সফরে নামাজের বিধান নিয়ে অনেকের মধ্যেই একটি ভুল ধারণা রয়েছে—মুসাফির হলে ফরজ নামাজ কসর করার পাশাপাশি সুন্নতে মুআক্কাদাও বুঝি পড়া যায় না। আবার কেউ কেউ মনে করেন, সফরে সুন্নত নামাজ পড়াই উচিত নয়। অথচ বিষয়টি এতটা সরল নয়। ইসলামি শরিয়ত সফরের কষ্ট, তাড়াহুড়া ও পরিস্থিতি বিবেচনায় সুন্নত নামাজের ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছে; তবে এর অর্থ এই নয় যে, সফরে সুন্নত নামাজ পড়া নিষিদ্ধ বা একেবারেই অনুচিত।
বিশেষ করে ফজরের দুই রাকাত সুন্নত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবার মুসাফির যদি নিরাপদ ও স্বস্তিপূর্ণ অবস্থায় থাকে, তাড়াহুড়ো না থাকে এবং নামাজ আদায়ে সফরসঙ্গীদের কোনো অসুবিধা না হয়, তাহলে সুন্নত নামাজ আদায় করা উত্তম। তাই ‘সফরে সুন্নত নামাজ পড়া যায় না’—এমন ঢালাও বক্তব্য সঠিক নয়।
সফরে ফরজ নামাজ কসর, সুন্নতের কসর নেই
সফরের কারণে চার রাকাত ফরজ নামাজ দুই রাকাত পড়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু সুন্নত নামাজের ক্ষেত্রে ‘কসর’ করার কোনো বিধান নেই। অর্থাৎ দুই রাকাতের সুন্নত দুই রাকাতই থাকবে; চার রাকাত সুন্নত হলে সেটিকে সফরের কারণে দুই রাকাতে পরিণত করার নিয়ম নেই।
তবে মুসাফিরের জন্য সুন্নত নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে শরিয়ত বিশেষ ছাড় রেখেছে। সফরের পথে তাড়াহুড়ো থাকলে, চলার প্রস্তুতি নিতে হলে কিংবা সুন্নত পড়ার কারণে সফরসঙ্গী ও অন্যান্য যাত্রীদের অপেক্ষা করতে হলে সুন্নত নামাজ ছেড়ে দেওয়া জায়েজ। হানাফি ফিকহের ফতোয়া অনুযায়ী, এ অবস্থায় বিশেষত চলন্ত সফরে সুন্নত নামাজ ছেড়ে দেওয়ার অবকাশ রয়েছে।
অন্যদিকে, মুসাফির যদি কোনো স্থানে পৌঁছে স্বস্তি ও স্থিরতা লাভ করেন, অথবা সফরে তাড়াহুড়ো না থাকে, তাহলে সুন্নত নামাজ আদায় করাই উত্তম।
সফরে সুন্নত নামাজ পড়ার প্রমাণও রয়েছে
সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈদের আমল থেকে বোঝা যায়, সফরে সুন্নত নামাজ আদায়ের ব্যাপারে একেবারে নিষেধাজ্ঞা নেই। বরং কেউ কেউ সফরেও নিয়মিত নফল ও সুন্নত নামাজ আদায় করতেন।
হজরত ইবনে জুরাইজ (রহ.) বলেন, তিনি হজরত আতা (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন— আমি যখন সফরে থাকি এবং নামাজ কসর করে পড়ি, তখন কি ফরজের আগে বা পরে সুন্নত নামাজ পড়তে পারি?
হজরত আতা (রহ.) উত্তর দেন—
نَعَمْ، آخُذُ بِالرُّخْصَةِ وَالسُّنَّةِ، فَأَقْصُرُ، ثُمَّ أُحِبُّ زِيَادَةَ الْخَيْرِ فَأَتَطَوَّعُ
‘হ্যাঁ, পারো। আমি রুখসত ও সুন্নত—উভয়টির অনুসরণ করি। তাই কসর করি এবং অতিরিক্ত কল্যাণ লাভের আশায় নফল নামাজও আদায় করি।’ (মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৪৪৫২)
এটি তাবেঈ হজরত আতা (রহ.)-এর বক্তব্য; এটি সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস নয়। তাই উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে এটিকে তাবেঈর আসার হিসেবে উল্লেখ করাই যথাযথ।
তবে সফরে সুন্নত না পড়ার আমলও পাওয়া যায়
এখানে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সফরের আমলও দেখা দরকার। হজরত ইবনে ওমর (রা.) বলেন—
صَحِبْتُ النَّبِيَّ ﷺ فَلَمْ أَرَهُ يُسَبِّحُ فِي السَّفَرِ
‘আমি নবী (সা.)-এর সফরসঙ্গী ছিলাম; সফরে তাকে (ফরজের আগে-পরে) নফল নামাজ আদায় করতে দেখিনি।’ (বুখারি ১১০১)
আরেক বর্ণনায় হজরত ইবনে ওমর (রা.) বলেন—
صَحِبْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ فَكَانَ لَا يَزِيدُ فِي السَّفَرِ عَلَى رَكْعَتَيْنِ
‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সফরসঙ্গী ছিলাম; তিনি সফরে দুই রাকাতের বেশি নামাজ আদায় করতেন না।’ (বুখারি ১১০২)
তবে এ বর্ণনাগুলো থেকে সফরে সব ধরনের সুন্নত নামাজ পড়া নিষিদ্ধ—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কারণ অন্য বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সফরে বিভিন্ন নফল নামাজ আদায়ের প্রমাণও রয়েছে। তাই ফকিহরা সফরের তাড়াহুড়ো ও চলমান অবস্থা এবং স্থির ও স্বস্তিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে পার্থক্য করেছেন।
ফজরের দুই রাকাত সুন্নতের গুরুত্ব
সফরের সময় বিশেষভাবে ফজরের দুই রাকাত সুন্নতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ দুই রাকাতের প্রতি বিশেষ যত্নবান ছিলেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন—
أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ كَانَ لَا يَدَعُ أَرْبَعًا قَبْلَ الظُّهْرِ وَرَكْعَتَيْنِ قَبْلَ الْغَدَاةِ
‘নবী (সা.) জোহরের আগে চার রাকাত এবং ফজরের আগে দুই রাকাত কখনো ছাড়তেন না।’ (বুখারি ১১৮২)
হজরত ইবনে ওমর (রা.)-এর বর্ণনাতেও ফজরের আগে দুই রাকাত সুন্নতের কথা বিশেষভাবে এসেছে।
তাই সফরের কারণে সাধারণ সুন্নত নামাজে ছাড় থাকলেও ফজরের দুই রাকাত সুন্নতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অবশ্য সফরের পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ও সময়ের সংকট অনুযায়ী ফিকহে এর ক্ষেত্রেও কিছু অবকাশের কথা বলা হয়েছে।
চলন্ত অবস্থায় নফল নামাজের সুযোগ
সফরে নফল নামাজের ব্যাপারে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— রাসুলুল্লাহ (সা.) বাহনে থাকা অবস্থায় নফল নামাজ আদায় করতেন। হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত—
كَانَ يُصَلِّي عَلَى رَاحِلَتِهِ نَحْوَ الْمَشْرِقِ، فَإِذَا أَرَادَ أَنْ يُصَلِّيَ الْمَكْتُوبَةَ نَزَلَ فَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তার বাহনে পূর্বদিকে মুখ করে নফল নামাজ আদায় করতেন। আর যখন ফরজ নামাজ আদায় করতে চাইতেন, তখন বাহন থেকে নেমে কিবলামুখী হতেন।’ (বুখারি ১০৯৯)
এতে বোঝা যায়, সফরে নফল নামাজ আদায়ের সুযোগ রয়েছে; তবে ফরজ নামাজের বিধান আলাদা এবং তা যথাযথভাবে কিবলামুখী হয়ে আদায় করতে হয়।
সফরে সুন্নত পড়বেন কখন, আর কখন ছাড়বেন?
বিষয়টি সহজভাবে এভাবে মনে রাখা যায়—
তাড়াহুড়ো ও চলমান সফর: বাস, ট্রেন, গাড়ি বা অন্য কোনো সফরে সময়ের সংকট থাকলে এবং সুন্নত আদায় করলে সফরসঙ্গীদের অসুবিধা হওয়ার আশঙ্কা থাকলে সুন্নত নামাজ ছেড়ে দেওয়ার অবকাশ রয়েছে।
স্বস্তি ও স্থিরতার অবস্থা: কোনো জায়গায় পৌঁছে গেলে কিংবা সফরের মধ্যে পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ থাকলে সুন্নত নামাজ আদায় করা উত্তম। বিশেষ করে হানাফি ফিকহের পছন্দনীয় মত অনুযায়ী, নিরাপদ ও স্থির অবস্থায় সুন্নত নামাজ বজায় রাখা উচিত।
ফজরের সুন্নত— দুই রাকাত ফজরের সুন্নতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সুন্নতের কসর নেই— সফরের কারণে সুন্নত নামাজের রাকাত সংখ্যা কমে যায় না; কসর কেবল চার রাকাতের ফরজ নামাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
মুসাফির কাকে বলা হয়?
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নিজের বসবাসের শহর বা এলাকার সীমানা অতিক্রম করে এমন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বের হলে, যার দূরত্ব প্রায় ৪৮ ইংরেজি মাইল বা ৭৭.৪ কিলোমিটার, তাকে শরিয়তের দৃষ্টিতে মুসাফির গণ্য করা হয়।
তাহলে ‘সফরে সুন্নত পড়া যায় না’—কথাটি কি সঠিক?
না, এভাবে ঢালাওভাবে বলা সঠিক নয়।
সফরে সুন্নত নামাজ কসর করা হয় না, আবার সব অবস্থায় তা পরিত্যাগ করাও জরুরি নয়। বরং সফরের পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে। তাড়াহুড়ো, চলমান সফর, সময়ের সংকট বা সফরসঙ্গীদের অসুবিধার আশঙ্কা থাকলে সুন্নত নামাজ ছেড়ে দেওয়ার অবকাশ রয়েছে। আর পর্যাপ্ত সময় ও স্বস্তি থাকলে সুন্নত নামাজ আদায় করা উত্তম। বিশেষ করে ফজরের দুই রাকাত সুন্নতের প্রতি বিশেষ যত্নশীল হওয়া উচিত।
সূত্র: যুগান্তর