শিরোনাম
◈ ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল, বর্ধিত বেতন কবে হাতে পাবেন চাকরিজীবীরা ◈ জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্পে বিশ্বমঞ্চে শীর্ষে বাংলাদেশ, বছরে আয় ২.১ বিলিয়ন ডলার ◈ বাংলাদেশের ভেতরে স্থলমাইন পুঁতছে কারা? সীমান্তবাসীর আতঙ্ক বাড়ছে ◈ মমতাকে সরিয়ে তৃণমূলের নতুন চেয়ারম্যান অরূপ রায় ◈ আয়ের চেয়ে ৩২ গুণ বেশি খরচ বিটিভির ◈ ‌বিশ্বকা‌পে ইরা‌নের এই খেলোয়াড়দের মনে রাখবে ইতিহাস এবং ভবিষ‍্যৎ প্রজন্ম, বল‌লেন কোচ ◈ খেলার দুই অ‌র্ধে হাইড্রেশন ব্রেকের কারণে ছন্দ নষ্ট হয়, বল‌লেন আ‌র্জেন্টিনার কোচ স্ক্যালোনি  ◈ বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া এফটিএ: বাণিজ্য সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু ◈ ইরা‌নের মর্যাদা‌ রক্ষায় বিশ্বকা‌পে ফুটবলাররা যুক্তরাষ্ট্রে লড়াই করছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ আ. লীগের তৎপরতা ঘিরে ঢাকাসহ ৬ জেলায় সেনা মোতায়েন

প্রকাশিত : ২২ জুন, ২০২৬, ০৬:২৬ বিকাল
আপডেট : ২২ জুন, ২০২৬, ০৮:০২ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

দিনে ৩৪০০ মামলা! উচ্চ ও অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলা ৪৭ লাখ ৯১ হাজার ৯২১

ডেস্ক রি‌পোর্ট : গত এক-দেড় দশক ধরে মামলার সীমাহীন সংখ্যাধিক্য ও বহুল বিস্তার ‘জট’ ‘পাহাড়সম’ ‘চূড়া’ ‘চাপ’ ‘বোঝা’ ‘মহাজট’ এমন নানা নামে অভিহিত। এসব নামকরণের কারণও যথেষ্ট যৌক্তিক। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে উচ্চ ও অধস্তন আদালতে দেওয়ানি, ফৌজদারি বা অন্যান্য মামলার যে ঊর্ধ্বগতি তাতে এই পরিস্থিতিকে প্রচলিত আর কোনো বিশেষণে বিশেষায়িত করতে চান না আইন ও বিচার বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রায় বাইরে চলে গেছে। আর একই সঙ্গে বিচারাকাক্সক্ষীর যন্ত্রণা বহু গুণে বেড়েছে।  

২০০৭ সালের নভেম্বরে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকের সময় দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৪ কোটির কিছু বেশি। আর এখন ১৮ কোটি। ওই সময় উচ্চ ও অধস্তন আদালত মিলিয়ে বিচারাধীন মামলা ছিল প্রায় ১৬ লাখ। প্রায় ১৯ বছর পরের বাস্তবতা হলো, মামলার এই বহুল বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আসেনি মোটেই। আইন ও বিচারাঙ্গনে এর নেতিবাচক পরিস্থিতিও দৃশ্যমান।---- দেশরূপান্তর 

দেড় দশকের কিছু বেশি সময় পর মামলা বেড়ে এখন তিনগুণ অর্থাৎ প্রায় ৪৮ লাখ এবং গত ছয় বছরে দিনে গড়ে মামলা রুজু (বিচারের জন্য আদালতে আসা বা দায়ের) হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার (৩,৪৪৩) করে।

সুপ্রিম কোর্ট থেকে গত মার্চ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন বা অনিষ্পন্ন মামলা ৪৭ লাখ ৯১ হাজার ৯২১। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৯৭৩, হাইকোর্টে ৬ লাখ ৭৪ হাজার ৫১৬ মামলা বিচারাধীন। আর অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলা ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, কর্মে থাকা ও অবসরে যাওয়া জেলা ও দায়রা বিচারকদের কাছে প্রশ্ন ছিল, বিচারাধীন মামলা এত বেশি কেন? কেন এই পরিস্থিতির লাগাম টানা যাচ্ছে না। উত্তরে তারা বলেছেন, জনসংখ্যার ব্যাপক আধিক্যে সঙ্গত কারণেই মানুষের সমস্যা ও অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে। জমি-জমা নিয়ে বিরোধ,  অপেক্ষাকৃত লঘু মামলায় বিকল্প সমাধানে অনাগ্রহ, আদালতের ওপর বিশ্বাসযোগ্যতা ও নির্ভরশীলতা, আইন ভাঙার প্রবণতা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিথ্যা অভিযোগের মামলা, আইনের শাসনের ঘাটতি, একটির পর একটি আইনি ধাপ এবং মামলার কারণ না কমা এ সংকটের কারণ। 

বিপরীতে মামলা নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর পরিকল্পনা, মহাপরিকল্পনা ও উদ্যোগের ঘাটতি, বিচারক ও অবকাঠামো সংকট, মামলায় ঘন ঘন শুনানি মুলতবি, আদালত অঙ্গনে দুর্নীতি মানুষের দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকারে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘মামলার সংখ্যা এত বেশি যে, পুরো প্রক্রিয়া এলোমেলো হয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। একটা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আমরা পড়ে গেছি। এটি একটি জটিল অবস্থা এবং এ থেকে মুক্তির কোনো পথ দেখছি না। তবে, শুধু চিঠি চালাচালি, সেমিনার ও নির্দেশনা নয়, সরকার যদি মহাপরিকল্পনা করে নিশ্চয়ই কোনো সমাধান আছে।’ মামলা উৎপাদনের কারণ কমানোর তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘জমিজমা নিয়ে মামলা বাড়ছে। অন্যদিকে সরকারগুলো অনেক  ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয় না, সেজন্যও  মামলা বাড়ে। আইনের শাসন যথাযথভাবে কাজ করছে না। যখন সরকার আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে, আইনের শাসন বাড়বে তখন মামলা এত বেশি বাড়বে না।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করলেও তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।  

পরিসংখ্যানে যা মিলেছে : ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে আপিল বিভাগে ২৩ হাজার ৬১৭, হাইকোর্টে ৪ লাখ ২৩ হাজার ৮০, অধস্তন আদালতে ৩১ লাখ ৭২ হাজার ৪৩ এবং বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত ও পুনরুজ্জীবিত ৩ লাখ ৫২ হাজার ৩৩০ মামলাসহ মোট বিচারাধীন মামলা ছিল ৩৬ লাখ ১৮ হাজার ৭৪০। ওই বছর দায়ের অর্থাৎ বিচারের জন্য আসে আরও ১১ লাখ ১ হাজার ২৭১ মামলা। সব মিলিয়ে ২০২০ সালে বিচারাধীন ৫০ লাখ ৭২ হাজার ৩৪১ মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ৭ লাখ ৩৯ হাজার ৫৬৩টি।

২০২১ সালে আপিল বিভাগে ১৫ হাজার ২২৫, হাইকোর্টে ৪ লাখ ৫২ হাজার ৯৬৩, অধস্তন আদালতে ৩৪ লাখ ৬৪ হাজার ৯৯৮ মামলার সঙ্গে প্রাপ্ত ও পুনরুজ্জীবিত মামলা যুক্ত হয় ৫ লাখ ১ হাজার ৫০৮ মামলা। ওই বছর দায়ের হয় ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৪২০ মামলা। ২০২১ সালে বিচারাধীন ৫৭ লাখ ২৮ হাজার ১১৪ মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ৯ লাখ ১১ হাজার ৮৫২ মামলা।

২০২২ সালে আপিল বিভাগে ১৬ হাজার ১৭২, হাইকোর্টে ৫ লাখ ১২ হাজার ৫৭৬ এবং অধস্তন আদালতে ৩৬ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮৯ মামলার সঙ্গে প্রাপ্ত ও পুনরুজ্জীবিত মামলা ছিল ৬ লাখ ৬২ হাজার ৬৬১ মামলা। সে বছর দায়ের হয় ১৫ লাখ ৭১ হাজার ৬১৭ মামলা। ২০২২ সালে মোট ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৭০৬ মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ১৪ লাখ ৭১ হাজার ৪০২ মামলা।

২০২৩ সালে আপিল বিভাগে ১৯ হাজার ৯২৮, হাইকোর্ট বিভাগে ৫ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৪ এবং অধস্তন আদালতগুলোয় ৩৬ লাখ ৭৮ হাজার ৪২৭ মামলার সঙ্গে প্রাপ্ত ও পুনরুজ্জীবিত মামলা ছিল ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৯৭৬ মামলা। সে বছর দায়ের হয় ১৫ লাখ ৪২ হাজার ৫২১ মামলা। ২০২৩ সালে মোট ৬৪ লাখ ৩ হাজার ৫৭১ মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ১৪ লাখ ১৬ হাজার ৭৫০ মামলা।

২০২৪ সালে আপিল বিভাগে ২৬ হাজার ৫১৭, হাইকোর্টে ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৮৭৪ এবং অধস্তন আদালতে ৩৭ লাখ ২৯ হাজার ২৩৫ মামলার সঙ্গে সে বছর প্রাপ্ত ও পুনরুজ্জীবিত মামলা ছিল ৭ লাখ ১৯ হাজার ৭৬৫ মামলা। ওই বছর দায়ের হয় ১৪ লাখ ৭৩ হাজার ৭৩ মামলা। ২০২৪ সালে মোট ৬৪ লাখ ৯২ হাজার ৪৩৭ মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ১২ লাখ ১ হাজার ২৪০ মামলা।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত উচ্চ ও অধস্তন আদালতে দায়ের বা বিচারের জন্য এসেছে ৭৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৯ মামলা। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে ১২ লাখ ৩৬ হাজার ৪০০ মামলা এসেছে আদালতে। মাসের হিসেবে তা ১ লাখ ৩ হাজার ৩৩ হাজার এবং দিনের হিসাবে মামলা আসছে ৩ হাজার ৪৩৪টি। তবে, বছরে সাপ্তাহিক ছুটি (১০০-এর কিছু বেশি দিন) এবং সরকার ঘোষিত ও অন্যান্য ছুটিসহ মোট ছুটি রয়েছে গড়ে ১৩০ কার্যদিবস। এ কার্যদিবসগুলো বাদ দিলে দিনের বিচারাধীন মামলা এর চেয়ে বেশি হবে। 

পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, ছয় বছরে (২০২০ থেকে ২০২৫) কমপক্ষে ৫০ লাখ থেকে ৬৪ লাখ মামলার বিপরীতে বছরে গড়ে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১০ লাখ ৭ হাজার ৮৮৫ মামলা। সাপ্তাহিক ও অন্যান্য ছুটি বাদ দিলে নিষ্পত্তিকৃত মামলা আরও কিছু কমবে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ এস এম শাহজাহান বলেন, সংকট নিরসনে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিই বড় সমাধান এবং অনেক ক্ষেত্রে এর সুযোগও রয়েছে। তিনি বলেন, ‘কোনো মামলা আদালতে আসার পর দুই বছরের মধ্যে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করতে হবে, এমন বিধান থাকলে মামলার বিস্তার অনেকটাই কমে যেত। কিন্তু সেটি এই পরিস্থিতিতে সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তবু চেষ্টা করতে হবে। মামলা নিয়ে মানুষের দুর্দশা কমাতে হবে। 

অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শাহজাহান সাজু  বলেন, অধস্তন আদালতে কমপক্ষে ১০ হাজার (এখন বিচারকর্মে আছেন ২ হাজারের মতো) বিচারক প্রয়োজন। এর সঙ্গে প্রয়োজন আদালতের অবকাঠামো সংকট দূর করা। তিনি বলেন, ‘মামলার সীমাহীন সংখ্যাধিক্যে লাভ হচ্ছে সরকারের (মামলার নথিপত্রের রাজস্ব), আইনজীবীর ও আদালতের কর্মচারীদের।

বিচারাকাক্সক্ষীর লাভের অঙ্কে তেমন কিছু নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে শুধু প্রতিপক্ষ বানিয়ে হয়রানি করার জন্যও মামলা হয়। তবে, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হলে এ প্রবণতাও কমে আসবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়