বিশেষ প্রতিনিধি, নিউইয়র্ক (জাতিসংঘ): জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস সামাজিক ব্যবসা, ক্ষুদ্রঋণ ও ‘থ্রি জিরো’ বিশ্বের ধারণা নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে শান্তি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শব্দের সঠিক অর্থ বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।
বক্তব্যের শুরুতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নবনির্বাচিত সভাপতি ড. খলিল রহমান এবং তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু প্রেসিডেন্ট হোসে রামোস হোর্তাকে ধন্যবাদ জানান ড. ইউনূস।
বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে কূটনীতি ও বিভিন্ন পরিভাষার ব্যবহারে অনেক সময় শব্দের প্রকৃত অর্থ হারিয়ে যাচ্ছে। শান্তির কথা বললে সেটি যেন সত্যিকার অর্থেই শান্তিকে বোঝায়, যুদ্ধকে আড়াল করার কোনো উপায় না হয়—এমন মন্তব্য করেন তিনি। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে স্পষ্টতা ও সততার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন ড. ইউনূস।
ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর ও গ্রামীণ আমেরিকা
ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর পূর্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ‘গ্রামীণ আমেরিকা’র কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, ২০০৮ সালে নিউইয়র্ক সিটিতে মাত্র ৫০০ ডলারের ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। সে সময় অনেকেই মনে করেছিলেন, উন্নত দেশে ক্ষুদ্রঋণের এই মডেল সফল হবে না।
তবে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ‘গ্রামীণ আমেরিকা’ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং এখন পর্যন্ত ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ দিয়েছে। ঋণ পরিশোধের হার প্রায় ৯৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শুরুতে সুবিধাবঞ্চিত হিস্পানিক নারীদের নিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও পরবর্তীতে কৃষ্ণাঙ্গসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠী এবং পুরুষদের মধ্যেও এ কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে বলে জানান ড. ইউনূস।
তিনি বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও বিস্তৃত করতে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতা দূর করা প্রয়োজন।
সামাজিক ব্যবসা ও স্বাস্থ্যসেবা
সামাজিক ব্যবসার দর্শন তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, অর্থ উপার্জন আনন্দের হতে পারে। তবে মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা আরও বড় আনন্দের বিষয়।
বাংলাদেশে সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ড. ইউনূস জানান, একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র দিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে গ্রামীণ সামাজিক ব্যবসার আওতায় দেশজুড়ে ১৫৩টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে।
এ ছাড়া গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য টেলিমেডিসিন সেবা চালুর কথা উল্লেখ করেন তিনি। এ ব্যবস্থায় রোগীদের চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
গ্রামীণ এলাকায় উন্নত চোখের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে আই কেয়ার হাসপাতালের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কথাও তুলে ধরেন ড. ইউনূস। তাঁর দাবি, এসব প্রতিষ্ঠান স্বনির্ভর বা সেলফ-ফাইন্যান্সিং মডেলে পরিচালিত হচ্ছে এবং একটি কেন্দ্রের উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যবহার করে নতুন কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে।
‘থ্রি জিরো’ বিশ্ব গড়ার লক্ষ্য
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ড. ইউনূস জানান, চলতি বছরের ডিসেম্বরে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ তাদের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির অন্যতম লক্ষ্য হবে ‘থ্রি জিরো’ বা তিনটি শূন্যের ভিত্তিতে একটি নতুন বিশ্ব গড়ে তোলা। এর মধ্যে রয়েছে—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ।
ড. ইউনূস বলেন, মানুষ শুধু চাকরি খোঁজার জন্য জন্ম নেয়নি; মানুষ উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজের কর্মসংস্থান ও অন্যের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। কিন্তু প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের শুধু চাকরি পাওয়ার প্রস্তুতির দিকে নিয়ে যায়।
তিনি জানান, ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’র শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি নিজস্ব ব্যবসা শুরু করার সুযোগ পাবে। এ জন্য তাদের প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বক্তব্যের শেষ দিকে তরুণদের বিশ্বকে নতুনভাবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান ড. ইউনূস। একই সঙ্গে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।