গ্রিসের কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে ‘লাল সোনা’খ্যাত স্ট্রবেরির অবস্থান ক্রমেই শক্ত হচ্ছে। আর এ শিল্পের পেছনে নীরবে বড় ভূমিকা রেখে চলেছেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা। পশ্চিম গ্রিসের ইলিয়া অঞ্চলের নয়া মানোলাদা ও আশপাশের এলাকায় বছরের পর বছর ধরে দক্ষিণ এশীয় শ্রমিকদের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে স্ট্রবেরি চাষের বড় একটি অংশ। কিন্তু ইউরোপের বাজারে এ ফলের চাহিদা বাড়লেও এর পেছনে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকদের যে অবদান তার যথাযথ সামাজিক ও আর্থিক স্বীকৃতি নেই। তাই তারা এখন কৃষিকাজ ছেড়ে হোটেল ও পর্যটন খাতের দিকে ঝুঁকছেন। জার্মানির Leibniz Lab-এর ২০২৬ সালের একটি গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে নয়া মানোলাদা এলাকায় কৃষিকাজে নিয়োজিত অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা ৪ হাজার ৫০০-এর বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও বাস্তবে অন্তত ১০ হাজারের মতো বাংলাদেশি এই খাতে কাজ করছেন। তাদের বড় অংশই স্ট্রবেরি চাষের সঙ্গে যুক্ত। তবে গ্রিসের স্ট্রবেরি শিল্পে বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের উপস্থিতি থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে এই শ্রমবাজারে নতুন পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে শ্রমিকপ্রাপ্তি। বৈধ কাগজপত্রধারী অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক এখন কৃষির বাইরে পর্যটন, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ তুলনামূলক ভালো কর্মপরিবেশের কাজ বেছে নিচ্ছেন। ফলে স্ট্রবেরি চাষের মতো শারীরিকভাবে কঠিন ও মৌসুমি কাজে শ্রমিকের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। একসময় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক এ অঞ্চলের প্রধান শ্রমশক্তি ছিলেন। তাদের একটি অংশ ২০২৪ সাল থেকে বৈধ কাগজ পাওয়ার পর অন্য খাতে চলে যাওয়ায় কৃষকদের এখন নতুন শ্রমিকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বাংলাদেশিদের পাশাপাশি নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে আসা শ্রমিকরাও এখন এ অঞ্চলের কৃষিকাজে যুক্ত হচ্ছেন।
তবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘদিনের উপস্থিতির কারণে তাদের গুরুত্ব এখনো কমেনি। ভাসিলিস নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘বাংলাদেশি শ্রমিকরা এ এলাকার কৃষিতে অভিজ্ঞ। তারা না থাকলে মৌসুমের সময়ে শ্রমিকের ঘাটতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এখন শ্রমিক ধরে রাখা আগের চেয়ে কঠিন হয়েছে।’ ৮ বছর ধরে গ্রিসে কৃষিকাজ করেছেন সুনামগঞ্জের রফিকুল। বৈধ কাগজ পাওয়ার পর এখন রেস্তোরাঁয় কাজ করছেন তিনি। রফিকুল বলেন, ‘আগে স্ট্রবেরির মাঠে কাজ করতাম। কাগজ হওয়ার পর রেস্তোরাঁয় কাজ পেয়েছি। এখানে সারা বছর কাজের সুযোগ আছে এবং কাজের পরিবেশও ভালো। সরকারি সব সুযোগসুবিধা মিলে। শহরের ভালো পরিবেশে থাকি। তাই আমার মতো অনেকেই এখন কৃষি থেকে রেস্টুরেন্ট বা পর্যটন খাতে যেতে চান।’ সোহেল নামে আরেক বাংলাদেশি যুবক বলেন, ‘স্ট্রবেরির কাজের ধরন এখনো কঠিন। স্ট্রবেরি চাষে চারা লাগানো, পরিচর্যা, ফল সংগ্রহ, বাছাই ও প্যাকেজিংয়ের মতো কাজে মৌসুমজুড়ে বিপুল শ্রমের প্রয়োজন হয়। শীতকাল থেকেই অনেক এলাকায় চাষের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় এবং কয়েক মাস ধরে চলে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ।’
এদিকে গ্রিসের স্ট্রবেরি বহু বছর ধরেই উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই লাভজনক শিল্পের সামনে এখন দুটি বিপরীত চিত্র। একদিকে ইউরোপের বাজারে গ্রিক স্ট্রবেরির চাহিদা, অন্যদিকে মাঠে শ্রমিকসংকট। সম্প্রতি মানোলাদা নিয়ে স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে শ্রমিকদের অতিরিক্ত কাজের চাপ, গাদাগাদি করে বসবাস এবং অনিশ্চিত জীবনযাপনের বিষয়ও উঠে এসেছে। অর্থাৎ কৃষি উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর সঙ্গে শ্রমিকদের জীবনমানের প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তারা দিনরাত পরিশ্রম করে দেশটির অর্থনীতিকে শক্তিশালী করলেও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শ্রমিকদের অনেকেই থাকেন খোলা আকাশের নিচে তাঁবুতে বা স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘পারাঙ্গা’। এটি এক ধরনের অস্থায়ী ঘর। যেখানে প্রায়ই অগ্নিকাে র ঘটনা ঘটে। কৃষি খাতে নিয়োজিত মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে এখানে স্ট্রবেরির কাজ করছি। মৌসুমে ভোর থেকে মাঠে যেতে হয়। কাজ কষ্টের হলেও অনিয়মিত বাংলাদেশিদের জন্য এ খাত এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তবে কাগজপত্র হয়ে গেলে অনেকে কৃষির বদলে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।’
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন