ইরানের একটি সমন্বিত হামলা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোগুলোকে বিপর্যস্ত করেছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে এবং প্রধান ঘাঁটিগুলোতে সরাসরি আঘাত হানা হয়েছে। যদিও ঘাঁটিগুলো এখনও সচল আছে, তবে এই ক্ষয়ক্ষতি ইরানি সমরাস্ত্রের এক বিপজ্জনক বাস্তবতা উন্মোচন করেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ সামরিক আগ্রাসন শুরু করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। এতে ওইদিনই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা নিহত হন। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্র দেশ ইসরাইল ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান।
পাল্টা হামলায় জর্ডান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টরের গুরুত্বপূর্ণ রাডার ঘাঁটিতে আঘাত হানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র। এসব ধ্বংসযজ্ঞের ছবি স্যাটেলাইটে ধরা পড়েছে।
উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি
কুয়েত: আলী আল সালেম বিমান ঘাঁটি: ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে হওয়া হামলায় এক ডজনেরও বেশি স্থাপনা, বিমান রাখার হ্যাঙ্গার এবং রানওয়ের পাশের এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ক্যাম্প আরিফজান: মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সাথে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম অন্তত ছয়টি স্যাটেলাইট রাডোম ধ্বংস হয়েছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাব ক্যাম্প বুহরিং-এ বড় ধরনের গর্ত তৈরি হয়েছে।
শুয়াইবা বন্দর: ১ মার্চ একটি ইরানি ড্রোন হামলায় মার্কিন সেনাবাহিনীর ৬ জন রিজার্ভ সদস্য নিহত হয়েছেন।
বাহরাইন: মার্কিন পঞ্চম নৌবহর (ফিফথ ফ্লিট) সদরদফতর: মানামার জুফায়ার ডিস্ট্রিক্টে অবস্থিত এই কেন্দ্রের রাডোম, গুদাম এবং যোগাযোগ টার্মিনালগুলো মিসাইল হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: আল ধাফরা বিমান ঘাঁটি: আবুধাবির দক্ষিণে অবস্থিত এই ঘাঁটির সামরিক কম্পাউন্ড, স্যাটেলাইট সিস্টেম এবং রাডার সরঞ্জামের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
জেবেল আলী বন্দর: ১ মার্চ ইরানের হামলায় এই গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন নৌ-কেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ বিবরণ এখনো অস্পষ্ট।
কাতার: আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি: মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার বৃহত্তম এই কমান্ড সেন্টারে বারবার আঘাত হানা হয়েছে। অন্তত একটি বিস্ফোরণে ১.১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এএন/এফপিএস-১৩২ লং-রেঞ্জ ব্যালিস্টিক মিসাইল রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।
জর্ডান: থাড রাডার ধ্বংস: মুওয়াফফাক সালতি বিমান ঘাঁটিতে ৩০ কোটি ডলার মূল্যের একটি এএন/পিটিওয়াই-২ রাডার পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এটি মার্কিন থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রাডারটি হারানো মানে যুদ্ধ সক্ষমতা পঙ্গু হয়ে যাওয়া। জর্ডান কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে যে, ইরানের ১১টি মিসাইল ও ড্রোন তারা আটকাতে পারেনি।
সৌদি আরব: প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটি: সৌদি বাহিনী অনেক হামলা প্রতিহত করলেও একটি রাডার সাইটে ক্ষয়ক্ষতির খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। সেখানে রাডার শেল্টারটি পুড়ে গেছে এবং ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
আরও ক্ষয়ক্ষতি ও হামলার তথ্য
ইরাক ও কুর্দিস্তান: আইন আল-আসাদ বিমান ঘাঁটি: পশ্চিম ইরাকের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে একাধিক মিসাইল ও ড্রোন আঘাত হেনেছে। সেখানে ধোঁয়া ও বড় ধরনের বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
ইরবিল বিমানবন্দর: উত্তর ইরাকের এই ঘাঁটিতেও ইরানের আইআরজিসি (আইআরজিসি) সরাসরি হামলা চালিয়েছে। এখানে মার্কিন স্থাপনাগুলো উচ্চ সতর্কতায় থাকলেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
বাগদাদের ভিক্টোরিয়া বেস: বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত এই ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা হয়েছে, যাতে কিছু অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: এটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর। ইরানের ড্রোন হামলায় এর একটি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে বিমান চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়।
বেসামরিক এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি: শারজাহতে একটি মল এবং দুবাইয়ের জুমেইরাহ এলাকায় কিছু আবাসিক ভবন ড্রোন বা মিসাইলের ধ্বংসাবশেষ পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ওমান ও সাইপ্রাস: দুকম বন্দর, ওমান: ওমানের এই বন্দরে থাকা মার্কিন নৌ-স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
আক্রোটিরি সামরিক ঘাঁটি, সাইপ্রাস: সাইপ্রাসে অবস্থিত ব্রিটিশ এই সামরিক ঘাঁটিতেও ড্রোন আঘাত হেনেছে বলে জানা গেছে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: মোট ক্ষতিগ্রস্ত স্থান: নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার অন্তত ১৭টি সামরিক, কূটনৈতিক ও আকাশ প্রতিরক্ষা কেন্দ্র এই দফায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি ওই অঞ্চলে মার্কিন মোট স্থাপনার প্রায় অর্ধেক।
আর্থিক ক্ষতি: বাহরাইনে মার্কিন ৫ম নৌবহরের সদরদপ্তরে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি ডলার ধরা হয়েছে। এছাড়া কাতারের ১.১ বিলিয়ন ডলারের রাডার সিস্টেম রয়েছে।
হতাহত: কুয়েতের শুয়াইবা বন্দরে নিহত ৬ জন ছাড়াও সৌদি আরবের একটি ঘাঁটিতে আরও একজন মার্কিন সৈন্য নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মোট আহত মার্কিন সৈন্যের সংখ্যা প্রায় ১৪০ জনের কাছাকাছি।
সারকথা: ইরানের এই হামলাগুলো শুধু সামরিক ঘাঁটিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মার্কিন লজিস্টিক হাব, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দামী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (থাড ও রাডার) ধ্বংস করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।