‘আমাদের ছয় ভাই-বোনের মধ্যে পাঁচজনের নাম ভোটার তালিকায় রয়েছে, কেবল সাবিরের নাম নেই। আমি যদি ভারতীয় নাগরিক হই, তাহলে আমার ছোট ভাই কীভাবে বাংলাদেশি হয়ে যায়?’
ভারতের ছত্তিশগড়ের রায়পুরে ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে মুক্তি পেয়ে গ্রামে ফেরার দুই দিন পর টেলিগ্রাফ অনলাইনের এক সাংবাদিককে প্রশ্নটি করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা মুস্তাকিম শেখ।
৪ সেপ্টেম্বর রাতে ছত্তিশগড়ের বিলাসপুরের সিরগিতি থানা-পুলিশ মুস্তাকিম, তাঁর ছোট ভাই সাবিরসহ ২৩ জন বাংলাভাষী মুসলিমকে আটক করে। পরে তাঁদের রাজ্যের রাজধানী রায়পুরের একটি ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। টানা ১৪ দিন ডিটেনশন সেন্টারে বন্দী রাখার পর গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) মুস্তাকিমসহ ১৯ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু আটকে রাখা হয় তাঁর ছোট ভাই সাবির, দুই মামাতো ভাই শফিকুল ও নাসিরউদ্দিন, অন্য একজনসহ মোট চারজনকে।
মুস্তাকিম শেখের নাম ভোটার তালিকায় থাকলেও তাঁর ছোট ভাই সাবিরের নাম নেই। চলতি বছর অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা সাবির, তাঁর মামাতো ভাই শফিকুলসহ অনেকের নামই তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল।
মুর্শিদাবাদের শমসেরগঞ্জের হিরানন্দপুরের বাসিন্দা মুস্তাকিম গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ছত্তিশগড়ে আছেন। প্রথমে তিনি কাপড় বিক্রি করলেও পরে বিলাসপুরের পাড়া-মহল্লায় ঘুরে অ্যালুমিনিয়ামের বাসনাদি বিক্রি শুরু করেন। তাঁর ভাই সাবির, মামাতো ভাই শফিকুল ও নাসিরউদ্দিনসহ মুর্শিদাবাদের শমসেরগঞ্জ, সুতি ও রঘুনাথগঞ্জের বেশ কয়েকজন যুবক বিলাসপুর রেলস্টেশনের পাশের একটি কলোনিতে একসঙ্গে থাকতেন।
৪ সেপ্টেম্বর রাতে আটকের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মুস্তাকিম টেলিগ্রাফকে জানান, দুই মাসের বেশি সময় আগে, হঠাৎ একদিন রাতে সিরগিতি থানার পুলিশ কর্মকর্তা এসে তাঁদের দরজায় কড়া নাড়েন। প্রয়োজনীয় সমস্ত নথিপত্র নিয়ে থানায় যেতে বলেন।
মুস্তাকিম বলেন, ‘পরদিন থানায় গিয়ে আমরা সারা দিন অপেক্ষা করলাম। কেউ আমাদের দিকে ফিরেও তাকাল না। এরপর আমাদের চলে যেতে বলা হলো। ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ আবারও এসে আমাদের নাম ও ফোন নম্বর লিখে নিয়ে যায়। পরদিন ৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আমাদের বাড়ি থেকে তুলে রায়পুরের ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়।’
ওই দিন বাসে করে রায়পুর নিয়ে যাওয়ার সময় এক পুলিশ কর্মকর্তা সবাইকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পরই ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু মুস্তাকিম বলেন, ‘ডিটেনশন সেন্টারে আমরা যত দিন তালাবদ্ধ ছিলাম, কেউ আমাদের কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করতে আসেনি। আমাদের গায়ে হাত তোলা বা শারীরিক অত্যাচার করা হয়নি ঠিকই, কিন্তু দিনের পর দিন ভেতরে আটকে রাখাই ছিল এক বড় শাস্তি।’
মুর্শিদাবাদের সুতির সাহাবাদের বাসিন্দা রমজান শেখ তাঁর ভাই এজাজুল শেখকে ছাড়াতে বিলাসপুরে যান। এজাজুল টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘আমাকে বলা হয়েছিল, রক্তের ভাই (আপন ভাই) প্রমাণের জন্য একটি ‘‘ফ্যামিলি ট্রি’’ (বংশতালিকা) দাখিল করতে।’ অবশেষে গত শুক্রবার রমজানের ভাইসহ অন্যরা ছাড়া পান।
গত শুক্রবার মুক্ত পাওয়া ১৯ জনকে রায়পুর থেকে ট্রেনে উঠে ছত্তিশগড় ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়। মুস্তাকিম আক্ষেপ করে বলেন, ‘যেখানে আমরা থাকতাম, আমাদের সামান্য যা সম্বল ছিল, সবই সেখানে পড়ে রয়েছে। আমরা যেন আর বিলাসপুরে ফিরে না যাই, এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা তো দিনমজুর, বাড়ি বাড়ি ঘুরে জিনিস বিক্রি করে খাই। জীবিকার তাগিদে আমাদের কোনো না কোনো রাজ্যে যেতেই হবে। আমরা আর কত দিন এভাবে বসে থাকব?’
ভোটে জিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রস্তুত করা ভোটার তালিকায় যেসব ভোটারকে অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, জাল বা মৃত (এএসডিডি) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং যাঁরা সম্পূরক তালিকায় বাদ বা শুনানির পর বাদ পড়েছেন, তাঁরা সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না। তবে চলতি বছরের জুলাই মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জানান, কেবল ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা গেলেই কাউকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
এদিকে এসআইআরের কারণে এমন অনেক ঘটনা ঘটছে, যেখানে তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ব্যক্তিরা পাসপোর্টও নবায়ন করতে পারছেন না। টেলিগ্রাফ এমন একটি ঘটনার বিষয়ে জানতে পেরেছে। এসআইআরের কারণে এক ব্যক্তির ভারতীয় প্রযুক্তিবিদ্যা প্রতিষ্ঠান আইআইটিতে পিএইচডির আবেদন আটকে রয়েছে।
টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর কেবল মুর্শিদাবাদ জেলাতেই ১১ লাখ ২১ হাজার ২০৫ জন ভোটারের নাম পুনর্বিবেচনা বা শুনানির অধীনে রাখা হয়েছিল, যা পুরো রাজ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ। এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর আগে মুর্শিদাবাদে ভোটার ছিলেন ৫৭ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫ জন। এর মধ্যে ২ লাখ ৯৩ হাজার ৮২২ জনের নাম অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত ও জাল হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং গত বছরের ডিসেম্বরে আরও ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৩৭ জনের নাম বাদ দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের অ্যাফিডেভিট অনুযায়ী, গত পাঁচ মাসে আপিল ট্রাইব্যুনাল প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার ১৯৪টি মামলার নিষ্পত্তি করেছে।
সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সংসদ সদস্য সামিরুল ইসলাম ছত্তিশগড় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ভুক্তভোগীদের সহায়তা করছেন। তিনি টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে বাংলাভাষী মুসলিমদের পুলিশ ও প্রশাসন কর্তৃক লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা বিলাসপুর কর্তৃপক্ষের জবাবের অপেক্ষায় আছি। চলতি সপ্তাহের মধ্যে এই চারজনকে মুক্তি দেওয়া না হলে আমরা আদালতের দ্বারস্থ হব।’
এদিকে, পুরো ঘটনার বিষয়ে জানতে বিলাসপুরের পুলিশ সুপার রজনীশ সিংয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল টেলিগ্রাফ। তবে তিনি কোনো সাড়া দেননি।
বাড়ি থেকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরে রায়পুরের ডিটেনশন সেন্টারে বসে মুক্তির প্রহর গুনছেন মুস্তাকিম শেখের ছোট ভাই সাবির শেখ। সাবিরের বর্তমানে একটাই চাওয়া—তিনি ভারতীয় নাগরিক মুস্তাকিম শেখের আপন ছোট ভাই এবং তিনি নিজেও একজন ভারতীয় নাগরিক।
টেলিগ্রাফে প্রকাশিত অর্ণব গাঙ্গুলীর লেখাটি সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকা