শিরোনাম
◈ জি এম কাদেরের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনে বাধা নেই : হাইকোর্ট ◈ ১০ টাকায় টিকিট কেটে চক্ষু পরীক্ষা করালেন প্রধানমন্ত্রী ◈ বন্দি জঙ্গিরা যেন রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা চালাতে না পারে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা থেকে দুর্নীতি নির্মূল করাই আমাদের লক্ষ্য: হাইকোর্ট ◈ মুজিব কোট পরলেই মুজিব সৈনিক হওয়া যায় না: কাদের ◈ ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টা মামলায় সাক্ষ্য দিলেন পরীমণি ◈ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগকারিদের জন্য বিশেষ সুযোগ  ◈ রংপুর সিটি নির্বাচনে মোস্তাফাকে লাঙ্গলের মেয়র প্রার্থী ঘোষণা রওশনের ◈ পুলিশে ছেয়ে গেছে চীনের রাজপথ ◈ টাঙ্গাইলে বাসচাপায় দুই ব্যাংক কর্মকর্তা নিহত

প্রকাশিত : ২৩ অক্টোবর, ২০২২, ১১:৪৪ দুপুর
আপডেট : ২৩ অক্টোবর, ২০২২, ০১:১৩ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

দেশে সম্ভাব্য মন্দা ও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবেলায় ড. আতিউর রহমানের ৬ সুপারিশ

ভূঁইয়া আশিক রহমান : করোনা মহামারি বিশ্বকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে টালমাটাল করে দিয়েছে। ২০২৩ সাল অর্থনৈতিক মন্দার বছর হবে। বিশ্বের দেশে দেশে দুর্ভিক্ষের শঙ্কাও করা হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিও কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। এমতবস্থায় বাংলাদেশে খাদ্যসংকট বা দুর্ভিক্ষের যে শঙ্কার কথা আলোচিত হচ্ছে, তা কতোটা বাস্তবসম্মত? আদৌ কি কোনো আশঙ্কা আছে মন্দা বা দুর্ভিক্ষের, বাংলাদেশে?

ড. আতিউর রহমান, সাবেক গভর্নর (বাংলাদেশ ব্যাংক): বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্ভিক্ষের শঙ্কা থাকলেও বাংলাদেশের সেই পরিস্থিতি নেই। আমরা যদি কৃষিকে গুরুত্ব দিই, সামাজিক সুরক্ষায় নজর দিই, যা আমরা এখন দিচ্ছি। আমার ধারণা, বাংলাদেশ অনেক ভালো থাকবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে দুর্ভিক্ষের শঙ্কা থাকলেও আমাদের ক্ষেত্রে তা হবে না। তার মানে এই নয় যে, আমাদের অর্থনীতির উপর চাপ পড়বে না।

আমাদের অর্থনীতির উপর চাপ পড়বে। তবে সম্ভাব্য মন্দা ও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবেলায় যেসব পদক্ষেপ খুব গুরুত্বপূর্ণ, এর মধ্যে...

০১. খাদ্যের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি,

০২. মানুষের আয়-রোজগার বৃদ্ধির জন্য বাড়তি উদ্যোগ গ্রহণ,

০৩. নিম্ন বা স্বল্প আয়ের মানুষকে বিনামূল্যে অথবা কমমূল্যে খাদ্য সরবরাহ করা,

০৪. কৃষি বা কৃষকদের ভালো বীজ দেওয়া, সার নিশ্চিত করা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সারারাত বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা,

০৫. ম্যাক্রো ইকোনোমির স্ট্যাবিলিটি নিশ্চিত করতে হবে।

০৬. এর বাইরেও নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ বা কর্মসূচি খুব দ্রুত বাস্তবায়ন করার বিষয়ে চিন্তা করা দরকার খুব বেশি। 

উন্নত দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি ক্রমাগত বাড়ছে। প্রবৃদ্ধি কমছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও কি একই পরিস্থিতি তৈরি হতে যাচ্ছে, কী মনে হয় আপনার?

ড. আতিউর রহমান : বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার হাওয়া বইছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বড় বড় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। আইএমএফ বিশ্ব অর্থনীতির যে প্রক্ষেপণ করেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিনিয়তই বিশ্বের দেশে দেশে প্রবৃদ্ধি কমছে। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি অনেক দ্রুত কমছে। এমনকি বিকাশমান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিও কমছে। ২০২৩ সালে বিশ্বের সব দেশেরই প্রবৃদ্ধি কমবে বলে তাদের আশঙ্কা। 

একদিকে প্রবৃদ্ধি কমছে, অপরদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি এখনো আট শতাংশের উপরে আছে। যুক্তরাজ্যের মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে চলে গেছে। তারা মনে করছেন, ১৩ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেতে পারে। জার্মানিতেও মূল্যস্ফীতি আরও বেশি। এই মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাবে তাদের দেশের প্রত্যেকটি কেন্দ্রিয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে। তারা রেট অব ইন্টারেস্ট বাড়িয়েই চলেছেন।

একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অনন্যা উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মুদ্রার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মুদ্রা অবমূল্যায়ন করছে। মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটা মানে জিনিসপত্রের দাম আরও বেড়ে যাওয়া। বিশেষ করে আমদানি করা জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি বেড়ে গেছে। এর মধ্যে খাদ্য অন্যতম। 

কেবল ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধই কি বিশ্বমন্দার চোখ রাঙানি? এর বাইরে আর কোনো কারণ কি আছে?

ড. আতিউর রহমান: ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বে দুটি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। একটি হচ্ছে, খাদ্য মূল্য বেড়ে গেছে অনেক গুণ। জ্বালানি মূল্যও বেড়ে গেছে। রাশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের যে সম্পর্ক ছিলো, সেটার অবনতি ঘটেছে। রাশিয়া থেকে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ করা হতো, সেটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যে কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি মূল্যের দাম কমানো যাচ্ছে না। যার কারণে খাদ্যপণ্যের দামও বেড়ে যাচ্ছে। 

দেশের সরকারপ্রধান বারবার সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। সঞ্চয়ের আহ্বান জানাচ্ছেন, জনসাধারণকে। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কি খুব খারাপের ইংগিত দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, নাকি আসন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আগাম সতর্কতা অবলম্বন মাত্র?

ড. আতিউর রহমান : কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সার। আমাদের এখানে সার বেলারুশসহ ওই অঞ্চল থেকেই আসে। সার পেতে অসুবিধা হচ্ছে। সারের দামও বেড়ে গেছে জ্বালানি সংকটের কারণে। আমরা সার সেভাবে উৎপাদন করতে পারছি না। আমদানি করতে হচ্ছে। সারের আমদানি মূল্য অনেক বেড়ে গেছে।

অপরদিকে, টাকার মূল্যও কমে গেছে ডলারের মূল্যের চেয়ে। সে কারণে আমাদের পারচেজিং পাওয়ার কমে গেছে। এর কারণে একধরনের চাপ পড়েছে অর্থনীতিতে। বিশেষ করে যারা নিম্নআয়ের, বাজার থেকে খাদ্য কিনতে হয় যাদের তাদের বেশ কষ্ট হচ্ছে। সে কারণেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার সতর্কবার্তা দিচ্ছেন যে বিশ্বে খাদ্য পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে আগামী বছর। এমনকি কি বিশ্বের কোনো কোনো দেশে দুর্ভিক্ষের শঙ্কাও আছে।

প্রধানমন্ত্রী কিন্তু বলেননি বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ হতে পারে। তিনি সারা বিশ্বের কথা বলেছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ পড়বে। সেই চাপের জন্য তৈরি থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। আমি মনে করি, এটা সময়োচিত সতর্কবার্তা। আতঙ্কিত না হয়ে সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলায় প্রস্তুতি নেওয়ার দরকার আছে। 

কৃষি আমাদের খাদ্য নিশ্চিত করে। কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তার অভাবে সংকটে আছেন কৃষক। কৃষিতে জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে তো বিপাকে পড়বেন কৃষকেরা। সরকার নিশ্চয়ই কৃষির উপর নজর রাখছে। কৃষি ও কৃষকদের সহায়তায় সর্বাত্মক উদ্যোগ দরকার। কৃষি সহায়তায় চলমান সহায়তার বাইরে আর কি কোনো উদ্যোগ সরকার নিতে পারে, যা কৃষির জন্য দারুণ কিছু হবে। উৎপাদন বাড়বে। আশার জায়গা আছে কোথাও? আমাদের কৃষি এখন কেমন করছে। অর্থনীতিতে কি ভারসাম্য আছে বলে মনে করেন আপনি?

ড. আতিউর রহমান : বাংলাদেশ অনেক দেশের চেয়েও ভালো করবে। কারণ এই সংকটকালেও অর্থনীতি ভালো করছে। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হচ্ছে। আমন ফসল ভালো হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আমন ফসল যদি ভালো হয়, বৃষ্টির কারণে জমিতে ময়েশ্চার থেকে যাবে। এর ইতিবাচক প্রভাব আমাদের শীতকালীন ফসল, এমনকি বোরোর উপর পড়বে। আমরা যদি বোরো উৎপাদন ঠিকমতো করতে পারি, বিশেষ করে সারারাত বিদ্যুৎ দেওয়ার যে চিন্তা সরকার করছে আমাদের কৃষি বা কৃষকদের জন্য, তা অব্যাহত রাখতে হবে। অতি দ্রুত যদি সোলার ইরিগেশন প্যানেল চালু করা যায়, সোলার ইরিগেশনের জন্য আমরা টাকা খরচ করি, দুই দিক থেকে লাভ হবে। জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলা করা যাবে। কৃষকদেরও দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে। যখন সেচ কার্যক্রম থাকবে না, তখন এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডেও দেওয়া যাবে।  
কেন কৃষিতে অধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত?

ড. আতিউর রহমান : কৃষির উপর আমাদের জোর দেওয়া উচিত। কারণ কৃষিই আমাদের সংকট থেকে বাঁচাবে। আমাদের রক্ষাকবচ কৃষি। আমরা লক্ষ্য করেছি, গ্রাম পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা, বিশেষ করে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন। নতুন নতুন জাতের ফসল ফলাচ্ছেন। আমাদের প্রায় ৩-৪ বিলিয়ন ডলারের ভোজ্যতেল আমদানি করতে হয়। সেজন্য শষ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য তারা নতুন জাত মানুষের কাছে নিয়ে যাচ্ছেন, যেটার উৎপাদন অনেক বেশি। এরকমভাবে যদি আমরা সকলে মিলে কাজ করি, তাহলে এই সংকট আমরা মোকাবেলা করতে পারবো। 

দেশের প্রান্তিকজনগোষ্ঠী তো বেশ অসুবিধায় আছে। খাদ্য কিনতেই তাদের জান যায় প্রায়! সরকার কোটি মানুষকে খাদ্যসহায়তার আওতায় আনছে। খাদ্যসহায়তার সুবিধাভোগী কি হতে পারবে মানুষ? অতীত অভিজ্ঞতা তো খুব একটা সুখকর নয়। নানান অনিয়ম সরকারি সদিচ্ছা বিফলে যায়। 

ড. আতিউর রহমান : খাদ্যঘাটতি বা খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে কম আয়ের মানুষের খাবার কেনা কষ্টকর হচ্ছে। সেজন্য এককোটি মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার, সেটা আরও বাড়ানো উচিত। বিশেষ করে ৫০ লাখ গার্মেন্টসকর্মীকে যদি এই কর্মসূচির আওতায় আনা যায়, প্রতিটি গার্মেন্টস মালিকদের যদি বলতে পারি, আপনারাও এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করুন। মাসে দুইবার দুই প্যাকেট খাবার যদি সঙ্গে নিয়ে বাড়ি যেতে পারেন গার্মেন্টসকর্মীরা, তাহলে খাদ্য সংকট অনেকটা মোকাবেলা করা যাবে। বেশি দামে তাদের খাদ্য কিনতে হবে না। এ ধরনের নানা রকম উদ্যোগ নিলে সংকট মোকাবেলা সম্ভব। 

ডলারের বাজারও তো অস্থিতিশীল। ডলার ও টাকার এক্সচেঞ্জ রেটে ভারসাম্য আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা কি যথার্থ বলে মনে করেন আপনি? কেন এক্সচেঞ্জ রেট স্থিতিশীল হওয়ার দরকার, আপনার অভিমত বা পরামর্শ কী?

ড. আতিউর রহমান : ম্যাক্রো ইকোনোমির স্ট্যাবিলিটি নিশ্চিত করতে হবে। সেটা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের যে মুদ্রার এক্সচেঞ্জ রেট আছে, ডলার এবং টাকার একচেঞ্জ রেট এটা স্থিতিশীল করতে হবে। যদিও সরকার নানাভাবে চেষ্টা করছে এক্সচেঞ্জ রেট স্থিতিশীল করার জন্য। আমদানি ও রপ্তানির মধ্যকার ঘাটতি ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। একটা এক্সচেঞ্জ রেট থাকা ভালো। এতো এক্সচেঞ্জ রেট কনফিউশন আছে। ডলার বাজারকে অস্থিতিশীল রাখছে। এসব নিয়ে নিশ্চয়ই কেন্দ্রিয় ব্যাংক ও সরকার একসঙ্গে কাজ করছে। কাজ করলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বেই। এই সংকটকালে সমালোচনা না করে, সবাই মিলে কীভাবে সংকট থেকে উত্তরণ করতে পারি, সে ব্যাপারে কাজ করতে পারি। বিশেষ করে কৃষি অর্থনীতির গ্রোথ আরও অনেক বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে করে খাদ্যসংকট হলে তা মোকাবেলা করা এবং দরিদ্র মানুষের সংখ্যা যেন কমাতে পারি।

এআর/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়