২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ১৭ জুনের এক ম্যাচে যখন আর্জেন্টিনার তারকা লিওনেল মেসি আলজেরিয়ার গোলরক্ষককে পরাস্ত করে ঠাণ্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়ে টুর্নামেন্টে নিজের প্রথম গোলটি করেন, তখন ঢাকার এক জনাকীর্ণ উন্মুক্ত দর্শক সমাবেশে শুরু হয় উন্মাতাল উদযাপন। কিন্তু সেখানে একজনও আর্জেন্টাইন ছিলেন না। আকাশি-সাদা বিখ্যাত আলবিসেলেস্তে জার্সি পরে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে উদযাপন করা হাজারো সমর্থক ছিলেন বাংলাদেশের মানুষ। ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন শহরেও একই রকম পথের ধারে আবেগঘন দর্শক সমাবেশ দেখা গেছে। মেসি ও তার সতীর্থদের এসব দেশের সমর্থকরা যেন নিজেদের দল হিসেবেই গ্রহণ করেছেন। এর একটি বড় কারণ হলো, তাদের নিজ নিজ দেশ বারবারই বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ১০টি দেশের মধ্যে বর্তমান বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পেরেছে মাত্র দুটি। তারা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল। অন্য দুটি দেশ রাশিয়া ও নাইজেরিয়া আগের একাধিক বিশ্বকাপে খেলেছে। চীন ও ইন্দোনেশিয়া ফুটবলের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই বৈশ্বিক আসরে অংশ নিয়েছে মাত্র একবার করে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত, পাশাপাশি বাংলাদেশ, ইথিওপিয়া ও পাকিস্তান এখনো বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্নই দেখে। যদিও ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল, তবে টুর্নামেন্ট শুরুর এক মাসেরও কম সময় আগে তারা নাম প্রত্যাহার করে নেয়। এ খবর দিয়ে অনলাইন বিবিসি দীর্ঘ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বাংলাদেশের ফুটবলের দৈন্যদশাও তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের খ্যাতিমান অভিনেতা, লেখক ও ফুটবলপ্রেমী অদিতি করিম বলেন, লাখো-লাখো ফুটবল সমর্থকের একটি দেশ ফুটবলে এতটা পিছিয়ে থাকবে, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে জনসংখ্যা কেন ফুটবল সাফল্যের নির্ভরযোগ্য নির্দেশক নয়? তাত্ত্বিকভাবে কোনো দেশের জনসংখ্যা যত বেশি, সম্ভাব্য খেলোয়াড়ের সংখ্যাও তত বেশি হওয়ার কথা। এ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জেতা আটটি দেশের মধ্যে সাতটি হলো আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও স্পেন। তারা তুলনামূলকভাবে বড় জনসংখ্যার দেশ। একমাত্র ব্যতিক্রম উরুগুয়ে। যদিও তার ব্যাখ্যা পরে আসছে।
তবে বৃটিশ শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ স্টেফান সিজমানস্কির মতে, জনসংখ্যা ফুটবল সাফল্যের বহু গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের মাত্র একটি। বেস্টসেলার বই ‘সকারনমিকস’-এর সহ-লেখক সিজমানস্কি বলেন, ফুটবল অনেকটা জাতীয় অর্থনীতির মতো। উন্নতি করতে মানুষের প্রয়োজন হয়। কিন্তু পাশাপাশি মূলধন ও অবকাঠামোও দরকার। তিনি বলেন, ফুটবলের ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং প্রতিভা খুঁজে বের করার সক্ষমতা। সিজমানস্কির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অধিকাংশ সফল ফুটবল দেশের আরেকটি মিল হলো তারা ধনী দেশ। ‘সকারনমিকস’ বইয়ে সিজমানস্কি ও তার সহ-লেখক সাইমন কুপার দেখিয়েছেন, কোনো দেশের বড় শিরোপা জিততে সাধারণত মাথাপিছু বার্ষিক গড় আয় কমপক্ষে ১৫ হাজার ডলার হওয়া প্রয়োজন
কিন্তু ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মাথাপিছু আয় এই সীমার অনেক নিচে হলেও তারা দু’দেশ মিলিয়ে আটটি বিশ্বকাপ জিতেছে। সিজমানস্কির মতে, এটিই তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটির গুরুত্ব প্রমাণ করে- অভিজ্ঞতা ও ফুটবল-জ্ঞান। তিনি বলেন, এটি আসে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে। যেসব দেশ আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতেছে, তারা প্রায় ১০০ বছর আগেই ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করেছিল, যখন উপনিবেশবাদ শেষ হয়নি।
অন্যদের জন্য দীর্ঘ পথ
সহজভাবে বললে, যেসব দেশ নিয়মিত বিশ্বকাপে অংশ নেয় এবং সফল হয়, তারা ইতিহাসজুড়ে অনেক বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে, বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপের মতো অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ অঞ্চলে। এ কারণেই মাত্র ৩৫ লাখ জনসংখ্যার দক্ষিণ আমেরিকার দেশ উরুগুয়ে ১৯৩০ ও ১৯৫০ সালে দুটি বিশ্বকাপ জিততে পেরেছিল। উরুগুয়ের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়েছিল ১৯০২ সালে, যেখানে তারা আর্জেন্টিনার কাছে ৬-০ গোলে হেরেছিল। সেটি ছিল ব্রাজিলের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচেরও ১২ বছর আগে। অন্যদিকে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অনেক পরে আত্মপ্রকাশ করেছে, অথবা সেখানে ফুটবলের বিকাশ হয়েছে আরও পরে। ফলে তাদের অনেক বেশি পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। কিছু দেশ অবশ্য ব্যতিক্রমী সাফল্য দেখিয়েছে।
১৯৫৬ সালে স্পেন ও ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীন হওয়া মরক্কো ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে পৌঁছে ইতিহাসের প্রথম আফ্রিকান দেশ হয়। দক্ষিণ কোরিয়া ২০০২ সালে যৌথ আয়োজক হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠে শেষ পর্যন্ত শীর্ষ চারে থাকা একমাত্র এশীয় দেশ। কিন্তু সিজমানস্কি বলেন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, বাংলাদেশসহ আরও কিছু দেশকে আমরা এখনো এগিয়ে আসতে দেখছি না। তার মতে, এসব দেশ সম্পদ ও দক্ষতার অভাবে পিছিয়ে রয়েছে। এমনকি বিনিয়োগ বাড়লেও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ঘাটতি তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে থাকবে।
ইথিওপিয়া কখনোই বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তারা ১৯৬২ সালে আফ্রিকান কাপ অব নেশনস জিতেছিল। তবে বিশ্বকাপে ওঠার সবচেয়ে বড় সুযোগ এসেছিল ২০১৪ সালের বাছাইপর্বে। শেষ ধাপে উঠলেও দুই লেগ মিলিয়ে নাইজেরিয়ার কাছে হেরে যায়। বর্তমানে দেশটির ফুটবল স্থানীয় গণমাধ্যমের ভাষায় তীব্র বিনিয়োগ সংকটে ভুগছে। এর একটি উদাহরণ হলো, চলমান পেশাদার লিগে উপযুক্ত স্টেডিয়ামের অভাবে ৩৮০টিরও বেশি ম্যাচ মাত্র তিনটি অনুমোদিত স্টেডিয়ামে আয়োজন করতে হয়েছে। ইথিওপিয়ান প্রিমিয়ার লিগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কিফলে সাইফে ২৭ জুন দ্য রিপোর্টার পত্রিকাকে বলেন, এই মৌসুমে আমরা মাত্র তিনটি অনুমোদিত স্টেডিয়াম ব্যবহার করে ৩৮০টির বেশি ম্যাচ আয়োজন করেছি। স্টেডিয়ামের এই সংকটের কারণে জাতীয় দলকেও আফ্রিকান বাছাইপর্বে নিজেদের হোম ম্যাচ মরক্কোতে খেলতে হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিকেট-বাধা, নাকি অজুহাত?
কিছু দেশ অন্য খেলায় সাফল্যের কারণেও ফুটবলে পিছিয়ে পড়েছে। ভারত বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ক্রিকেট দেশ এবং তাদের পেশাদার লিগ আইপিএল বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট লিগ। ভারতের সাবেক আন্তর্জাতিক ফুটবলার শ্যাম থাপার মতে, এর ফলে ফুটবলে খেলোয়াড় সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, আইপিএলের সাফল্যের কারণে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকরা সন্তানদের ফুটবলের বদলে ক্রিকেটের দিকে বেশি উৎসাহিত করছেন। থাপা বলেন, তাদের বোঝা উচিত, ফুটবলেও সফল ক্যারিয়ার গড়ে ভালো অর্থ উপার্জন করা সম্ভব। তবে অদিতি করিম মনে করেন, ক্রিকেটকে দায়ী করা ঠিক নয়। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডও ক্রিকেটের শক্তিধর দেশ হয়েও ফুটবলে উন্নতি করছে এবং বিশ্বকাপে খেলছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, ক্রিকেটের জনপ্রিয়তাকে দায়ী করা নিছক অজুহাত। তিনি আরও বলেন, বিশ্বকাপে খেলার মতো প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় কাঠামোগত প্রণালি আমাদের নেই।News
চীন কি ঘুমন্ত দৈত্য?
চীনের পরিস্থিতি আরও রহস্যময়। কয়েক দশকে অলিম্পিকে তারা বিশ্বের অন্যতম সফল দেশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু পুরুষ ফুটবলে সেই সাফল্যের প্রতিফলন ঘটেনি। বেইজিংভিত্তিক চীনা ফুটবল বিশেষজ্ঞ মার্ক ড্রেয়ার বলেন, তাত্ত্বিকভাবে বিশ্বমানের ফুটবলার তৈরি করতে না পারার কোনো কারণ চীনের নেই। তার মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ। তিনি বলেন, চীনে সবকিছু রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে এবং সিদ্ধান্ত আসে ওপর থেকে। ফুটবল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ফুটবল বোঝেন এমন মানুষের, কিন্তু সেখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ অনেক বেশি। ২০১০-এর দশক থেকে বিপুল বিনিয়োগ করা হলেও চীন ২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপে ফিরতে পারেনি। সেই বিনিয়োগের অংশ হিসেবে দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপের বহু খ্যাতনামা খেলোয়াড়কে চীনা লিগে আনা হয়েছিল, যাতে স্থানীয় ফুটবলের মান উন্নত হয়। চীনের মতো ইন্দোনেশিয়াও একবার বিশ্বকাপে খেলেছিল ১৯৩৮ সালে। তখন দেশটি নেদারল্যান্ডসের উপনিবেশ ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ নামে অংশ নিয়েছিল। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তারা শেষ রাউন্ড পর্যন্ত উঠেছিল। বিবিসির ইন্দোনেশিয়ান বিভাগের নিউজ এডিটর জেরোম উইরাওয়ানের মতে, এর পেছনে মূল কারণ ছিল স্থানীয় খেলোয়াড় নয়, বরং ইন্দোনেশীয় বংশোদ্ভূত ইউরোপীয় খেলোয়াড়দের দলে অন্তর্ভুক্ত করা। তিনি বলেন, অনেক সময় ইন্দোনেশিয়ার শুরুর একাদশে আট কিংবা নয়জনই ইউরোপে জন্ম নেয়া খেলোয়াড় ছিলেন।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এশিয়ান বাছাইপর্বে ছয় ম্যাচে কোনো জয় ছাড়াই গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নেয়। এদিকে পাকিস্তানের ফুটবল ফেডারেশনে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তিনবার দেশটিকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করেছিল ফিফা।
তবুও উৎসবের আনন্দ
তাই বহু দেশের ফুটবল সমর্থকের কাছে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন এখনো অনেক দূরের।
তবে অদিতি করিমের মতে, আপাতত সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো এই বৈশ্বিক উৎসবের আনন্দ উপভোগ করা। তিনি বলেন, বাস্তবতা বিবেচনায় আমার জীবদ্দশায় বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে খেলতে দেখার কোনো সম্ভাবনা আমি দেখি না। তবুও বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা বিশ্বকাপের প্রতিটি মুহূর্তের আনন্দ উপভোগ করতে চাইবেন। উৎস: মানবজমিন।