ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়ার পরও স্থাপনা সরিয়ে না নেওয়ায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে জামালপুরের ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর নান্দিনা-লক্ষ্মীরচর সেতুর নির্মাণকাজ। সেতুর দক্ষিণ প্রান্তের নান্দিনা বাজার অংশে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পিলারের কাজ শুরু করতে না পারায় সেতু নির্মাণকাজ পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদের কারণে জামালপুর সদর উপজেলার পূর্বাঞ্চলের লক্ষ্মীরচর ও তুলশীরচর ইউনিয়নের সঙ্গে নান্দিনা ও উপজেলা সদরের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এসব অঞ্চলের মানুষের ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিতে ভরসা একমাত্র নৌকা। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করার জন্য পল্লি সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় জামালপুরের নান্দিনা-লক্ষ্মীরচর সড়কে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর ৬০৬ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১০ মিটার প্রস্থের একটি পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। সেতু নির্মাণে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১০৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। সেতুর দুই প্রান্তের ৩ একর ৬০ শতাংশ ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় ধরা হয় ২৫ কোটি ৭০ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। সেতু নির্মাণের দায়িত্ব পায় জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহমেদ চৌধুরীর মালিকানাধীন মেসার্স চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ। ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর সেতু নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর সেতুর কাজ সম্পন্ন করে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেতুটির কাজ অর্ধেকও শেষ না হওয়ায় সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের ৮ জুন করা হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গড়িমসির কারণে কাজে গতি আসেনি। ফলে কাজ পিছিয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের কারণে ঠিকাদার পালিয়ে যান। ফলে ৭-৮ মাস কাজ বন্ধ থাকে। পরে কাজ শুরু হলেও চলছে ঢিমেতালে। এর মধ্যেই দেখা দিয়েছে আরেক বিপত্তি। সেতুর উভয় প্রান্তে প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকাও পরিশোধ করে জেলা প্রশাসন। টাকা পাওয়ার পরও সেতুর দক্ষিণ প্রান্তের নান্দিনা বাজার অংশের প্রকল্প স্থান থেকে অনেকে স্থাপনা সরিয়ে নিচ্ছেন না। যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পিলারের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। আসছে বর্ষা মৌসুমের আগেই অন্তত একটি পিলারের কাজ শেষ করতে না পারলে সেতুর কাজ আরও এক বছর পিছিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এলজিইডির সূত্র মতে, সেতুর মোট স্প্যান ধরা হয়েছে ১৫টি। তার মধ্যে ৯টির কাজ শেষ হয়েছে, অ্যাবটমেন্টসহ মোট পিলারের সংখ্যা ১৬টি। নির্মিত হয়েছে ১৩টি। সেতুর দক্ষিণ প্রান্তের ৩টি পিলার ও সেতুর মাঝখানে ১০০ মিটারের একটি স্টিল গার্ডারের কাজ এখনও শুরুই হয়নি। সেতুর দুই প্রান্তের ৬০০ মিটার সংযোগ সড়কের মধ্যে উত্তর প্রান্তের সংযোগ সড়কের মাটি ভরাটের কাজ চলছে। দক্ষিণ প্রান্তের সড়কের কাজ এখনও শুরুই হয়নি। নান্দিনা বাজার থেকে সেতুতে ওঠানামার জন্য গোল চত্বরের কাজেও হাত দেওয়া হয়নি। কাজের অগ্রগতি ৫৫ ভাগ। ঠিকাদারকে বিল দেওয়া হয়েছে ৪৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুর নকশার স্থানে এখনও ২০টি স্থাপনা রয়েছে। অনেকেই ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়েও জায়গা ছেড়ে দিচ্ছেন না।
স্থানীয় ভূমি ও বহুতল ভবনের মালিক লোকমান হোসেন হিরা জানান, ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়ে তার সব স্থাপনা ভেঙে সরিয়ে নিয়েছেন। তবে অনেকেই স্থাপনা সরিয়ে নিতে বিলম্ব করছেন।
নান্দিনা বাজার অংশে সেতুর একটি পিলারের স্থানে রোকেয়া বেগম নামে একজনের স্থাপনা রয়েছে। ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েও স্থাপনা সরিয়ে নিচ্ছেন না। তাছাড়া আরও দুটি পিলার ও গোল চত্বরের জায়গাতেও রয়েছে দোকানপাট ও স্থাপনা।
গণমাধ্যমকর্মী সাঈদুর রহমানের ভাষ্য, বর্ষার আগে পিলারের কাজ শেষ করতে না পারলে নির্মাণকাজ আরও অন্তত এক বছর পিছিয়ে যাবে।
জামালপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রোজদিদ আহাম্মেদ জানান, ভূমিমালিকরা টাকা নিয়েও স্থাপনা সরিয়ে না নেওয়ায় কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের একাধিকবার নোটিশ করা হয়েছে।
ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়েও জমি ছেড়ে না দেওয়ার ব্যাপারে জেলা প্রশাসন থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সুমি আক্তার বলেন, জমি অধিগ্রহণ করে এলজিইডিকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো কথা থাকলে এলজিইডিকে বলেন।