শিরোনাম
◈ মিয়ানমার সীমান্তে আগের পরিস্থিতি আর সৃষ্টি হবে না: প্রত্যাশা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর  ◈ জাতীয় পার্টিতে কোনো বিভেদ নাই: রওশন এরশাদ ◈ সাংবাদিকরা চাষাবাদ করছেন কি না, দেখার দায়িত্ব পেলেন শাইখ সিরাজ ◈ কারামুক্ত বিএনপি নেতা আলালের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন মঈন খান ◈ গাজায় যুদ্ধ নয়, গণহত্যা চলছে: প্রধানমন্ত্রী ◈ শুক্রবার বিশ্বে বাতাস দূষণের তালিকায় ঢাকা ছিল সপ্তম ◈ মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে নির্বাচন  নিয়ে কেউ প্রশ্ন করেনি: প্রধানমন্ত্রী ◈ লোহিত সাগরে হামলায় ব্যবহার করা হবে সাবমেরিন অস্ত্র: হুথি নেতা  ◈ ২১ বলে সেঞ্চুরি করে বিশ্ব রেকর্ড গড়লেন আসজাদ ◈ যারা সরকার উৎখাত করতে চায়, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি তাদেরই কারসাজি: প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত : ২৯ নভেম্বর, ২০২৩, ১০:৪৬ দুপুর
আপডেট : ২৯ নভেম্বর, ২০২৩, ০৫:০৮ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানী ডা. ফজলে  আকবর ও অধ্যাপক স্বপ্নীলের ‘ন্যাসভ্যাক’ বিস্ময়!

ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর ও অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব

ভূঁইয়া আশিক রহমান: [২] বিশ্বের বহু দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের জন্য দায়ী হেপাটাইটিস বি’ ভাইরাস। প্রতিবছর এই ভাইরাসের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে লিভারের বিভিন্ন রোগে মারা যান ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ। মোটাদাগে ক্রনিক হেপাটাইটিস বি’র চিকিৎসা সম্ভব হলে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করা অনেকটাই সম্ভব। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও হেপাটাইটিস বি’র চিকিৎসায় বিভিন্ন ধরনের এন্টিভাইরাল ওষুধ পাওয়া যায়। কিন্তু এই সমস্ত ওষুধের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা আশানুরূপ নয়। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের চিকিৎসকেরা হেপাটাইটিস বি’র চিকিৎসায় অধিকতর নিরাপদ ও কার্যকর ওষুধ আবিষ্কারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই ফলশ্রুতিতে কিউবা, জাপান ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে হেপাটাইটিস বি’র চিকিৎসায় আবিষ্কৃত ‘ন্যাসভ্যাক’ নামে নতুন ওষুধের সফল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করেছেন বাংলাদেশি দুই চিকিৎসা বিজ্ঞানী ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর ও অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)। ইতোমধ্যেই কিউবাসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে ব্যবহার শুরু হয়েছে তাঁদের উদ্ভাবিত নতুন এই ওষুধ।

[৩] হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে জাপানের এহিমে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২০ বছর গবেষণা করছেন ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর। জাপানের সরকারি এই বিশ্ববিদ্যালয়টি গবেষণার জন্য বিশ্বেস্বীকৃত। প্রায় একই সময়ে বাংলাদেশে ‘হেপাটাইটিস বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত প্রায় এক হাজার রোগী নিয়ে কাজ করেছেন অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল। ডা. আকবরের জাপানে গবেষণা ও অধ্যাপক স্বপ্নীলের বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি সংক্রান্ত ক্লিনিক্যাল বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় ন্যাসভ্যাক ব্যবহারের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে আসে ২০০৯ সালে।

[৪] ২০০৯ সালে ২০ জন ক্রনিক হেপাটাইটিস রোগীদের ওপর ন্যাসভ্যাকের প্রথম ফেজ-১ ও ফেজ-২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করা হয়। ক্রনিক হেপাটাইটিস বি-এর চিকিৎসায় এটি নিরাপদ ওষুধ হিসেবে প্রমাণিত হয়। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা যায়, ন্যাসভ্যাক ব্যবহারে শতকরা ৩৩ ভাগ ক্রনিক হেপাটাইটিস বি রোগীর রক্তে এইচবিএস এজি কমে এসেছে এবং প্রায় ১১ শতাংশের তা নির্মূল হয়েছে। ছয় মাস পরেও শতভাগ রোগীর লিভারের প্রদাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলো। ন্যাসভ্যাকের এই সাফল্যের খবর এশিয়ান প্যাসিফিক লিভার অ্যাসোসিয়েশনের অফিসিয়াল জার্নাল ‘হেপাটোলজি ইন্টারন্যাশনাল’-এ প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালের নভেম্বর সংখ্যায়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে ১৬০ জন ক্রনিক  হেপাটাইিটস বি-তে আক্রান্ত রোগীর ওপর ন্যাসভ্যাকের ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করা হয়। এই ট্রায়ালটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল গভ.-এ রেজিস্ট্রিও করা হয়। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল গভ. এফডিএ এবং এনআইএইচ কর্তৃক অনুমোদিত সংস্থা। এছাড়া এই ট্রায়ালের জন্য বাংলাদেশের ওষুধ প্রশাসনের অনুমতি নেওয়া হয়। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের ‘ইথিক্যাল অ্যাপ্রুভাল’ও নেওয়া হয়।

[৫] ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ৮০ জন ক্রনিক হেপাটাইটিস বি রোগীকে ১০ বার ন্যাসভ্যাক দেওয়া হয়। বাকি ৮০ জনকে ৪৮ বার বর্তমান বিশ্বে হেপাটাইটিস বি চিকিৎসায় ব্যবহৃত অন্যতম কার্যকর ও সবচেয়ে দামি ওষুধ ‘পেগাইলেটেড ইন্টারফেরন’ দিয়ে চিকিৎসার জন্য মনোনীত করা হয়। চিকিৎসা শেষ হবার ৬ মাস পর দেখা যায়, পেগাইলেটেড ইন্টারফেরন ব্যবহারে ৩৮ শতাংশ রোগী উপকৃত হয়েছেন। এর বিপরীতে ন্যাসভ্যাকে আরোগ্য লাভ করেছেন ৫৯ শতাংশ রোগী। একবছর পরও ন্যাসভ্যাক গ্রহণকারী রোগীদের তেমন কোনো পাশর্^প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি চিকিৎসা শেষ হবার দুই এবং তিন বছর পরও ন্যাসভ্যাক গ্রহণকারী রোগীদের কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হয়। এই তিনটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, হেপাটাইটিস বি’র চিকিৎসায় প্রচলিত অন্য ওষুধগুলোর তুলনায় ন্যাসভ্যাক অনেক বেশি কার্যকর। 

[৬] হেপাটাইটিস বি-ভাইরাসের ওষুধ ন্যাসভ্যাক উদ্ভাবকদের অন্যতম তিন সদস্য খুব সম্প্রতি মুখোমুখি হয়েছিলেন আমাদের অর্থনীতির। ন্যাসভ্যাক আবিষ্কারের নেপথ্যে অনেক অজানা কথা তাঁরা বলেছেন আমাদের সঙ্গে। বাংলাদেশের পক্ষে অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল, জাপানের প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর। ছিলেন ড. জুলিও। তিনি ন্যাসভ্যাক গবেষক দলের অন্যতম সদস্য। কিউবান প্রতিনিধিদের পক্ষে তিনি ছিলেন। একইসঙ্গে ছিলেন ন্যাসভ্যাকের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ১, ২ ও ৩ এর সিআরও (ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন)-এর প্রতিনিধিও।  ন্যাসভ্যাক বাংলাদেশের বাজারে নিয়ে আসার সকল প্রস্তুতি থাকলেও করোনার কারণে সেটি সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে এখন থেকে ন্যাসভ্যাক ওষুধটি বাজারে নিয়ে আসার সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ন্যাসভ্যাক  হেপাটাইটিস বি’র চিকিৎসা ব্যবস্থায় বড় ধরনের অবদান রাখতে যাচ্ছে। এমনটিই জানিয়েছেন তারা। ন্যাসভ্যাক নিয়ে তারা কে কী বলছেন?

[৭] ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর : ন্যাসভ্যাক হচ্ছে ক্রনিক হেপাটাইটিস বি’র চিকিৎসার একটি ওষুধ। কিন্তু এটাকে সাধারণত ভ্যাকসিন বলা হয়। কারণ ভ্যাকসিন যে এন্টিজেন দিয়ে তৈরি করা হয়, ন্যাসভ্যাকেও দুটি এন্টিজেন ব্যবহার করা হয়েছে। ভ্যাকসিন নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি আছে। বলা হয়, ভ্যাকসিন সাধারণত রোগ-প্রতিরোধের জন্য ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এটা একটা থেরাপি থেকে এসেছে। অথবা বলা যেতে পারে, ক্রনিক হেপাটাইটিস বি’র চিকিৎসার জন্য আমরা এটাকে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছি। সংক্ষেপে বলতে পারি, হেপাটাইটিস বি’র জন্য এটা একটা ইমিউন থেরাপি। ন্যাসভ্যাক একইসঙ্গে একটি কনসেপ্ট। কনসেপ্ট মানে একটা চিন্তাধারা। ফলে শুধু হেপাটাইটিস বি’তেই এখন আমরা করছি। তার মানে যে এটা শুধু হেপাটাইটিস বি’তেই থাকবে তা নয়। এটা দিয়ে অনেক রোগের চিকিৎসা করা যাবে। কারণ এটা একটা ইমিউন  থেরাপি। ইমিউন থেরাপি বলতে আমরা যেটা বুঝি, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা। আগে প্রতিষেধক বলা হতো। কারণ কোন রোগের জন্য ইমিউন থেরাপি কার হলে সে রোগটি আর হবে না। কিন্তু অসুখ হওয়ার পরেও আমাদের একটা শক্তি দরকার, সেই শক্তিটাই ইমিউনিটি। এতো বছর ধরে কাজ করে আমরা একটা মেকানিজম তৈরি করেছি যাতে এটা বিভিন্ন অসুখে ব্যবহার করা যায়। তবে এখানকার জন্য যে ট্রায়ালগুলো করা হয়েছে এবং নতুন যেগুলো শুরু করা হয়েছে সেগুলো হেপাটাইটিস বি’র জন্য করা হয়েছে। কিন্তু এর আগেও আমরা অন্যান্য অসুখেও ন্যাসভ্যাক প্রয়োগ করেছি। যেমন কোভিডের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছি। এর ফান্ডামেন্টাল যে বেসিসটা আছে, সেটা আমরা ব্যবহার করেছি ক্যান্সার সহ আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে। এই ইমিউনো থেরাপি দিয়ে ক্রনিক ইনফেকশন মানে যেসব ইনফেকশনগুলো অনেকদিন থাকে, যেমন ক্যান্সার বা বিভিন্ন ধরনের এলার্জি আছে, যেগুলোকে অটোইমিউন ডিজিজ বলা হয়, সেগুলোর চিকিৎসা করা যেতে পারে। এটাই হচ্ছে ন্যাসভ্যাক। 

[৮] অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল : ন্যাসভ্যাকের ফেইজ-১ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সুস্থ মানুষের শরীরে করা হয়েছিলো, সেটা কিউবায়। তারপর বাংলাদেশে ন্যাসভ্যাকের ফেজ-১, ২ ও ৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করি অসুস্থ রোগীদের শরীরে। এর আগে একাধিক অ্যানিমেল স্টাডি হয়েছে। এর মধ্যে একটি বড় এনিমেল স্টাডি হয়েছে ডা. আকবরের ল্যাবে, জাপানে। যখন আমরা ফেজ-১, ২ ও ৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করলাম তখন প্রাথমিকভাবে বি ভাইরাস আক্রান্ত এক গ্রুপ রোগীকে ন্যাসভ্যাক দেওয়া হয়েছিল, আর এক গ্রুপ রোগীকে আমরা ইন্টারফেরন দিয়ে চিকিৎসা করেছিলাম। ট্রায়াল শেষ করে আমরা দেখলাম যে, যারা ন্যাসভ্যাক পেয়েছেন তাদের বি ভাইরাসের রিপোর্টগুলো অনেক ভালো এবং বেশিরভাগ রোগীর ডিএনএ নেগেটিভ হয়েছে। অনেকের ডিএনএ লেভেল কমেছে। অর্থাৎ তাদের ক্ষেত্রে ভাইরাসটা অনেক বেশি নিষ্ক্রিয় হয়েছে। আমরা দেখলাম ভবিষ্যতে এ রোগটি আবার ফিরে আসবে না, এই রেটটিও খুব ভালো। এটি ইনিশিয়ালি আশা জাগানিয়া একটি বিষয় ছিল। একবছর পর যখন আমরা আবার ফলোআপ করতে গেলাম তখন আমাদের মনে আশা জাগানিয়া একটা জিনিস দেখলাম, যারা ন্যাসভ্যাক পেয়েছেন তাদের লিভার ডিজিজ প্রোগ্রেস করেনি। আমরা তো চিকিৎসা বন্ধ রেখেছিলাম। কারণ ন্যাসভ্যাকও মেয়াদি চিকিৎসা, ইন্টারফেরনও মেয়াদি চিকিৎসা। যারা ইন্টারফেরন পেলো তাদের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ এই যে এক বছর তারা চিকিৎসার বাইরে তাদের এই ১০ শতাংশেরই লিভার সিরোসিস হয়ে গেছে। কিন্তু চিকিৎসার আগে কারো লিভার সিরোসিস ছিলো না। 

[৯] ন্যাসভ্যাক দিয়ে যাদের চিকিৎসা করা হলো তাদের কারো লিভার সিরোসিস ডেভেলপ করেনি। এরপর আমরা ডা. আকবরের নেতৃত্বে রোগীদের ফলোআপ করেছি। তিন বছর পর, পাঁচ বছর পর এবং এখন দশ বছরের ফলোআপের কাজটি চলছে ফেজ-৩ রোগীদের। সেখানে দেখা যাচ্ছে, পাঁচ বছর পর্যন্ত কোনো রোগীরই লিভার সিরোসিস হয়নি এবং দশ বছরের যে প্রাথমিক ডাটা তাতেও দেখা যাচ্ছে হয়নি বললেই চলে। হয়তো দুয়েকজনের হলেও হয়ে থাকতে পারে। এর মানে হলো ন্যাসভ্যাক হলো এমন একটি ওষুধ যে আপনি এটি ব্যবহার করলে আপনার ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে আছে, হয়তো কারো কারো ক্ষেত্রে ভাইরাসটি ফিরে আসবে।  কিন্তু নিয়ন্ত্রণে তো থাকবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ৬ মাস চিকিৎসা করলে ১০ বছর পর্যন্ত নিশ্চিত থাকতে পারবেন যে রোগীর লিভারে আর কোনো খারাপ রোগ হবে না। এটি কেন এতো আশা জাগানি? কারণ আমরা বি ভাইরাসকে যেসব ওষুধ দিয়ে এখন চিকিৎসা করি, এই ওষুধগুলো মুখে খেতে হয়। এই ওষুধগুলো কখনো কখনো সারাজীবনও খেতে হয়। অবশ্যই ১৫-২০ বছর ধরে খেতে হয়। অনিয়মিত ওষুধ খেলে আরও বিপদ। কেউ ওষুধ খেলো, বন্ধ করলোÑ আবার খেলো। ফলে ভাইরাসটা লিভার ফেইলিউর করে দিতে পারে। ভাইরাসের ফ্লেয়ারে ভাইরাসটা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে গিয়ে লিভার ফেইলিউর করতে পারে। আর যদি নিয়মিত খানÑ ১০ বছর, ১৫ বছর বা সারা জীবনও খান তাদেরও কোনো নিশ্চয়তা নেই যে লিভারটা ভালো থাকবেই। ন্যাসভ্যাকের গুরুত্বটা এখানেই। আপনি ৬ মাস ওষুধ ব্যবহার করছেন, তারপর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিশ্চিত থাকতে পারছেন যে, আপনার কোনো সমস্যা নেই। এটাই মানুষ চাচ্ছে। মানুষ সারা জীবন ওষুধ খেতে চায় না। সারা মানবজাতি এই বি ভাইরাসের ওষুধের প্রত্যাশায় আছে। ন্যাসভ্যাক রোগটাকেও মোটামোটি নিয়ন্ত্রণে রাখছে, আর লিভারকেও ভালো রাখছে। 
[১০] বিশ্বে বহু রোগী আছেন যারা বি-ভাইরাসের ওষুধ খাচ্ছেন। তারা ওষুধ ছাড়তে পারছেন না। বিশেষ করে পাশ্চাত্যে এটা বেশি। তারা নিয়মিত ওষুধ খান, ওষুধ ছাড়তে পারেন না ভয়ে! কারণ ওষুধ ছাড়লে লিভার ফেইল করবে। আমরা যেটা করেছি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা ওষুধ খাচ্ছেন, তাদের মধ্যে একদলের ওষুধ বন্ধ করে দিয়ে ন্যাসভ্যাক দিয়েছি। ৬ মাস ন্যাসভ্যাক দিয়ে চিকিৎসা বন্ধ করে দিয়েছি। একবছর পরে এসে সেই একই রকম ফলাফল পাচ্ছি। কারো লিভারে খারাপ কিছু দেখা যায়নি। যারা কোনো সময় হেপাটাইটিস বি’র কোনো ওষুধ খাননি তারা ৬ মাস ন্যাসভ্যাকের চিকিৎসা নিয়ে ১০ বছর ভালো আছেন। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, এই ওষুধ এক অসম্ভবকে সম্ভব করে এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে। তাই বলা হচ্ছে এটি বি ভাইরাসের ক্ষেত্রে এক অনন্য চিকিৎসা। এটি হলো ক্রনিক ইনফেকশনের চিকিৎসা। ক্রনিক ইনফেকশন একটি দীর্ঘমেয়াদি ইনফেকশন। পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত ন্যাসভ্যাক ছাড়া অন্য কোনো ক্রনিক ইনফেকশনের ওষুধ ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পার হতে পরেনি। এজন্যই বলছি, এটি একটা থেরাপিউটিক ভ্যাকসিন, এটি একটি ইমিউন থেরাপি। এর মানে হলো এটি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়ে ভাইরাস বা ইনফেকশনকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এই পর্যায়ের কোনো ওষুধ পৃথিবীর কোনো দেশে এখন পর্যন্ত ফেজ-২ পার হতে পারেনি। সেখানে ন্যাসভ্যাক ফেজ-৩ পার করেছে এবং ১০ বছর ফলোআপের রেজাল্টও চলে এসেছে।

[১১] হেলাল উদ্দিন : বাংলাদেশে ন্যাসভ্যাকের যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালটা হয়েছে, তার মূল গবেষক ছিলেন অধ্যাপক মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল। তার নেতৃত্বে কিছু গবেষক ছিলেন, কিছু রিসার্চ এসিসটেন্ট ছিলেন। আমাদের মূল কাজ ছিলো রোগীদের দেখাশোনা করা। এর জন্য ভলান্টিয়ার ছিলো। প্রথম ট্রায়ালে ১৫৮ জন রোগী ছিলেন। এই ১৫৮ জন রোগীর সঙ্গে কো-অর্ডিনেশন করা, তাদের কোনো সমস্যা হলে প্রধান গবেষককে জানানো, আবার গবেষকের মাধ্যমে তাদের ট্রিটমেন্ট করার কাজগুলো আমরা করেছি। এখানে ডকুমেন্টশন, ম্যানেজমেন্ট, কো-অর্ডিনেশনের বড় কাজ ছিল। কারণ আমরা যে ট্রায়ালটা করেছি সেখানে মোটামোটিভাবে ঢাকা, ঢাকার পার্শ্ববর্তী, কিছু দূরবর্তী ভলান্টিয়াররাও ছিলেন। 

[১২] ড. জুলিও : আমি অত্যন্ত আনন্দিতÑন্যাসভ্যাক নিয়ে কথা বলতে পারছি। কারণ ন্যাসভ্যাক এমন এক ওষধু, যা বিশ্বের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। দীর্ঘ গবেষণা, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্যদিয়ে এই ওষুধটি রোগীদের জন্য বাজারে এসেছে। বাংলাদেশের রোগীরা ওষুধ হাতের নাগালে না পেলেও ইতোমধ্যে কিউবার রোগীরা ওষুধ তাদের হাতের নাগালে পাচ্ছেন। অনেক ক্রনিক হেপাটাইটিস বি’র রোগী ন্যাসভ্যাক ব্যবহার করছেন। কিউবা ছাড়াও বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে ন্যাসভ্যাক ব্যবহার হচ্ছে। ফলাফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এ কারণেই বলছি, ন্যাসভ্যাক মানবজাতির জন্য একটা আনন্দের বার্তা হয়ে এসেছে। কোটি কোটি বি-ভাইরাসের রোগী দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার মধ্যে থাকতে হয়, যা তাদের প্রত্যাশিত নয়। দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা খুব ব্যয়বহুল হয়ে থাকে। ফলে মানুষ চায় স্বল্প সময়ের চিকিৎসায় রোগ প্রতিরোধ বা রোগ থেকে মুক্তি। এমতাবস্থায় ন্যাসভ্যাক নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা আশাপ্রদ এবং ফলাফল সুখকর। 

[১৩] ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর : জাপানে এখন যে ট্রায়াল হচ্ছে ন্যাসভ্যাকের, সেটা হচ্ছে ক্রনিক হেপাটাইটিস বি’র। কিন্তু যাদের এএলটি নরমার, যাদের ক্রনিক হেপাটাইটিস আছে তাদের মধ্যে ৭০-৮০ শতাংশের বেশি এএলটি নরমাল। নরমাল মানে হলো তাদের লিভারের ড্যামেজ ওই সময়তে নেই বললেই চলে। এটা দুই রকম রোগীদের ক্ষেত্রেই আমরা ব্যবহার করেছি। লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত রোগীদের ন্যাসভ্যাক দিয়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এখনো হয়নি। এটার জন্য অনেক অর্থ দরকার তাই, এ কাজে আমরা এখনো পর্যন্ত হাত দিতে পারিনি। লিভার ক্যান্সারে অন্যভাবে আমরা এটাকে কাজ করাতে চেষ্টা করছি। আমরা প্রাণীদেহে কাজ করছি ভবিষ্যতে যাতে লিভার ক্যান্সারে ন্যাসভ্যাককে ব্যবহার করতে পারি। জাপানে ৬টি ইউনিভার্সিটিতে একসঙ্গে এ নিয়ে কাজ হচ্ছে। বাংলাদেশে আমরা ফেইজ-১ ও ২ একসঙ্গে করেছি। ফেইজ-৩ সম্পন্ন করেছি। কিন্তু জাপানে যেটা করা হচ্ছে সেটাকে ফেইজ-২ বলা হয়, যেখানে সেইফটি খুব বেশি করে দেখা হয়। ওষুধের কার্যকারিতা কেমন তা খুব করে দেখা হয়। সেই ট্রায়ালটা চলছে। প্রায় ৫ বছরের বেশি হয়ে গেছে। জাপানেও ৬০-৮০ ভাগ রোগীর ওপর ন্যাসভ্যাক খুব ভালো কাজ দিচ্ছে। ট্রায়াল হিসেবে খুব বড় একটি সেইফটি ট্রায়াল করা হয়েছে। যেমন অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও হংকংয়ের মতো দেশে।

[১৪] হেপাটাইটিস বি’র চিকিৎসা, লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সার প্রতিরোধ করবার জন্য এমন একটি ওষুধের প্রয়োজন যা রোগীর জন্য নিরাপদ, হেপাটাইটিসের সীমাকে কমিয়ে আনতে পারে ও হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের ডিএনএকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এসব গুণাগুন সম্বলিত ওষুধটিই হচ্ছে ন্যাসভ্যাক, যা দুই দশকের বেশি সময় ধরে কিউবা, জাপান ও বাংলাদেশের যৌথ গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক সহযোগিতায় আবিষ্কৃত হয়েছে। যদিও এ নিয়ে বিশ^ব্যাপী আরও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

[১৫] অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল : হেপাটাইটিস বি ভাইরাস নিজে লিভারের কোনো ক্ষতি করে না। ভাইরাস যেটা করে তাহলো ভাইরাস লিভারের মধ্যে প্রবেশ করার পর ভাইরাসের যে ডিএনএ আছে, সেটা মানুষের লিভার সেলের ডিএনের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ করার যে শক্তি বা ইমিউনিটি আছে, তা ভাইরাসকে মারতে গিয়ে লিভারকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এক্ষেত্রে বি-ভাইরাস লিভারকে ধ্বংস করছে না বরং শরীরই লিভারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে আমরা যদি ওষুধ তৈরি করতে চাই, আমাদের এমন একটি ওষুধ তৈরি করতে হবে, যা আমাদের ভাইরাসটাকেও ধ্বংস করে দেবে আর লিভারকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। তবে এ ধরনের ওষুধ তৈরি করা খুব কঠিন। এখন পর্যন্ত যে ওষুধগুলো আমরা ব্যবহার করি, সেগুলো হচ্ছে মোটামুটি ভাইরাসকে দমন করে রাখে, কিন্তু শরীর থেকে নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। এ কারণে যখন রোগীরা ওষুধ বন্ধ করে দেন তখন ভাইরাসটা আবারও ফিরে আসে।

[১৬] অনেক সময় কেউ হয়তো জানেনই না তার বি ভাইরাস আছে। কেউ হয়তো ক্যান্সার রোগের ওষুধ খেলেন বা কারও কিডনি ফেইলিউর ডেভেলপ করলো বা ডায়াবেটিস কন্ট্রোলের বাইরে চলে গেলো বা কোনো কারণে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলো তখন দেখা যায় ভাইরাসটা হঠাৎ অ্যাক্টিভ হয়ে যায়। অর্থাৎ কোনো ভাইরাস বা ওষুধের কারণে ইমিউনিটি সিস্টেম কমে গেলে তখন বি-ভাইরাস শরীরে আবারও অ্যাক্টিভ হয়, তখন লিভার ফেইলিউর পর্যন্ত হতে পারে। আমরা যদিও বলি বর্তমানে বাজারে যে ওষুধগুলো আছে তা নিরাপদ তবুও তার মধ্যে কিছু সমস্যা আছে। একদম প্রয়োজন না হলে বর্তমানে  হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে যেসব ওষুধ বাজারে পাওয়া যায় তা ব্যবহার করা ঠিক হবে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে লিভার সিরোসিস থাকলে এই ওষুধগুলো আমৃত্যু খেতে হয় এবং যদি লিভার সিরোসিস নাও থাকে, আমরা রোগীদের বলি দশ পনেরো বছর কমপক্ষে খেতে হবে। এই যে দশ পনেরো বছর ধরে ওষুধ খাওয়া এবং ওষুধ বন্ধ করলে রোগীর আবারও সমস্যা হওয়া, যা সমাধান করা খুব মুশকিল। তাছাড়া ওষুধগুলোর দামও কম নয়। এই বিবেচনায় সারা পৃথিবীতে একটা জোরদার গবেষণার তাগিদ আছে যে এমন একটা ওষুধ বের করা যায় কিনা, যা ভাইরাসটা নিষ্ক্রিয় করবে কিন্তু লিভারের তেমন কোনো ক্ষতি করবে না। যদি এমন ওষুধ বের করা যায়, তাহলে বি-ভাইরাসের চিকিৎসা পরিবর্তন সাধিত হতো, যেমনটা আমরা সি ভাইরাসের ক্ষেত্রে দেখেছি। এখন আমরা জানি সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল হচ্ছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবী থেকে হেপাটাইটিস বি-কে যতদূর সম্ভব নির্মূল করা। আর একটা বড় ব্যাপার হচ্ছে, সকলের জন্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। ফলে আমাদের একটা সুনির্দিষ্ট মেয়াদে চিকিৎসা করতে হবে, যাতে ভাইরাসটা নির্মূল করা যায় ও রোগটা যে পর্যায়েই থাকুক না কেন, লিভার সিরোসিস যাতে না হয়। সেরকম একটা ওষুধ নিয়েই গবেষণা চলছে, ‘ন্যাসভ্যাক’ সে ধরনেরই একটা ওষুধ। 

[১৭] ড. জুলিও : ন্যাসভ্যাক দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন রোগের চিকিৎসা দেওয়া যাবে, যারা অন্য থেরাপিতে নরমালি ট্রিটমেন্ট পায় না। কারণ সেখানে চিকিৎসার অনেক লিমিটেশন আছে। এই চিকিৎসা যেমন দীর্ঘমেয়াদি তেমনই ব্যয়বহুল, ফলে অনেক রোগী তা দীর্ঘদিন বহন করতে পারেন না। ন্যাসভ্যাক ব্যবহার করা হবে ক্রনিক হেপাটাইটিস বি রোগীদের ওপর। ৮০ শতাংশ ইমিউন থেরাপিই নানা সীমাবদ্ধার কারণে ট্রায়াল শেষে রোগীর কাছে পৌঁছাতে পারে না। বি ভাইরাসের ওষুধ পাঁচ বছর ব্যবহার করার পরেও অনেকে বুঝে উঠতে পারেন না, এই ওষুধ ব্যবহার বন্ধ করবেন কিনা। কারণ ওষুধ বন্ধ করলে ভাইরাসের ফ্লেয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমি জাপানে অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি এবং  যখন এই কাজটা শুরু করি তখন জাপানের অনেক রিসার্চ সেন্টার থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছি। কারণ তাদের কাছে অনেক কন্সেপ্ট ছিল ভিন্ন ধরণের ইমিউন  থেরাপি নিয়ে। ন্যাসভ্যাক একটি নিরাপদ চিকিৎসা। 

[১৮] হেলাল উদ্দিন : আমাদের খুব সুষ্ঠুভাবে ন্যাসভ্যাক ট্রায়ালের ম্যানেজম্যান্ট সম্পন্ন করতে পেরেছি। ফলে কোনো রোগীকে মাঝপথে আমরা হারাইনি। ঢাকার বাইরে যারা ছিলেন তাদের আসা-যাওয়ার ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ ছিল। অনেকে ছিলেন যারা আর্থিক সমস্যায় পড়েছেন, আমরা তাদের সমস্যারও সমাধান করে দিয়েছি। তাদের সঙ্গে এখনো আমাদের যোগাযোগ আছে। তারা এখনো যেকোনো ধরনের শারীরিক সমস্যা যদি অনুভব করেন, আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অনেকেই সামান্য সর্দি-জ্বর বা একটু পেটে ব্যথা হলেও প্রথমেই মনে করেন, তার হেপাটাইটিস বি সংক্রান্ত কোনো সমস্যা হলো কিনা। এক্ষেত্রে তাদের প্রথম চয়েজ থাকে আমাদের প্রধান গবেষককে দেখানো। যদিও এটা সংখ্যায় খুব বেশি নয়, তাও ফোন আসে। 

[১৯] ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর : আমি আগেই বলেছি, লিভারের প্রদাহ বন্ধ করার জন্য একটা কার্যকর ওষুধ দরকার, যেটা একটা নির্দিষ্ট সময় ব্যবহার করলে ভাইরাসও কমতে পারে এবং প্রদাহও বন্ধ হতে পারে। ‘ন্যাসভ্যাক’ হচ্ছে এমন একটা ওষুধ যেটা মাত্র ছয় মাসে ১০ বার দেওয়া হয়। ‘ন্যাসভ্যাক’ নাক দিয়ে দেওয়া যায় এবং ইনজেকশন দিয়েও দেওয়া সম্ভব। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বে ইনজেকশন দেওয়ার সমস্যা অনেক বেশি। ফলে নাক দিয়ে প্রয়োগের ক্ষেত্রে একজন রোগী খুব সহজেই নিজে তা নিতে পারবেন। ন্যাসভ্যাক একটা নির্দিষ্ট মেয়াদী ওষুধ, যা ছয় মাস নিতে হবে এবং বর্তমান ওষুধের যে সমস্যাগুলো আছে, ‘ন্যাসভ্যাক’ ব্যবহার করলে তা আর থাকবে না। ‘ন্যাসভ্যাক’ এমন একটা ওষুধ, যা বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকেরা মিলে তৈরি করেছেন।

[২০] যেকোনো ওষুধ তৈরি করার পর জীবজন্তুর ওপর আগে প্রয়োগ করা হয়, যদি দেখা যায় ভালো কিছু হতে পারে এবং বড় রকমের কোনো প্রতিক্রিয়া হবে না তখন এটাকে মানুষের ওপর তিনটি স্তরে প্রয়োগ করা হয়; এটাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ফেজ-১, ফেজ-২ ও ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বলে। যদিও ‘ন্যাসভ্যাক’ ডেভেলপ করেছে কিউবা এবং জাপান মিলে। কিন্তু বাংলাদেশে সর্বপ্রথম হেপাটাইটিস আক্রান্ত রোগীদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে ন্যাসভ্যাক প্রয়োগ করা হয়েছে। ন্যাসভ্যাকের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ২০০৯ সালে শুরু হয়ে ২০১৪ সালে শেষ হয়েছে। আমরা এর ফলোআপ করেছি দীর্ঘ সময় ধরে এর প্রতিক্রিয়া কেমন হয় তা দেখার জন্য। ফলোআপ সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর আমরা আমাদের ওষুধ প্রশাসনের কাছে এর অনুমোদনের জন্য আবেদন করি। ২০১৭ সালে ওষুধ প্রশাসন ন্যাসভ্যাকের রেসিপি অনুমোদন করে।

[২১] ন্যাসভ্যাক এখন কিউবা থেকে আনতে হবে। প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ২০১৯ সালের দিকে যখন আমরা এগিয়ে যাই তখনই কোভিড চলে আসে। ফলে সবকিছু দুই বছরের জন্য পিছিয়ে যায়। ‘ন্যাসভ্যাক’ তৈরির জন্য কিউবা ও জাপানে অসংখ্য লোক কাজ করেছেন, বাংলাদেশেও বহু লোক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সহায়তার জন্য কাজ করেছেন। বিশ্বের পাঁচটি দেশ ন্যাসভ্যাক বাজারে এনেছে। বাংলাদেশে কোভিডের জন্য এটা এখনো আনা সম্ভব হয়নি। তবে আমরা এই প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু করে দিয়েছি। 

[২২] অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল : এক বা একাধিক কোম্পানি ন্যাসভ্যাক বাজারে আনতে পারে। তবে একটি ওষুধ কোম্পানি তাদের ব্যয় বেনিফিট বিবেচনা করেই তা বাজারে আনবে। তবে আমাদের দেশে যখন কোনো ওষুধ তৈরি হয়, তার দাম বহু দেশের তুলনায় অনেক কম থাকে, সেই ব্যাপারটা আশা করি এখানেও প্রযোজ্য হবে। তবে ন্যাসভ্যাকের আকাশছোঁয়া দাম হবেÑ এমন আশঙ্কার কোনো কারণ নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসায় যে খরচ হয়Ñ যেমন নিয়মিত ওষুধ খাওয়া, বারবার পরীক্ষার খরচ ও নানা ভোগান্তি হয় তার তুলনায় ন্যাসভ্যাকের ছয়মাস মেয়াদী চিকিৎসায় খরচ অনেক কম হবে। সবকিছু বিবেচনা করে বলা যায়, ‘নাসভ্যাক’ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই থাকবে। অনেক কম পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়েই এই ওষুধটি প্রয়োগ করা যাবে। আমরা আশা করছি জুন ২০২৪ থেকে ওষুধটি আমরা রোগীকে খেতে পরামর্শ দিতে পারবো। দেশের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর কোনো একটি ওষুধ কোম্পানিকে ন্যাসভ্যাক উৎপাদনে অনুমতি প্রদান করে। ড্রাগ কন্ট্রোল কমিটি কোভিডের আগেই ন্যাসভ্যাকের রেসিপি অনুমোদন করেছিলো ও ওষুধ তৈরি করার অনুমোদন দিয়েছিলো বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডকে। এখন ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির কাছে বিকন ফার্মা নাসভ্যাকের স্যাম্পল জমা দেবে, এরপর তা কমার্শিয়াল ম্যানুফ্যাকচারে যাবে। তখন ওষুধের মূল্য নির্ধারণসহ আরও যা যা প্রক্রিয়া আছে, তা ওষুধ প্রশাসন সম্পন্ন করে দেবে।

[২৩] সাধারণত নতুন কোনো ওষুধ ব্যবহারের জন্য বাজারে আনতে হলে আমরা বিশ্বের কোনো একটি উন্নত দেশের অনুমোদনের প্রত্যাশায় থাকি যেমন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়ার মত দেশ। নাসভ্যাককে আমাদের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর সরাসরি অনুমোদন দিয়েছে। এটি বাংলাদেশ থেকে যৌথভাবে উদ্ভাবিত একটি ওষুধ, যা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর অনুমোদন দিয়েছে দেশের আইন-কানুন মেনে। ইদানীংকালে ভারত তাদের উদ্ভাবিত একটি ওষুধের অনুমোদন দিতে সক্ষম হয়েছে, যা ফ্যাটি লিভারের জন্য ব্যবহার করা হয়। ভারত ও চীন পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী ওষুধ উৎপাদনকারী দেশ অথচ তারাও কিন্তু তাদের নিজস্ব উদ্ভাবিত খুব কম ওষুধেরই নিজেদের দেশে অনুমোদন নিতে পেরেছে। জাপানে কোভিডের আগে ন্যাসভ্যাকের একটি বড় ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়েছিলো প্রায় ৪টি বিশ^বিদ্যালয়ের সমন্বয়ে। কোভিডের কারণে প্রক্রিয়াটি থেমে গিয়েছিলো। তবে জাপানে আবারও এটি শুরু হয়েছে। জাপানের নাগরিকদের ওপর ফেজ-১ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ‘ন্যাসভ্যাক’ দিয়ে আমাদের দেশের মতো ভালো ফলাফল পাওয়া গেছে এবং সে সমস্ত ডাটা আমেরিকায় গতবছর আমেরিকান লিভার মিটিংয়ে প্রেজেন্ট করা হয়েছে এবং এ বছরও প্রেজেন্ট করা হবে। আমেরিকান লিভার এসোসিয়েশন ‘ন্যাসভ্যাক’কে লিভার চিকিৎসায় কার্যকর ওষুধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। জাপানে নাগরিকদের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালিত হচ্ছে, বাংলাদেশের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রাপ্ত ফলাফলের উপর ভিত্তি করে। এখন মোট ৭টি বিশ^বিদ্যালয় মিলে ব্যাপকভাবে জাপানি সরকারের অর্থায়নে একটি বড় ট্রায়াল শুরু করতে যাচ্ছে। এই ট্রায়ালে যদি আমাদের মতো বা জাপানে  ফেজ-১ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যেমন ফলাফল হয়েছে তেমন ফলাফল হয়, তাহলে আমরা আশা করছি দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে ‘ন্যাসভ্যাক’ জাপানেও অনুমোদন পেয়ে যাবে। ‘ন্যাসভ্যাক’ যদি জাপানে অনুমোদন পায়, তাহলে তা আমেরিকাসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ন্যাসভ্যাকের অনুমোদন পাওয়া যাবে।

[২৪] ড. জুলিও : কিউবা, জাপান ও বাংলাদেশের কোলাবোরশনে ন্যাসভ্যাক এখন বাস্তবতা। আমি ধন্যবাদ দিই জাপানি গবেষকদের। তাদের নিরসল পরিশ্রম সার্থক হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে ডা. আকবর ন্যাসভ্যাক নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছেন। কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ২০ বছরে ধরে লেগে ছিলেন। যে কারণে একটি সফল সার্থক গবেষণার ফলাফল তৈরি হয়েছে। অধ্যাপক স্বপ্নীল একজন উদ্যমী ও শক্তিমান গবেষক। তিনি ন্যাসভ্যাক নিয়ে প্রচুর কাজ করেছেন। এই কাজ করতে গিয়ে তাকে কখনো ক্লান্তি বোধ করতে দেখিনি। ফলে সফলভাবে ফেইজ-১, ফেইজ-২ ও ফেইজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে। কিউবা থেকেও তারা স্বীকৃতি পেয়েছেন। ন্যাসভ্যাক বাংলাদেশের সাধারণ রোগীদের নাগালে চলে আসবে অচিরেই। এক্ষেত্রে কিউবান সরকার আন্তরিক। আরও কিছু আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার বাকি। শেষ হলে সব দুয়ার খুলে যাবে। বিশ^ বি-ভাইরাসের চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটা মাইলফলক অর্জন করতে যাচ্ছে, যা একজন গবেষক হিসেবে খুব আনন্দের। 

[২৫] ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর : জাপানে যদি ন্যাসভ্যাকের অনুমোদন পেয়ে যায়, তাহলে পৃথিবীর কমপক্ষে একশটির মতো দেশে এটা অনুমোদন পেয়ে যাবে। জাপান, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানের মতো আরও কয়েকটি দেশসহ মোট সাতটি দেশ থেকে অনুমোদন পেলে সেই ওষুধ সারা পৃথিবীতে গ্রহণযোগ্য হয়। আমরা বাংলাদেশে এখনও তেমন গবেষণাগার বা গবেষণা লেভেল তৈরি করতে পারিনি। এসব ব্যাপারে এখন আমাদের আরও বেশি করে সময় দিতে হবে, অর্থ দিতে হবে। আমাদের একটি বড় সুবিধা হলো আমাদের এখানে রোগী আছে, কিন্তু আমরা এগুলো ঠিকমতো ব্যবহার করে গবেষণা করতে পারছি না। 

[২৬] অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল : ন্যাসভ্যাকের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বাংলাদেশে হয়েছে। মানুষ এর ফলাফল দেখেছে। ফলে কোভিডকালীন সময়ে আমরা দেখেছি মানুষ কোভিড ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল নিয়ে ভয় পায়নি। একটা জিনিসের দীর্ঘ ও বিভিন্নমুখী প্রভাব থাকে। ‘ন্যাসভ্যাক’-এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করার ফলে আমাদের মধ্যে একটা সাহস সঞ্চয় হয়ছে যে, আমরাও পারি। এরপর আমরা বাংলাদেশে অনেক কিছু শুরু করেছি বিএসএমএমইউ লিভার বিভাগের পক্ষ থেকে। যেমন আমরা বাংলাদেশে স্টেমসেল থেরাপি শুরু করেছি এবং ছয়-সাতটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রবন্ধ বের করেছি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আমরা স্টেমসেল নিয়ে কথা বলছি। তার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার স্টেমসেলের গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে, সেখানে লিভার বিশেষজ্ঞরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

[২৭] ইন্টার একাডেমি পার্টনারশিপ সারা পৃথিবীর বিজ্ঞান একাডেমিগুলোর যে সংগঠন তারা সারা পৃথিবী থেকে আমিসহ বারোজন স্টেমসেল বিজ্ঞানীদের নিয়ে একটি ডিক্লারেশন তৈরি করেছেন স্টেমসেল গবেষণার জন্য। এগুলো আমাদের ন্যাসভ্যাকেরই প্রভাব। আমরা বাংলাদেশে লিভারের চিকিৎসায় রেডিওফ্রিকোয়েন্সি এবলেশনের মতো আধুনিক চিকিৎসা শুরু করেছি সেই ভরসায়। ইদাীনং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আয়ুর্বেদিক ওষুধের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। কোভিডকালীন সময়ে রাজশাহীর একদল গবেষক একটি স্থানীয় ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহার করে কোভিডের চিকিৎসা করা সম্ভব হতে পারে তা দেখিয়েছেন। এখন আমরা আয়ুর্বেদ বিদ্যাকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠা করা ও এসব ওষুধ লিভার রোগে কার্যকর কিনা তা নিয়ে গবেষণা করছি।

[২৮] ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবরের কাছে আমি অত্যন্ত ঋণী। কৃতজ্ঞ। আমাকে স্বীকার করতেই হবে- বিজ্ঞান বিষয়ে আমি যা কিছু শিখেছি তার অনেক কিছুই ডা. আকবরের কাছ থেকে। এতে আমার প্রাপ্তিও কম নয়। আমি কিউবান একাডেমি অব সায়েন্স থেকে ২০১৯ সালে তাদের সর্বোচ্চ পদকটি পেয়েছি। তার চেয়েও বড় কথা, যে পদকটি আমি পেয়েছি ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবরের সঙ্গে যৌথভাবে। বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস আমাকে ‘বাস-গোল্ড মেডেল এওয়ার্ড’-২০২২ দিয়েছে। আমার ব্যক্তি জীবনের প্রাপ্তি, আমার রোগীদের প্রাপ্তি, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্তি সবকিছুর পেছনে ন্যাসভ্যাকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

শ্রুতিলিখন : জান্নাতুল ফেরদৌস। ছবি : ফয়জুল বারী লেমন। সম্পাদনা : রাশিদ রিয়াজ

ভিএআর/জেএফ/আর/এইচএ

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়