শিরোনাম
◈ তিন কারণে দেশে বেড়েছে লোডশেডিং ◈ শপিং মল-দোকানপাট খোলা রাখার নতুন সময় নির্ধারণ ◈ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী চূড়ান্ত হলেও নাম ঘোষণা কাল ◈ বালু থেকে চিপ শিল্পের পথে বাংলাদেশ : ৮ নদীর বালুতে সেমিকন্ডাক্টরের সম্ভাবনা, সংগ্রহ করা হয়েছে ৬৬০০ নমুনা ◈ ২০০ কি.মি.র ভোগান্তি শেষ: যমুনায় ২ নদীবন্দরে বদলে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি ◈ আগস্টের ১১ দিনেই রেমিট্যান্স এলো ১৩৯ কোটি ডলার ◈ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১৭ কার্গো এলএনজি কিনবে সরকার ◈ বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিল ◈ সি‌রি‌জের প্রথম টেস্টে বৃহস্প‌তিবার বাংলা‌দেশ-অ‌স্ট্রেলিয়া মু‌খোমু‌খি, ৪ পেসার নিয়ে খেলবে টাইগাররা ◈ পুলিশে বড় রদবদল, কমিশনার-ডিআইজি-এসপিসহ বদলি ২৩ কর্মকর্তা

প্রকাশিত : ১২ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১৯ রাত
আপডেট : ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ১২:০৫ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

তিন কারণে দেশে বেড়েছে লোডশেডিং

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন।। গ্যাস সংকটের মধ্যেই দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। তীব্র গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ফয়সাল আহমেদ বলেন, সকাল, দুপুর কিংবা রাত—কোনো সময়ই বিদ্যুৎ থাকার নিশ্চয়তা নেই। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরের দেড় ঘণ্টা থাকছে না।

মাগুরার বাসিন্দা দেবাশিষ বিশ্বাসও একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, গভীর রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে কখন আবার আসবে, তার কোনো ঠিক থাকে না। এতে শিশুদের ঘুমও ব্যাহত হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে প্রায় একই চিত্র পাওয়া গেছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, দিন-রাত সবসময়ই বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে।

এর প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতেও। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের কয়েকটি কারখানা বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, আগের দিন পর্যন্ত কিছুটা জ্বালানি পাওয়া গেলেও বুধবার সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে।

দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং চলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ অফিসে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের কিছু এলাকায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ গ্রিড, উপকেন্দ্র ও অফিসগুলোর নিরাপত্তা চেয়ে বুধবার পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। গোপালগঞ্জ, নীলফামারীসহ বিভিন্ন জেলার বিদ্যুৎ অফিস থেকেও স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে।

## নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি কেন?

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ক্ষুব্ধ হয়ে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের একাধিক স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

সোমবার দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে পল্লী বিদ্যুতের একটি এরিয়া অফিসে হামলার ঘটনা ঘটে। এছাড়া পার্বতীপুর জোনাল অফিসের আওতাধীন ভবের বাজার ইনডোর উপকেন্দ্রেও হামলা ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে।

এসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে কর্মরতদের অনেকে বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং চলায় স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে কর্মী, অফিস ও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বুধবার পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন।

সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক মাহবুবুর রহমানের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর এলাকায় গড়ে ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট।

চিঠিতে বলা হয়, অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে জনঅসন্তোষ বাড়ছে এবং কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ও অফিস হামলার শিকার হচ্ছে।

এদিকে, গোপালগঞ্জে নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশের কাছে আবেদন করেছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি বা ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষ।

বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে জনরোষ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, পল্লী বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানের কর্মী, স্থাপনা ও উপকেন্দ্রের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ অফিসে কর্মরতদের জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সব বিতরণ সংস্থাকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে লোড ব্যবস্থাপনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো এলাকায় অতিরিক্ত এবং অন্য এলাকায় কম লোডশেডিং না হয়।

গ্রাহকদেরও পরিস্থিতি বুঝে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বিদ্যুৎ অফিসের কর্মীদের গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতি বোঝানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কেন এই সংকট?

দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা প্রায় ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট। তারপরও কেন এত বেশি লোডশেডিং—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সংকটের পেছনে মূলত তিনটি কারণ রয়েছে।

প্রথমত, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ গ্যাসনির্ভর। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। চাহিদার তুলনায় কম গ্যাস পাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।

দ্বিতীয়ত, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি কারিগরি ত্রুটির কারণে বড়পুকুরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।

তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আমদানিকারকদের বড় অঙ্কের বিল বকেয়া থাকায় সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

দেশে কমবেশি লোডশেডিং থাকলেও গত ২৮ জুলাই থেকে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। বিশেষ করে গত ১০ জুলাইয়ের পর লোডশেডিংয়ের মাত্রা অতীতের অনেক রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

ওই দিন দুপুরে ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ফলে ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ঢাকা জোনে ৬ হাজার ৪৩২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৫৮৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। অন্যান্য বিভাগেও চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহের তথ্য পাওয়া গেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম মনে করেন, এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা কম।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাড়তি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এর বাইরে সরকারের সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই।

পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও মঙ্গলবার সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট।

এর ফলে জ্বালানি সংকটে বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।

দেশজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকট নিয়ে চাপের মুখে রয়েছে সরকার। সাম্প্রতিক এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির জন্য সাধারণ মানুষের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী।

বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি উন্নয়নে একটি কৌশল নেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, বুধবার সন্ধ্যা থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে।

তবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দিতে পারেননি তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, এলএনজি টার্মিনালের সমস্যার কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।

রাত ৮টার মধ্যে শপিংমল-দোকান বন্ধের নির্দেশ

বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দেশের সব শপিংমল, মার্কেট ও দোকান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ এবং সব ধরনের আলোকসজ্জা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বুধবার রাতে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে সারাদেশের জেলা প্রশাসকদের কাছে এ নির্দেশনা পাঠানো হয়।

এর আগে গত ১১ জুন জারি করা নির্দেশনায় শপিংমল, মার্কেট ও দোকান রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। নতুন নির্দেশনায় সেই সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে রাত ৮টা করা হয়েছে।

নতুন নির্দেশনার আওতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান ও অনুষ্ঠেয় মেলা, বাণিজ্য মেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও থাকবে। এসব আয়োজন রাত ৮টার মধ্যে শেষ করতে হবে।

তবে খাবারের দোকান, হাসপাতাল, ওষুধের দোকান এবং অন্যান্য জরুরি সেবার প্রতিষ্ঠান এই নির্দেশনার আওতামুক্ত থাকবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়