শিরোনাম
◈ আসামে বুলডোজার অভিযান : মসজিদসহ গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো শত শত মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি ◈ দালাল ছাড়াই বিনা খরচে প্রশিক্ষণ নিয়ে ইতালি যাওয়ার সুযোগ ◈ ক্রিকেট থে‌কে অ‌স্ট্রেলিয়ান গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের বিদায় ◈ দ্বিতীয় পদ্মা, যমুনা সেতু ও পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ◈ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ ◈ শত্রুর বস্তুগত ও অবস্তুগত সব সম্পদ ইরা‌নের নিশানায়: মেজর জেনারেল আব্দুল্লাহি  ◈ ঢাকার চালে ২৭% ও চিড়ায় ৫৫% ক্যান্সার সৃষ্টিকারী আফলাটক্সিন, গবেষণায় মিলল উদ্বেগজনক তথ্য ◈ আগামী চার দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধের খবর গুজব, কমতে পারে সরবরাহ: পেট্রোবাংলা ◈ মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশ সদস্যকে একা পেয়ে বেধড়ক পেটাল কয়েকজন, গ্রেপ্তার ৫ ◈ পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন: মিরপুর-গাজীপুরে সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক, খুলেছে মেট্রো স্টেশন

প্রকাশিত : ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:২০ বিকাল
আপডেট : ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:২৭ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

আসামে বুলডোজার অভিযান : মসজিদসহ গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো শত শত মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি

ভারতের বিজেপিশাসিত আসাম রাজ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে চলমান বৃহত্তর বিতর্কেরই অংশ। বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম, খ্রিষ্টান, দলিতসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ ও স্বাধীন মতপ্রকাশকারীরাও বিভিন্ন সময়ে বৈষম্য, হয়রানি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।

বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সমালোচকদের দাবি, হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক আদর্শের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ভারতের সমাজে ধর্মীয় মেরুকরণ বাড়াচ্ছে। এর ফলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি জোরালো হচ্ছে।

বিশেষ করে মুসলিমবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্য, মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর চাপ এবং সমান নাগরিক অধিকার নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ রয়েছে।

সমালোচকদের মতে, কোনো সরকারি নীতি যখন মানুষের বাসস্থান, জীবিকা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক অধিকারকে সরাসরি প্রভাবিত করে, তখন তা নিরপেক্ষতা ও মানবাধিকারের মানদণ্ডে যাচাই করা জরুরি। আসামের সর্বশেষ উচ্ছেদ অভিযানও সেই প্রশ্নগুলোকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

Advertisement

গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো মসজিদ ও ধর্মীয় স্থাপনা

আসামে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে শত শত বাঙালি মুসলিম পরিবারের বসতবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একই অভিযানে মসজিদ, ধর্মীয় উপাসনালয় ও কবরস্থানসহ বিভিন্ন স্থাপনাও ভেঙে ফেলা হয়েছে। এতে কয়েক হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মুসলিম পরিবারগুলোর মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

গত ১ নভেম্বর আসামের ধুবড়ি জেলার গৌরীপুর রাজস্ব চক্রের অধীন আলমগঞ্জ পার্ট-৯ এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করে রাজ্যটির বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রায় ৬৫০ বিঘা জমি দখলমুক্ত করার নামে চালানো এ অভিযানে অর্ধশতাধিক এক্সকাভেটর ও বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।

অভিযানের সময় নিজেদের ঘরবাড়ি ও পরিচিত পরিবেশ ধ্বংস হতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বুলডোজার মসজিদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় নারীরা কান্নাকাটি করছেন এবং প্রার্থনা করছেন। ধর্মীয় স্থাপনা ও কবরস্থানের কাছেও শোকাহত অবস্থায় জড়ো হন অনেকে।

উচ্ছেদে ক্ষতিগ্রস্ত ৬৫০টির বেশি পরিবার, গৃহহীন হাজারো মুসলিম

উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। ধুবড়ি জেলা প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, ৬৫০ বিঘা জমি থেকে প্রায় ৫৫০টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ৬৪০ থেকে ৭৫০ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। ৬৪০টির বেশি বাঙালি মুসলিম পরিবারের বসতবাড়ি ভেঙে পড়ায় চার হাজারেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

প্রশাসনের দাবি, উচ্ছেদ করা জমি সরকারি এবং প্রয়োজনীয় নোটিশ ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে ওই জমিতে বসবাস করার কথা জানিয়েছেন। উচ্ছেদের আগে তাদের সঙ্গে আচরণ এবং পুনর্বাসনের বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

অভিযানে শুধু বসতবাড়িই নয়, মসজিদ, ধর্মীয় উপাসনালয় ও কবরস্থানসহ বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ধর্মীয় স্থাপনার সামনে কান্না ও প্রার্থনা

আলমগঞ্জে উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একের পর এক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় নারী-পুরুষকে কান্নাকাটি, প্রার্থনা ও সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য চাইতে দেখা যায়।

বিভিন্ন ভিডিওতে মসজিদে প্রার্থনারত মানুষ এবং একটি মাজারের কাছে কান্নায় ভেঙে পড়া বাসিন্দাদের দৃশ্য উঠে এসেছে।

এ ঘটনায় বড় ধরনের মানবিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারগুলোর মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানোর পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক পরিসরও ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে বিষয়টি কেবল জমি বা বসতবাড়ি হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নিরাপত্তা, মর্যাদা, ধর্মীয় পরিচয় এবং নতুন করে জীবন শুরু করার অনিশ্চয়তা।

বিজেপি সরকারের উচ্ছেদনীতি নিয়ে বাড়ছে সমালোচনা

আসামে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসতি উচ্ছেদ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা হয়েছে। সর্বশেষ অভিযান সেই বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামে হাজার হাজার বাঙালি ভাষাভাষী মুসলিম পরিবারকে বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে সরকারি জমি দখল কিংবা অবৈধ অভিবাসী হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তবে উচ্ছেদ হওয়া অনেক বাসিন্দার দাবি, তারা ভারতের নাগরিক।

২০২১ সালে বিজেপি আসামে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন উচ্ছেদ অভিযানে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই বাঙালি মুসলিম।

সমালোচকদের অভিযোগ, প্রধানত মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় বারবার বুলডোজার অভিযান এবং বাঙালি মুসলিমদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে ওই জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

তাদের প্রশ্ন, উচ্ছেদের ক্ষেত্রে আইনগত সুরক্ষা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না।

ভোটাধিকার নিয়েও উদ্বেগ

বসতবাড়ি হারানোর পাশাপাশি আসামের উচ্ছেদ হওয়া মুসলিম পরিবারগুলোর ভোটাধিকার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

২০২৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত স্ক্রলের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, বাড়িঘর ভেঙে দেওয়ার পর বাস্তুচ্যুত বাঙালি মুসলিমদের একটি বড় অংশ ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম ধরে রাখা কিংবা পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েছেন।

প্রতিবেদনটিতে ধুবড়ি ও উরিয়ামঘাট এলাকায় সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৫ হাজার ৭০০ ভোটারের তথ্য তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ধুবড়ির চারটি ভোটকেন্দ্র থেকে প্রায় ৭৫৬ জন এবং উরিয়ামঘাটের পাঁচটি ভোটকেন্দ্র থেকে আরও ৪ হাজার ৯৪৫ জনের নাম বাদ পড়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, উচ্ছেদের কারণে তাদের স্থায়ী ঠিকানা ও বসবাসের প্রমাণসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়েছে। ফলে ভোটার নিবন্ধন বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এদিকে, ২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনসংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচও বিভিন্ন অনিয়ম, যথাযথ প্রক্রিয়ার অভাব এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি মুসলিম ভোটারদের নাম বাদ দিতে একযোগে আপত্তি জানানোর ঘটনাও তুলে ধরেছে।

এসব ঘটনায় নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার এবং আইনের চোখে সমান অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সমালোচকদের মতে, বাড়িঘর হারানোর কারণে কোনো নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকারও ক্ষুণ্ন হওয়া উচিত নয়।

সূত্র: এনডিটিভি, রয়টার্স, স্ক্রল ও ইন্ডিয়া টুডে

  • সর্বশেষ