একা জীবনযাপন নিয়ে ভিডিও বানিয়ে কেউ লাখো মানুষের কাছে জনপ্রিয় হচ্ছেন, আবার কেউ একাকি মানুষের জন্য বন্ধু, সঙ্গী বা সামাজিক আড্ডার ব্যবস্থা করে গড়ে তুলছেন ব্যবসা। ইন্ডিয়া টুডে-র এক প্রতিবেদন এ তথ্য দেয়।
একসময় একাকিত্বকে শুধু মানসিক অবস্থা হিসেবে দেখা হতো। এখন সেটিই ধীরে ধীরে নতুন ধরনের কনটেন্ট, কমিউনিটি এবং ব্যবসার ভিত্তি হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক শহুরে জীবনে মানুষের সামাজিক সম্পর্ক কমে যাওয়ায় একাকিত্ব বেড়েছে। সেই প্রয়োজন থেকেই তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের সেবা, যাকে অনেকে ‘লোনলিনেস ইকোনমি’ বা একাকিত্বকেন্দ্রিক অর্থনীতি বলছেন।
একা থাকার গল্প এখন ভাইরাল
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন অনেকেই একা রাতের খাবার খাওয়া, একা ঘুরতে যাওয়া বা একা জীবন কাটানোর ভিডিও নিয়মিত প্রকাশ করেন। এসব কনটেন্ট কোটি কোটি মানুষ দেখছেন। এমন নির্মাতাদের অনেকেই এখন ‘লোনলিনেস ইনফ্লুয়েন্সার’ নামে পরিচিত।
মনোচিকিৎসকদের মতে, এতে একদিকে মানুষ বুঝতে পারেন যে তিনি একা নন।
তবে অন্যদিকে বারবার নিজের একাকিত্ব প্রকাশ করলে সেটি ধীরে ধীরে নিজের পরিচয়ের অংশ হয়ে যেতে পারে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়।
একাকিত্ব ঘিরে নতুন ব্যবসা
ভারতের বিভিন্ন শহরে এখন এমন অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যারা অপরিচিত মানুষদের একসঙ্গে আড্ডা, ডিনার, খেলাধুলা, সংগীতচর্চা বা নানা শখের কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। লক্ষ্য একটাই—নতুন বন্ধু তৈরি করা এবং একাকিত্ব কমানো।
এ ছাড়া অর্থের বিনিময়ে সঙ্গী ভাড়া করার সেবাও জনপ্রিয় হচ্ছে। হাসপাতালে যাওয়া, বাজার করা, গল্প করা কিংবা শুধু কিছু সময় পাশে থাকার জন্যও মানুষ এসব সেবা নিচ্ছেন।
আবার কোথাও শৈশবের খেলাগুলো খেলার আয়োজন করা হচ্ছে, যাতে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
কেন বাড়ছে একাকিত্ব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যৌথ পরিবারের সংখ্যা কমে যাওয়া, কাজের জন্য অন্য শহরে চলে যাওয়া, প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যাওয়া এবং ডিজিটাল জীবনে বেশি সময় কাটানোর কারণে মানুষ আগের তুলনায় অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ১৩ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে একাকিত্ব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে শুধু তরুণ নয়, ৪০ ও ৫০ বছর বয়সীরাও এখন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য বিভিন্ন কমিউনিটিতে যোগ দিচ্ছেন।
বন্ধুত্বও কমছে
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯০ সালের তুলনায় এখন ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেই—এমন মানুষের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময়ও কমে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক শহুরে জীবনে মানুষের চারপাশে অনেক মানুষ থাকলেও প্রকৃত সম্পর্কের অভাব থেকেই একাকিত্ব তৈরি হচ্ছে।
সমাধান নাকি ব্যবসা?
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এসব কমিউনিটি ও সেবা অনেকের জন্য নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। তবে শুধু কোনো অনুষ্ঠান বা অ্যাপে যোগ দিলেই একাকিত্ব দূর হবে না। দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাস্তব জীবনে নিয়মিত যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব বজায় রাখাও জরুরি।
তাদের ভাষায়, একাকিত্ব একটি অনুভূতি, পরিচয় নয়। তাই এটি নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন, কিন্তু নিজের স্থায়ী পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। নতুন এসব উদ্যোগ মানুষকে সম্পর্ক তৈরির সুযোগ দিতে পারে, তবে সেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত মানুষের নিজেরই।