মনিরুল ইসলাম : চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে ৪১০টি অপতথ্য ছড়ানোর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে বিএনপিকে নিয়ে ১১৮টি এবং বর্তমান সরকারকে ঘিরে ৪৫১টি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। একটি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ এ এম ছালেহ (সালেহ শিবলী)।
আজ শুক্রবার ১৬ অক্টোবর বিকেলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে সংগঠনটির নতুন সদস্য বরণ অনুষ্ঠান-২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব বলেন, অপতথ্য ও গুজব বর্তমানে সাংবাদিকতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এসব তথ্যের সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ যাচাইয়ের জন্য মানুষ এখনো দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করে।
অপতথ্য মোকাবিলায় তথ্য যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব
সালেহ শিবলী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার বাড়লেও এর সঙ্গে দায়িত্বহীন আচরণও বেড়েছে। ফলে কোনো সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সেটির সত্যতা যাচাই করতে মানুষ টেলিভিশন ও প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রের খবরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে।
তিনি বলেন, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা মানুষের আস্থা ধরে রেখেছে। এ আস্থা বজায় রাখতে সাংবাদিকদের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে। কোনো তথ্য প্রচারের আগে তার সত্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেল ও গণমাধ্যমে নিয়মিত তথ্য যাচাইবিষয়ক অনুষ্ঠান চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব বলেন, প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ মিনিটের একটি অনুষ্ঠানও মানুষকে সঠিক ও ভুল তথ্যের পার্থক্য বুঝতে সহায়তা করতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিও যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, কখনো কখনো বড় সংবাদমাধ্যমও যাচাই না করে ভুয়া ছবি বা তথ্য প্রচারের ঝুঁকিতে পড়ে। তাই সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
আইন প্রয়োজন, তবে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না সাংবাদিকতার স্বাধীনতা
অপতথ্য ও গুজব মোকাবিলায় কার্যকর আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন সালেহ শিবলী। তিনি বলেন, সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সময়ের প্রয়োজনে আইনে সংশোধন, সংযোজন ও পরিবর্তনের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে না জানা অনেক মানুষও অপতথ্যের শিকার হন। এসব মানুষ নিজেরা প্রতিবাদ জানাতে কিংবা প্রতিকার চাইতে সক্ষম নাও হতে পারেন। এ ক্ষেত্রে সরকারকে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং সবার জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকলেও সত্য প্রকাশে আপস নয়
ডিআরইউর নতুন সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব বলেন, একটি সংগঠনের ঐক্য ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মতভিন্নতা থাকতেই পারে, তবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে অভিন্ন লক্ষ্যে পৌঁছানোই একটি সংগঠনের সৌন্দর্য।
সাংবাদিকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল বা আদর্শকে সমর্থন করা একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়। তবে ব্যক্তিগত বিশ্বাস কিংবা দলীয় অবস্থান যেন সত্য প্রকাশের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, সাংবাদিকদের দায়িত্ব হলো সত্য তুলে ধরা। সরকারের ভালো উদ্যোগের ইতিবাচক দিক যেমন প্রকাশ করতে হবে, তেমনি কোথাও অনিয়ম বা দুর্নীতি হলে সেটিও সামনে আনতে হবে। তবে কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়মের কারণে সামগ্রিক উদ্যোগের ইতিবাচক দিক আড়াল করা উচিত নয়।
বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনে সাংবাদিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
সালেহ শিবলী বলেন, দেশে এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, যেখানে ধর্ম, মতাদর্শ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ বৈষম্যের শিকার হবেন না। সব নাগরিকের সমান অধিকার, মানবিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
ডিআরইউর নতুন সদস্যদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি সংগঠনটির ঐতিহ্য, ঐক্য ও পেশাদারত্ব অক্ষুণ্ন রাখার আহ্বান জানান।
যোগ্যতার ভিত্তিতে ৪০ জনকে সদস্যপদ: ডিআরইউ সভাপতি
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, ৪০০টি আবেদনের মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই করে ৪০ জনকে নতুন সদস্যপদ দেওয়া হয়েছে। যোগ্যতার ভিত্তিতেই তাঁরা সদস্য হয়েছেন, কারও দয়া বা অনুকম্পায় নয়।
তিনি বলেন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি একটি শক্তিশালী ও পেশাদার সাংবাদিক সংগঠন। সংগঠনটি সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। সদস্যপদ দেওয়া নিয়ে কোনো বিতর্ক তৈরি হলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। সংগঠনের নিয়মনীতি ও শৃঙ্খলা মেনে চলার মধ্য দিয়েই ডিআরইউ তার মর্যাদা ধরে রেখেছে।
পেশাদারত্বের সঙ্গে সাংবাদিকতা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান
ডিআরইউর সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল নতুন সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, এই সংগঠন সাংবাদিকদের ভালোবাসা ও পারস্পরিক সহযোগিতার একটি প্ল্যাটফরম। নতুন সদস্যদের এই বন্ধন অটুট রাখার পাশাপাশি পেশাদারত্বের সঙ্গে সাংবাদিকতা চালিয়ে যেতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রাখতে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এসব মূল্যবোধ রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
ডিআরইউর সাংগঠনিক সম্পাদক এম এম জসিমের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এতে আরও বক্তব্য দেন সংগঠনটির সহসভাপতি মেহ্দী আজাদ মাসুম, যুগ্ম সম্পাদক মো. জাফর ইকবাল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক কবির আহমেদ খান এবং সাবেক প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. শহীদুল ইসলাম।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ডিআরইউর কার্যনির্বাহী কমিটির অর্থ সম্পাদক নিয়াজ মাহমুদ সোহেল, দপ্তর সম্পাদক মো. রাশিম (রাশিম মোল্লা), ক্রীড়া সম্পাদক ওমর ফারুক রুবেল, সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো. মনোয়ার হোসেন, আপ্যায়ন সম্পাদক আমিনুল হক ভূঁইয়া, কল্যাণ সম্পাদক রফিক মৃধা এবং কার্যনির্বাহী সদস্য মো. আকতার হোসেন, আলী আজম, মাহফুজ সাদি, আল-আমিন আজাদ, সুমন চৌধুরী ও মো. আব্দুল আলীম।