একটি মানুষের জীবনের প্রথম এবং প্রধান শিক্ষক হলেন তাঁর পিতামাতা। অনেক সময় ক্যারিয়ার আর নিজেদের ছোট পরিবারের পেছনে ছুটতে গিয়ে সেই শেকড়কে ভুলে যাই। বৃদ্ধাশ্রমের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা আমাদের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়।
ইসলামে আল্লাহর ইবাদতের পরেই পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁদের সন্তুষ্টিতে জীবনের বরকত লাভ। তাদের প্রতি ১০টি দায়িত্ব তুলে ধরা হলো:
১. আল্লাহর ইবাদতের পর প্রধান দায়িত্ব
পিতামাতার সেবা করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি মৌলিক ইবাদত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণার ঠিক পরেই পিতামাতার প্রতি দয়া করার নির্দেশ এসেছে।
আল্লাহ বলেছেন, “তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতামাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩)
২. বার্ধক্যে বিশেষ ধৈর্য ও মমতা
পিতামাতা যখন বার্ধক্যে উপনীত হন, তখন তাঁদের মেজাজ বা আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে। সেই সময়ে তাঁদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
আল্লাহ বলেছেন, “তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদের প্রতি ‘উফ’ শব্দটি পর্যন্ত বলো না এবং তাদের ধমক দিও না।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩)
৩. জান্নাতের সহজতম দরজা
পেশাগত সাফল্য বা বিত্ত-বৈভব আপনাকে সাময়িক সুখ দিলেও, পরকালীন চূড়ান্ত সাফল্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে পিতামাতার দোয়ার মধ্যে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “পিতা জান্নাতের মধ্যবর্তী দরজা। এখন তুমি চাইলে তা নষ্ট করতে পারো অথবা তা রক্ষা করতে পারো।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯০১)
৪. মায়ের বিশেষ অগ্রাধিকার
সন্তানের ওপর বাবার চেয়েও মায়ের অধিকার ও ঋণ অনেক বেশি। নবীজি (সা.) তিনবার মায়ের কথা বলার পর বাবার কথা উল্লেখ করেছেন।
এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, “আমার কাছে সবচেয়ে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিকারী কে?” নবীজি বললেন, “তোমার মা।” তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, “তারপর কে?” নবীজি বললেন, “তোমার মা।” তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, “তারপর কে?” নবীজি বললেন, “তোমার মা।” লোকটি চতুর্থবার জিজ্ঞেস করলেন, “তারপর কে?” তিনি বললেন, “তোমার বাবা।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৭১)
৫. জিহাদের চেয়েও বড় সেবা
ঘরের মানুষের সেবা বাদ দিয়ে কোনো বড় নেক কাজ বা বাইরের দায়িত্ব পালন করা প্রকৃত ধার্মিকতা নয়। ঘরের সেবাকে ইসলাম সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।
এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার পিতামাতা কি জীবিত?” সে বলল, “হ্যাঁ।” তিনি বললেন, “তবে তাদের সেবায় জিহাদ (শ্রম) করো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০০৪)
৬. পিতামাতার বন্ধুদের প্রতি সৌজন্য
পিতামাতার মৃত্যুর পরও তাঁদের প্রতি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাঁদের বন্ধুদের সম্মান করা এবং তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা পিতামাতার প্রতি ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “বাবার বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা শ্রেষ্ঠতম সদ্ব্যবহার।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫২)
৭. পিতামাতার জন্য দোয়া করা
তাঁরা জীবিত থাকুন বা মৃত, সন্তানের পক্ষ থেকে দোয়া তাঁদের জন্য বড় উপহার। কোরআনে তাঁদের জন্য একটি বিশেষ দোয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, “হে আমার প্রতিপালক, তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে তারা শৈশবে আমাকে দয়া ও মমতার সঙ্গে লালনপালন করেছেন।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৪)
৮. পিতামাতার অবাধ্য না হওয়া
পিতামাতাকে কষ্ট দেওয়া বা তাঁদের হক নষ্ট করা সরাসরি কবীরা পাপ। এর শাস্তি দুনিয়াতেই পাওয়া যায় বলে হাদিসে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ ইচ্ছা করলে সব পাপ মাফ করে দিতে পারেন, কিন্তু পিতামাতার অবাধ্যতার পাপ মাফ করেন না বরং মৃত্যুর আগেই দুনিয়াতে তার শাস্তি দেন।” (বাইহাকি, শুয়াবুল ইমান, হাদিস: ৬৬৪৫)
৯. তাঁদের সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি খোঁজা
আপনি যতই ইবাদত করুন না কেন, পিতামাতা আপনার ওপর অসন্তুষ্ট থাকলে সেই শ্রম বৃথা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “পিতার সন্তুষ্টিতে প্রতিপালকের সন্তুষ্টি এবং পিতার অসন্তুষ্টিতে প্রতিপালকের অসন্তুষ্টি নিহিত।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৮৯৯)
১০. সম্মানজনক সম্বোধন
তাঁদের সঙ্গে কথা বলার সময় কণ্ঠস্বর নিচু রাখা এবং সম্মানজনক শব্দ ব্যবহার করা ইসলামের শিষ্টাচার।
আল্লাহ বলেছেন, “তাদের সঙ্গে কথা বলো সম্মানজনক ও নম্রভাবে এবং মমতাবশে তাদের প্রতি বিনয়ের ডানা অবনমিত করো।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩-২৪)
পিতামাতা আমাদের জীবনে আল্লাহর এক বিশেষ নেয়ামত। বার্ধক্যে তাঁদের প্রতি আমাদের অবহেলা যেন আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের কারণ না হয়। তাঁদের সেবা করার সুযোগ পাওয়া মানে হলো নিজের জীবনের জন্য পরম এক কল্যাণ নিশ্চিত করা।