বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন।। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ‘দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার’ করা হবে বলে জানিয়েছেন। তার এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ এবং ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’-এ তিনি বলেন, “সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আছে, আইসিটি অ্যাক্টে আছে রাজনৈতিক দলের বিচার করা যাবে। সুতরাং অপেক্ষা করুন।”
শনিবার দেওয়া এ ঘোষণার পর রোববার ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আইনে বিচারের সুযোগ রয়েছে। তবে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার হবে কি না, সে বিষয়ে তদন্ত সংস্থা কাজ করছে।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার প্রসঙ্গ সামনে আনেন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্য এবং আওয়ামী লীগবিরোধী কয়েকটি রাজনৈতিক দল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে ওই প্রজ্ঞাপনে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের জন্য কোনো শাস্তির বিধান ছিল না।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। ফলে গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারেনি।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশে কিছু সংশোধনী এনে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস করা হয়।
বিলটি পাসের সময় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “বিলটি হলো একটি গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠন নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত সংশোধনী। আগের আইনটি সংশোধনের জন্য এটি আনা হয়েছে। ওনারা (জামায়াত) ও এনসিপির বন্ধুরা সবাই মিলে একটি আন্দোলন করেছিলেন। সে প্রেক্ষাপটে জনমত সৃষ্টি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তাদের (আওয়ামী লীগের) কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশনে তাদের নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের আলোকে আইসিটি অ্যাক্টেও সংগঠনটির বিচারের জন্য আইন সংশোধন করা হয়েছে।”
এখন আবার আওয়ামী লীগের বিচার প্রসঙ্গ সামনে আসায় সরকার কীভাবে এ বিষয়ে অগ্রসর হতে চায়, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, তদন্ত সংস্থা তদন্ত করছে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার কীভাবে হতে পারে বা আদৌ হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সংগঠন হিসেবে যেমন বিভিন্ন অপরাধ সংঘটন করেছে, তেমনি ব্যক্তিগতভাবেও ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’র আওতায় নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায় রয়েছে।
তিনি বলেন, “আইন অনুযায়ী এসব অপরাধের বিচার করার ব্যবস্থা রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট, ১৯৭৩ এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯—তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) নিজেরাই প্রণয়ন করেছিল। সেই আইনেই এ ধরনের অপরাধের বিচার করার সুযোগ রয়েছে।”
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, “একটি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রধান একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে। তারা বিষয়টি তদন্ত করছে। পাশাপাশি সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর অধীনে পুলিশেরও পৃথকভাবে তদন্ত করার সুযোগ রয়েছে।”
তিনি বলেন, “সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার হবে কি না, সে বিষয়ে তদন্ত সংস্থা কাজ করছে। তদন্ত শেষে যদি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় এবং আমার কাছে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়, তাহলে চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।”
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত শেষে তাদের প্রতিবেদন চিফ প্রসিকিউটরের কাছে দাখিল করবে।
তিনি বলেন, “এরপর চিফ প্রসিকিউটর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখবেন, সেখানে অপরাধের প্রাথমিক প্রমাণ রয়েছে কি না। যদি থাকে, তাহলে তারা ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করবেন।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রসিকিউশনের অভিযোগ দাখিলের পর আদালত যদি মনে করেন অভিযোগে পর্যাপ্ত উপাদান রয়েছে, তাহলে তা আমলে নেবেন।
“এরপর সব পক্ষ মামলার নথির কপি পাবে। তারপর অভিযোগ গঠনের শুনানি হবে। শুনানি শেষে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে,” বলেন শিশির মনির।
‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ এবং ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’-এ আওয়ামী লীগের বিচার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
বক্তৃতার এক পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এই বাংলাদেশ রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ১ হাজার ৪০০ জন নিহতের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন পত্রিকা ও জরিপে ৭০০ থেকে ৮০০ জনের খতিয়ান পাওয়া যায়।
“কারণ তাদের তথ্য হাসপাতালগুলো সংরক্ষণ করতে পারেনি। অনেককে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। আজ স্বজনরা কবরের সন্ধান চাইলেও আমরা দিতে পারি না। এত বড় একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও গণহত্যার পরও গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার কোনো অনুশোচনা নেই।”
আওয়ামী লীগের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তারা জুলাই যোদ্ধাদের অপরাধী হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে এবং গণ-অভ্যুত্থানকে ‘জঙ্গি তকমা’ দিচ্ছে। তাদের অনুশোচনা নেই, দোষ স্বীকারের ইতিহাসও নেই।
তিনি আরও বলেন, “আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পতন হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে নিপাত হয়েছে, নির্মূল হয়েছে। দিল্লিতে দাফন হয়ে গেছে। সেই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর রাজনীতি করতে পারবে না।
“রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার আমরা দাবি করেছি। আপনারাও দাবি করেছেন।
“তদন্ত চলছে। ইনশাআল্লাহ খুব শিগগিরই রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে।”
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইন সংশোধন করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আছে, আইসিটি অ্যাক্টে আছে—রাজনৈতিক দলের বিচার করা যাবে। সুতরাং অপেক্ষা করুন।”
অনুষ্ঠানে তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি মামলার রায় হয়েছে এবং আরও ২৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া ৭২টি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, “এর আগে আবু সাইদের মামলায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। সাজা হয়েছে সাবেক আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুনের।”