আধুনিক শহরের আভিজাত্য কেবল উন্নত যাতায়াতের ব্যবস্থা বা উন্নত সংস্কৃতিতে থাকে না। বিষয়টি নিহিত থাকে তার প্রকৃতি ও সবুজের সহজলভ্যতার ওপর। সম্প্রতি টাইম আউট ম্যাগাজিন তাদের বার্ষিক জরিপে এ বছরের সেরা সবুজ শহরগুলোর তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকার শীর্ষ স্থান দখল করেছে যুক্তরাজ্যের শান্ত শহর বাথ। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো এবং তৃতীয় স্থানে আছে কানাডার মন্ট্রিয়ল। ভ্রমণ তালিকায় এ বছরের সেরা সবুজ শহরগুলোর নাম জেনে রাখুন এবার।
সেরা শহরের খোঁজে
টাইম আউট এবং ইনট্রেপিড ট্রাভেল যৌথভাবে এই তালিকা তৈরি করতে বিশ্বের ১৫০টি শহরের প্রায় ২৪ হাজার নাগরিকের ওপর একটি বিশদ জরিপ চালিয়েছিল। সেই জরিপের ফলাফলের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে এ বছরের শ্রেষ্ঠ সবুজ শহরগুলোর নাম।
বাথ, যুক্তরাজ্য
বাথ শহরের প্রায় ৯৪ শতাংশ বাসিন্দা তাদের শহরের সবুজায়নকে ‘চমৎকার’ বা ‘অসাধারণ’ রেটিং দিয়েছে। কটসওল্ডসের দিগন্তজোড়া সবুজ পাহাড়ে ঘেরা এই শহর যেন নিজেই একটি বাগান। আঠারো শতকের ঐতিহ্যবাহী প্রায়র পার্ক ল্যান্ডস্কেপ গার্ডেনের অন্যতম উদাহরণ। শহরটির এই সবুজ বিপ্লব তৈরির পেছনে রয়েছে পার্ক, বাগান, এমনকি শহরের খালগুলো ব্যবহার করে টেকসই এবং জলবায়ু-সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার লক্ষ্য। নাগরিকেরা যাতে ছোট-বড় সব ধরনের হাঁটার পথ কিংবা ওয়াকওয়ে সহজে খুঁজে পায়, সে জন্য বাথগেট ল্যান্ডস্কেপ পার্টনারশিপ গাইড রয়েছে।
শিকাগো, যুক্তরাষ্ট্র
তালিকায় ৮৯ শতাংশ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে শিকাগো শহর। একে বলা হয় ‘সিটি ইন আ গার্ডেন’ বা বাগানের শহর। আকাশচুম্বী কাচের দালানের ভিড়ে শহরটিতে রয়েছে ৮ হাজার ৮০০ একরজুড়ে বিস্তৃত ৬০০টির বেশি পার্ক। শিকাগোর সবুজায়নের বড় চমক হলো ওয়াইল্ড মাইল। এটি বিশ্বের প্রথম ভাসমান ইকোপার্ক। প্রাচীন জলাভূমির আদলে তৈরি এই ভাসমান অরণ্যে নদীর কাছ দিয়ে কাঠের তৈরি চমৎকার হাঁটার পথ রয়েছে।
মন্ট্রিয়ল, কানাডা
কানাডার চমৎকার শহর মন্ট্রিয়ল ৮৮ শতাংশ স্কোর নিয়ে তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে। শহরটির নামকরণই হয়েছে এর কেন্দ্রস্থলে থাকা বিখ্যাত মাউন্ট রয়্যাল পাহাড়ের নাম থেকে। ১৫৩৫ সালে ফরাসি অভিযাত্রী জ্যাক কার্টিয়ার এই নাম দিয়েছিলেন। ১৯০ হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত মাউন্ট রয়্যাল পার্কে গ্রীষ্মে হাইকিং আর শীতে ক্রস-কান্ট্রি স্কিইং করার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এখানে আছে ১৮০ প্রজাতির পাখি আর মনোরম বোটানিক্যাল গার্ডেন।
রিগা, লাটভিয়া
লাটভিয়ার রাজধানী রিগা শহরের ৪৭ শতাংশ ভূমিই সবুজ অঞ্চল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্রিন সিটি অ্যাকর্ডের অংশ হিসেবে শহরটি তার মাইক্রো ক্লাইমেট রক্ষায় বদ্ধপরিকর।
মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরটির নাগরিকেরা প্রকৃতিপ্রেমের জন্য বিখ্যাত। ২০১৮ সালে শহর কর্তৃপক্ষ ৭০ হাজার গাছকে নিজস্ব ই-মেইল ঠিকানা দিয়েছিল, যাতে তাদের অবস্থা সব সময় পর্যবেক্ষণ করা যায়। কিন্তু মেলবোর্নবাসী সেই সুযোগ পেয়ে প্রিয় গাছগুলোকে ভালোবেসে অসংখ্য চিঠি পাঠিয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
কেপটাউন, দক্ষিণ আফ্রিকা
কেপটাউন ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট কেপ ফ্লোরাল রিজিওনের অন্তর্ভুক্ত। কেপ নেচারের তথ্যমতে, এখানে জন্মানো ৭০ শতাংশ উদ্ভিদ বিশ্বের আর কোথাও পাওয়া যায় না। টেবিল মাউন্টেন ন্যাশনাল পার্কের মতো বিশাল এলাকা এই শহরের প্রাণ।
সিঙ্গাপুর
১৯৬৭ সাল থেকে সিঙ্গাপুরকে ‘গার্ডেন সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। দ্য টেলিগ্রাফের মতে, সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা জমিতে তৈরি ২৫০ একরের ‘গার্ডেনস বাই দ্য বে’ এই শহরের সবুজ ফুসফুস। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি বাড়ি থেকে মাত্র ১০ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে সবুজ বনানী নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষ শহরটিতে ১ মিলিয়ন গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছে।
মেডেলিন, কলম্বিয়া
কলম্বিয়ার মেডেলিন তার গ্রিন করিডর প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কারণে শহরের গড় তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমেছে।
স্টকহোম, সুইডেন
সুইডেনের স্টকহোম ছিল ২০১০ সালের প্রথম ইউরোপীয় গ্রিন ক্যাপিটাল। স্টকহোম চেম্বার অব কমার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানকার ৮৪ শতাংশ মানুষ ‘১৫ মিনিটের শহর’ ধারণার মধ্যে বাস করে, যেখানে হাতের নাগালেই রয়েছে বিশাল পার্ক ও বন।
হামবুর্গ, জার্মানি
তালিকার ১০ নম্বরে আছে জার্মানির হামবুর্গ। শহরটি এক শ বছর ধরে গ্রিন নেটওয়ার্ক প্রকল্পের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। এ প্রকল্প শহরের জলপথ, উদ্যান ও শহরতলির পার্কগুলোকে সবুজ জালের মতো সংযুক্ত করেছে। এ ছাড়া ছাদবাগান কিংবা গ্রিন রুফিংয়ের ক্ষেত্রে হামবুর্গ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম পথিকৃৎ।
সূত্র: টাইম আউট