শিরোনাম
◈ যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক সদর দপ্তর ‘দি অক্টাগন’ উদ্ভোধন করল মিশর ◈ ‌বিশ্বকা‌পে এবার ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা কতদূর যাবে,জা‌নি‌য়ে দি‌লো সুপারকম্পিউটার  ◈ বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়াতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের নতুন পরিকল্পনা ◈ বিশ্বের ১০ জনবহুল দেশের ৮টিই নেই বিশ্বকাপে: কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ-ভারত? ◈ মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাবে ৫ জেলায় বন্যার সতর্কতা জারি ◈ আওয়ামী লীগের বিচার কিভাবে করতে চাইছে সরকার ◈ মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হলে নিষিদ্ধ হতে পারে আওয়ামী লীগ: চিফ প্রসিকিউটর ◈ ট্রাম্প-পুতিন ৯০ মিনিটের ফোনালাপ, যে কথা হলো ◈ হামের সংক্রমণ অব্যাহত, ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ শিশুর মৃত্যু ◈ করদাতাদের সতর্ক করল এনবিআর, জারি ৪ নির্দেশনা

প্রকাশিত : ০৫ জুলাই, ২০২৬, ০৯:২৮ রাত
আপডেট : ০৫ জুলাই, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

একনেকের অনুমোদন মিললেও তিন দশকেও আলোর মুখ দেখেনি খানজাহান আলী বিমানবন্দর

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, বাগেরহাট: বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার ফয়লা। প্রায় তিন দশক আগে এখানেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের সামনে দেখানো হয়েছিল এক নতুন স্বপ্ন—আন্তর্জাতিক মানের একটি বিমানবন্দর। বলা হয়েছিল, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন, মোংলা ইপিজেড এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্প ও পর্যটনের নতুন দুয়ার খুলে দেবে এই বিমানবন্দর। কিন্তু ৩০ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই স্বপ্ন আজও রানওয়ের মাটি ছুঁতে পারেনি।

এই সময়ে সরকার বদলেছে, নীতিমালা বদলেছে, প্রকল্পের ধরন বদলেছে। একাধিকবার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছে, একনেকে অনুমোদন মিলেছে, অধিগ্রহণ হয়েছে শত শত একর জমি, ব্যয় হয়েছে কোটি কোটি টাকা। অথচ আজও সেখানে নেই একটি রানওয়ে, নেই টার্মিনাল ভবন, নেই বিমান চলাচলের কোনো অবকাঠামো। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে কেবল কয়েকটি কংক্রিটের সীমানা পিলার, আংশিক ভরাট করা জমি আর অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির নীরব সাক্ষ্য।

এখন প্রশ্ন উঠেছে—একাধিক সরকারি সিদ্ধান্ত, বিপুল জমি অধিগ্রহণ ও অর্থ ব্যয়ের পরও কেন বাস্তবায়িত হলো না খানজাহান আলী বিমানবন্দর? পরিকল্পনার দুর্বলতা, রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তন, নাকি বাস্তবায়নে প্রশাসনিক ব্যর্থতা—এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর আজও মেলেনি।

সম্ভাবনার কেন্দ্রে থেকেও যোগাযোগে পিছিয়ে

মোংলা সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে বর্তমানে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। বন্দরের সক্ষমতা বাড়ছে, মোংলা ইপিজেডে বাড়ছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, সম্প্রসারিত হচ্ছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। অন্যদিকে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে ঘিরে প্রতি বছর বাড়ছে পর্যটকের সংখ্যা। দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, নাবিক ও পর্যটকদের নিয়মিত যাতায়াত থাকলেও এ অঞ্চলে এখনো বিমান যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর নির্মিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসত। ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে যুক্ত হতো নতুন মাত্রা। মোংলা বন্দরের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেত।

১৯৯৬ সালে যাত্রা, তারপর থমকে যাওয়ার ইতিহাস

সরকারি নথি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন এটি শর্ট টেক-অফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং (এসটিওএল) বিমানবন্দর হিসেবে নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এ লক্ষ্যে প্রায় ৪১ দশমিক ৩০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ এবং আংশিক ভরাটের কাজ সম্পন্ন হয়। সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবু সালেহ মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের উদ্যোগেই প্রকল্পটির সূচনা হয়েছিল।

এরপর দীর্ঘ সময় প্রকল্পটি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ঘোষণা, কিন্তু কাজ এগোয়নি

২০১১ সালের ৫ মার্চ প্রকল্পটিকে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে রূপ দেওয়ার ঘোষণা দেয় তৎকালীন সরকার। এ জন্য আরও ৬২৬ দশমিক ৬৩ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ২০১৫ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় এবং একই বছরের জুলাইয়ে পুনরায় কাজ শুরু হয়।

জমি অধিগ্রহণ, মাটি ভরাট এবং সীমানা নির্ধারণের কিছু কাজ হলেও স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ আর এগোয়নি। সরেজমিনে দেখা যায়, বিমানবন্দরের নির্ধারিত এলাকাজুড়ে এখনো কৃষিজমি ও খোলা প্রান্তর। পরিকল্পিত সীমানা প্রাচীরের পরিবর্তে ছড়িয়ে রয়েছে কেবল কয়েকটি কংক্রিটের পিলার।

শত কোটি টাকার জমি, তারপরও অচল প্রকল্প

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫৩৬ একর জমি অধিগ্রহণের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। জমির মূল্য নির্ধারণ করা হয় প্রায় ৩১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় ৪৩ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়।

তবে পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ায় প্রকল্পটির অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নতুন করে পর্যালোচনা করা হয়। পরে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে বিনিয়োগকারী খোঁজা হলেও কোনো প্রতিষ্ঠান আগ্রহ না দেখানোয় প্রকল্পটি কার্যত থেমে যায়।

অর্থনীতির জন্য এখনো কি প্রয়োজনীয়?

অবকাঠামো ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, মোংলা সমুদ্রবন্দর, সুন্দরবন, মোংলা ইপিজেড, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দ্রুত সম্প্রসারিত শিল্পাঞ্চল বিবেচনায় বিমানবন্দরটির প্রয়োজনীয়তা এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বরং ভবিষ্যতের শিল্পায়ন, রপ্তানি, পর্যটন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য এটি কৌশলগত অবকাঠামো হতে পারে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন—দায় নেবে কে?

স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বছরের পর বছর উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি শুনলেও বাস্তবে তারা পেয়েছেন কেবল বিরান জমি আর কয়েকটি সীমানা পিলার। তাদের ভাষায়, বিমানবন্দরটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতো। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা, নীতিগত পরিবর্তন এবং সিদ্ধান্তহীনতায় সেই সম্ভাবনা আজও অধরাই রয়ে গেছে।

তাদের দাবি, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার নতুন করে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করুক। কারণ, খানজাহান আলী বিমানবন্দর এখন শুধু একটি অসমাপ্ত অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়ন পরিকল্পনায় দীর্ঘসূত্রতা, নীতিগত অস্থিরতা এবং অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির এক জীবন্ত প্রতীক। *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়