প্রেস কনফারেন্সে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ায় ক্ষুব্ধ ঢাকা তার কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। প্রেস কনফারেন্সটি যেন না করতে পারে সে বিষয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছিল ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে। কিন্তু তারপরও প্রেস কনফারেন্সটি হওয়ায় ঢাকা তার অসন্তোষ জানায়। দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে ঢাকার বার্তা নিয়ে সেদিনই দিল্লিতে যান। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে ঢাকার সেসব বার্তা তুলে ধরেন দীনেশ ত্রিবেদী। 

শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে ভারতের দিক থেকে এখনো সুস্পষ্ট অবস্থান না থাকলেও এই ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্ক আর ক্ষতি করতে রাজি নয় বলে দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর ২০-২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রের দাবি। তবে এ সফরের জন্য ঢাকা ইতোমধ্যেই অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির তাগিদ দিয়েছে দিল্লিকে।

বিএনপি সরকারের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচন হয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এটিকে কেউ কেউ কূটনৈতিক সাফল্য হিসাবে দেখছেন। 

সরকারের ৬ মাসে কূটনৈতিক সাফল্য ও ভবিষ্যতের নানা চ্যালেঞ্জ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, বর্তমান সরকার মূলত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র ও কূটনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৬ মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিটির ভিত্তিতে সম্পর্ক বিদ্যমান। যুগান্তরকে তিনি বলেন, সরকার দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার জন্য এগিয়ে যাচ্ছে। কূটনীতিকভাবেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বর্তমানে বেশ গতিশীল ও সক্রিয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীন উভয়ের একে অপরের প্রতি আগ্রহ আছে। দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, বিনিয়োগ বাড়ানো জন্য প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত এসেছে সেখানে। বিনিয়োগে আগ্রহী করার জন্য ‘চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল’ সক্রিয় করা হচ্ছে। মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে তাদেরকে চাচ্ছি। তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে চীন আগ্রহ দেখিয়েছে। চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব দিয়েছেন। এটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রস্তাব। এটি বাস্তবায়নের পথে প্রতিবন্ধতা আছে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ এগোতে চাইলে অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার সক্ষমতা আরও অনেক বৃদ্ধি করতে হবে।

সাবেক এই কূটনীতিক আরও বলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো অনেকটা স্থবির হয়েই আছে। নির্বাচনের আগে ও পরে দুই দেশের সম্পর্কে যে গতি সঞ্চার হবে বলে আশা করা হচ্ছিল সেটি হয়নি। ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রেস কনফারেন্সকে ঘিরে নতুন ঝাঁকুনি এসেছে। তবে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনারের তৎপরতা, ব্রিকস সম্মেলন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতে সফরের দাওয়াত এবং তার সম্ভাব্য সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কের স্থবিরতায় কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে।

সূত্র: যুগান্তর 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়