শিরোনাম
◈ বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়াতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের নতুন পরিকল্পনা ◈ বিশ্বের ১০ জনবহুল দেশের ৮টিই নেই বিশ্বকাপে: কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ-ভারত? ◈ মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাবে ৫ জেলায় বন্যার সতর্কতা জারি ◈ আওয়ামী লীগের বিচার কিভাবে করতে চাইছে সরকার ◈ মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হলে নিষিদ্ধ হতে পারে আওয়ামী লীগ: চিফ প্রসিকিউটর ◈ ট্রাম্প-পুতিন ৯০ মিনিটের ফোনালাপ, যে কথা হলো ◈ হামের সংক্রমণ অব্যাহত, ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ শিশুর মৃত্যু ◈ করদাতাদের সতর্ক করল এনবিআর, জারি ৪ নির্দেশনা ◈ ব্যবসায়ীর অ.ণ্ডকোষ চেপে চেক-স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর আদায়, সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরালের পর অভিযুক্ত গ্রেপ্তার ◈ অসহায় মানুষের সহায়তার জন্য ৮ কোটি টাকা বিতরণে খরচ ৫৩ কোটি!

প্রকাশিত : ০৫ জুলাই, ২০২৬, ০৭:১৬ বিকাল
আপডেট : ০৫ জুলাই, ২০২৬, ০৮:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ইঞ্জিন সংকটে মেয়াদোত্তীর্ণ লোকোমোটিভেই ভরসা রেলের

এম আর আমিন, চট্টগ্রাম : বাংলাদেশ রেলওয়ের অধিকাংশ লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেলেও সেগুলো দিয়েই ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে। নতুন ইঞ্জিনের সংকট, পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধার অভাব এবং দীর্ঘদিন ধরে বহরে নতুন ইঞ্জিন যুক্ত না হওয়ায় পুরোনো ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। এর ফলে প্রায়ই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে, ট্রেন বিলম্বিত হচ্ছে এবং যাত্রীসেবার মান ব্যাহত হচ্ছে।অবকাঠামোগত উন্নয়নে লাখ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও ট্রেন পরিচালনার মূল শক্তি হিসেবে বিবেচিত লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন ব্যবস্থাপনায় সংকট দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে।

রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বহরে থাকা অনেক ডিজেল ইঞ্জিনের বয়স ৫০ থেকে ৭২ বছর বা তারও বেশি। অর্থনৈতিক মেয়াদ শেষ হলেও বিকল্পের অভাবে এসব ইঞ্জিন মেরামত ও ওভারহল করে চালু রাখা হচ্ছে। তবে পুরোনো যন্ত্রাংশের কারণে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকি বাড়ে, সময়সূচি বিঘ্নিত হয় এবং পরিচালন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে দক্ষতা ধরে রাখতে পর্যায়ক্রমে নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহের পাশাপাশি আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন লোকোমোটিভ সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ধীরে ধীরে পুরোনো ইঞ্জিনের পরিবর্তে আধুনিক, জ্বালানি-সাশ্রয়ী ও অধিক সক্ষমতার ইঞ্জিন বহরে যুক্ত করা সম্ভব হবে।

রেলকে একটি নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ ও সময়নিষ্ঠ গণপরিবহন হিসেবে গড়ে তুলতে জরুরি ভিত্তিতে ইঞ্জিন বহর আধুনিকায়ন, দক্ষ জনবল বৃদ্ধি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। 

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের ২টি অঞ্চলে (পূর্ব ও পশ্চিম) মোট ইঞ্জিন আছে ২৭১ টি (মিটারগ্যাজ ১৫০ ও ব্রডগ্যাজ ১২১টি)। এরমধ্যে ৮৭টি অকেজো, বাকিগুলো জোড়াতালি দিয়ে চলছে।  এসব ইঞ্জিন দিয়েই বছরে প্রায় ১০ কোটি যাত্রী ও ৪০ লাখ টন পণ্য পরিবহন করে রেল। নিরাপদ রেল সেবা নিশ্চিত করতে যথাসময়ে ইঞ্জিন সরবরাহ করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র জানায়, রেলওয়ে পাহাড়তলী ডিজেল শপের অধিনে থাকা ৯০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ৪০টি অকেজো আর ৫০টি মেরামত করে চালানো যাচ্ছে। তবে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের অভাবে যথাসময়ে খুচরা যন্ত্রাংশ পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে লোকবল সংকট আর যথাসময়ে অর্থ বরাদ্দ না থাকায় ইঞ্জিন সরবরাহে হিমশিম খেতে হয় প্রতিনিয়ত।

সূত্র জানায়, রেলের ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুস্কাল সাধারণত ২৫ বছর ধরা হয়। কিন্তু আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের ১৯৫৩, ১৯৫৪ ও ১৯৫৬ সালে আমাদানি করা ২০০০ সিরিজের ইঞ্জিনের বয়স ৭২ বছর পার হলেও জোড়াতালি দিয়ে চালাতে বাধ্য করছে কর্তৃপক্ষ।

জানা যায়, ২০০০ সিরিজের (১৯৫৩.১৯৫৪ ও ১৯৫৬ সালের) ৩টি ইঞ্জিনের ২টি, ২২০০ সিরিজের (১৯৬১ থেকে ১৯৬৩ সালের) ৭টির মধ্যে ১টি, ২৬০০ সিরিজের (১৯৮৮ সালের) ১৬টির মধ্যে ৮টি, ২৭০০ সিরিজের (১৯৯৪ ও ১৯৯৬ সালের) ১৮টির মধ্যে ৭টি ইঞ্জিন লাইফটাইম শেষ হলেও জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে। বাকিগুলো অচল।  আবার ১৯৯৯, ২০০৪, ২০১১ ও ২০১৩ সালে আমদানি করা ২৯০০ সিরিজের ৩৯টি ইঞ্জিনের মধ্যে ২০টি সচল থাকলেও ১৯টির আয়ুস্কাল শেষ। এগুলো মেরামত করে চালানোর উপযোগী করা বেশ কষ্টকর।

সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ ২০২০ সালে হুন্দাই রোটেমে এর সরবরাহ করা ৩০০০ সিরিজের আধুনিক ৩০ টি লোকোমোটিভের। রেলকে আরো আধুনিক করার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইলেক্ট্রো মোটিভ ডিজেল (ইএমডি) এর লাইসেন্সের আওতায় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ৩০ টি লোকোমোটিভ আমদানি করা হলেও তা খুব অল্প সময়ে নষ্ট হয়ে যায়। বর্তমানে পাহাড়তলীর অধীনে ২২টি ইঞ্জিনের মধ্যে রানিং আছে মাত্র ৯টি আর মেরামতাধীন আছে ১৩টি। সবমিলিয়ে ৩০০০ সিরিজের ২০ ইঞ্জিন অনেকটাই অচল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে, বাংলাদেশ রেলওয়ের পাহাড়তলী ডিজেল শপের ম্যানেজার প্রকৌশলী এহেতেশাম মো. শফিক বলেন, একদিকে জনবল অন্যদিকে লোকোমোটিভ/ইঞ্জিন সংকট মারাত্মক অবস্থায় আছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়েই চালানো হচ্ছে নিরাপদ যাত্রীসেবা। রেলকে সচল রাখতে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। তবে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় খুচরা যন্ত্রাংশ সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। রেলের সবগুলো ইঞ্জিন সুন্দরমতো সচল করতে হলে কমপক্ষে বছরে ১০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া দরকার। এবং তা বছরের শুরুতে দিয়ে দিলে ইঞ্জিন সংকট আর থাকবে না বলে মনে করছি। এতো টাকা মেরামতের পেছনে খরচ করলে রেলের কি লাভ হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইঞ্জিন সংকটে বিভিন্ন রুটে অনেক ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। যথাসময়ে ইঞ্জিন সরবারাহ করতে পারলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন অনেক বাড়বে। এতে করে রেলের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি  লোকসান কমানো সম্ভব হবে।

বর্তমানে রেলওয়ের বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ও লোকোমোটিভ শেডে এমন অনেক ইঞ্জিন রয়েছে যেগুলো প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে মেরামতের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব ইঞ্জিনগুলোর প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে এই অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

রেলের কারিগরি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ ইঞ্জিনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, ক্রয় প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অর্থ বরাদ্দে বিলম্বের কারণে অনেক সময় প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সময়মতো সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। ফলে মেরামতযোগ্য ইঞ্জিনও দীর্ঘদিন অচল অবস্থায় পড়ে থাকে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ট্রেন পরিচালনায়। কোনো ইঞ্জিন হঠাৎ বিকল হয়ে গেলে নির্ধারিত ট্রেন বাতিল বা বিলম্বিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। যাত্রী দুর্ভোগের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) মো. মহিউদ্দিন ফকির জনবল ও খুচরা যন্ত্রাংশের তীব্র সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের অভাবে লোকোমোটিভের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, “লোকোমোটিভের সঠিকভাবে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ১২০ কোটি টাকা। এই সীমিত বরাদ্দ দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। 

সংকট মোকাবিলায় চলতি অর্থবছরে অতিরিক্ত ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।তিনি আশা প্রকাশ করেন, অতিরিক্ত বরাদ্দ পাওয়া গেলে অচল লোকোমোটিভগুলো দ্রুত মেরামত করে সচল করা এবং রেলসেবার মান উন্নয়নে ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, ৬০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ আমদানির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে এসব ইঞ্জিন দেশে পৌঁছাতে এবং রেল বহরে যুক্ত হতে সময় লাগবে। 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়