নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রচলিত সহায়তানির্ভর সম্পর্ক থেকে সরে এসে বাংলাদেশের সঙ্গে বিনিয়োগনির্ভর শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, দুই দেশের যৌথ সমৃদ্ধির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখন বাণিজ্য ও বিনিয়োগকেন্দ্রিক নতুন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত ‘অ্যাডভান্সিং ইউএস-বাংলাদেশ ইকোনমিক পার্টনারশিপ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের নীতিসংলাপে এ কথা বলেন তিনি।
ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমরা অতীতের ব্যর্থ নীতি থেকে সরে আসছি, যেখানে ভ্রান্ত বাণিজ্য সম্পর্ক, রেন্ট-সিকিং ও অস্বচ্ছ বাজার ব্যবস্থাকে সহ্য করা হতো। এর পরিবর্তে আমরা এমন একটি নীতির দিকে এগোচ্ছি, যা দুই দেশের মানুষের জন্য সুফল বয়ে আনবে। এটি সহায়তার বদলে বাণিজ্য, সহায়তার বদলে বিনিয়োগ ও প্রকৃত অংশীদারত্বের ওপর জোর দেয়।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে সদ্য স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি)-কে একটি রূপান্তরমূলক কাঠামো হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ১৯ শতাংশ কম শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে পারবে, যেখানে এমন ব্যবস্থা না থাকলে ৩৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হতো। তিনি বলেন, এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে অশুল্ক বাধা কমানো ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চমানসম্পন্ন পণ্য আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ভারসাম্য আসে।
বাণিজ্যিক প্রতিশ্রুতির বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য— গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, মার্কিন গমে বিকল্প উৎসের তুলনায় অপচয় কম হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, কৌশলগত অবস্থান ও ক্রমবর্ধমান কর্মশক্তির প্রশংসা করে রাষ্ট্রদূত বলেন, আরও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রয়োজন।
চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা, নীতিনির্ধারণে স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছতা এবং ব্যবসা পরিচালনায় আধুনিকায়নকে তিনি অগ্রাধিকারযোগ্য বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আস্থা গড়ে উঠতে হলে চুক্তির সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাসমূহে অনিয়ম হ্রাস, অতিরিক্ত করের চাপ হ্রাস ও বৈষম্যহীন লাইসেন্সিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন তিনি।
রাষ্ট্রদূত এ সময় শুল্ক প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম ও পরিবেশগত মান অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। ডিজিটাল অর্থনীতির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো বড় অংশের লেনদেন নগদভিত্তিক, যা ভিসা ও মাস্টারকার্ডের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ডিজিটাল আর্থিক সেবা সম্প্রসারণের বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, স্টারলিংক, গুগল পে ও মাইক্রোসফটের মতো শীর্ষ মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে আগ্রহ বাড়ছে।
প্রযুক্তি খাতের বাইরে রেলপথ, বন্দর ও বেসামরিক বিমান চলাচলসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো খাত আধুনিকায়নেও বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে লজিস্টিকস, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
বক্তব্যের শেষে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে জুলাইয়ে আয়োজিত ‘আমেরিকা উইক’-এ অংশ নিতে ব্যবসায়ী সমাজকে আমন্ত্রণ জানান রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও যৌথ সমৃদ্ধি এগিয়ে নেওয়াই হবে মূল লক্ষ্য।