এক সময় এটি ছিল ঘরের কোণে রাখা সাধারণ একটি মসলা। কিন্তু আজ সেই মেথি বীজই আলোচনায় কারণ আধুনিক গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রতিদিন ভিজানো মেথি বীজ খাওয়ার অভ্যাস শরীরের ভেতরে এমন কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, যা অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। আমাদের দাদী-নানিদের সেই রাতভর মেথি ভিজিয়ে রাখার অভ্যাস আজ বিজ্ঞানের ভাষায় প্রমাণিত এক প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যচর্চা।
রাতভর পানিতে ভিজিয়ে রাখলে মেথি বীজের শক্ত খোসা নরম হয়ে যায় এবং এর ভেতরে থাকা ফাইবার, গ্যাল্যাকটোম্যানান, অ্যামিনো অ্যাসিড ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে অনেক সহজে শোষিত হয়। তখন সাধারণ একটি বীজ কার্যত রূপ নেয় শক্তিশালী এক প্রাকৃতিক ‘মেটাবলিক সাপোর্ট’-এ।
চিকিৎসাবিষয়ক জার্নাল ‘এয়ু’-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, টাইপ–২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিয়মিত রাতভর ভিজানো মেথি বীজ খেলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের ফাস্টিং ব্লাড সুগার উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে আসে। গবেষকদের মতে, মেথি শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রমকে স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভিজানো মেথি বীজ হজম ব্যবস্থার জন্য বিশেষভাবে উপকারী। এতে থাকা সল্যুবল ফাইবার মল নরম করে, কোষ্ঠকাঠিন্য কমায় এবং পেটের ভারীভাব দূর করে। যাদের নিয়মিত গ্যাস, অম্বল বা হজমে সমস্যা হয়, তাদের জন্য সকালে খালি পেটে ভিজানো মেথি বীজ একটি স্বাভাবিক সমাধান হতে পারে।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণেও মেথির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এর গ্যাল্যাকটোম্যানান উপাদান খাবার থেকে কার্বোহাইড্রেটের শোষণ ধীর করে দেয়, ফলে হঠাৎ করে ব্লাড সুগার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে। প্রিডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে থাকা অনেকেই এটিকে খাদ্যাভ্যাসের সহায়ক অংশ হিসেবে গ্রহণ করছেন।
ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও ভিজানো মেথি বীজ কার্যকর। উচ্চ ফাইবারের কারণে দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূত হয়, ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং অপ্রয়োজনীয় খাবারের প্রবণতা কমে যায়। নিয়মিত গ্রহণে মেটাবলিজম সক্রিয় থাকে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণকে সহজ করে।
শুধু ভেতরের স্বাস্থ্য নয়, বাহ্যিক সৌন্দর্যেও মেথি বীজের প্রভাব রয়েছে। এতে থাকা প্রোটিন ও নিকোটিনিক অ্যাসিড চুলের গোড়া শক্ত করে, চুল পড়া কমাতে সহায়তা করে এবং ধীরে ধীরে চুলের ঘনত্ব বাড়ায়। ত্বকের ক্ষেত্রেও এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রদাহ কমিয়ে ত্বককে পরিষ্কার ও উজ্জ্বল রাখতে সাহায্য করে।
নারীদের ক্ষেত্রে মেথি বীজ হরমোনাল ভারসাম্য বজায় রাখতেও সহায়ক বলে মনে করা হয়। এতে থাকা প্রাকৃতিক ফাইটোইস্ট্রোজেন মাসিক-পূর্ব অস্বস্তি ও হরমোনজনিত অস্বাভাবিকতা কিছুটা লাঘব করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এক থেকে দুই চা চামচ মেথি বীজ একটি ছোট কাপ পানিতে রাতভর ভিজিয়ে রেখে সকালে খালি পেটে খাওয়াই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। বীজের সঙ্গে ভিজানো পানিটিও পান করা যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত গ্রহণ হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে, তাই পরিমিত থাকাই শ্রেয়।
সব মিলিয়ে, প্রতিদিন ভিজানো মেথি বীজ কোনো জাদুকরী ওষুধ নয়, তবে এটি এমন এক প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যসহযোগী, যা হজম, রক্তে শর্করা, ওজন, চুল, ত্বক ও হরমোনাল স্বাস্থ্যে একসঙ্গে কাজ করে। প্রজন্মের পর প্রজন্মের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আজ বৈজ্ঞানিক গবেষণাও এই ছোট্ট বীজের বড় ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। সূত্র: জনকণ্ঠ