শিরোনাম
◈ ল্যাবে তৈরি ভয়ংকর মাদক ‘কুশের’ ভয়ংকর বিস্তার, আসক্ত হচ্ছে শিক্ষিত তরুণরা ◈ সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী, পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারের নির্দেশ ◈ দেশভাগের ৭৯ বছর পর ব্রহ্মপুত্র দিয়ে বাংলাদেশে পণ্য পাঠাল ভারত ◈ জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হতে যাচ্ছে ভারত: আইএমএফ ◈ ডেঙ্গুতে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড, হাসপাতালে ভর্তি ১,৯৪৩ ◈ মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী বিনা খরচে নিয়োগ, অনুমোদন পাচ্ছে ৩৩৮ এজেন ◈ সংরক্ষিত নারী আসনের উপনির্বাচন: শুক্রবার থেকে মনোনয়ন ফরম বিতরণ করবে বিএনপি ◈ কৃষিকে লাভজনক খাতে পরিণত করতে হবে, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের আহ্বান রাষ্ট্রপতির ◈ গাজীপুরে স্বামীকে পাশের ঘরে আটকে গার্মেন্টসকর্মীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ◈ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর যে জরুরি নির্দেশনা

প্রকাশিত : ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:৩৬ বিকাল
আপডেট : ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:০৭ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

আকাশ প্রতিরক্ষায় ফাটল, ইয়েমেনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে কেন ব্যর্থ সৌদি আরব?

আন্তর্জা‌তিক ডেস্ক : ইয়েমেনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেন ব্যর্থ হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে দেশটি। রয়টার্সের বরাত দিয়ে পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক দুই কর্মকর্তা সোমবার, ১২ অক্টোবর জানান, ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর ছোড়া একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। এসব হামলার মধ্যে রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলাও ছিল। এতে অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন।

কর্মকর্তাদের মতে, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, ইয়েমেনের সেনাবাহিনী প্রথমে বেশ কয়েকটি ড্রোন ছোড়ে। এর উদ্দেশ্য ছিল রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত হামলার পথ তৈরি করা।

ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতাকে কেবল প্রযুক্তিগত ত্রুটি কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। এই ঘটনা সৌদি আরবের নিরাপত্তা কাঠামোর গভীর দুর্বলতা এবং ইয়েমেন যুদ্ধে শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

এ পরিস্থিতিতে রিয়াদ তদন্ত শুরু করেছে, যাতে বোঝা যায় কেন হামলার আগে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজনীয় সতর্কসংকেত দিতে পারেনি এবং কীভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। এসব প্রশ্ন সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর সংশয় তৈরি করেছে।

Advertisement

সমন্বিত হামলার কৌশল

এই ব্যর্থতার প্রথম কারণ খুঁজতে হবে ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর সমন্বিত ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলার কৌশলের মধ্যে। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, ইয়েমেনি বাহিনী প্রথমে কয়েকটি ড্রোন ছোড়ে, যাতে রিয়াদ বিমানবন্দর অভিমুখে ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত হামলার সুযোগ তৈরি হয়।

এ ধরনের কৌশলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একই সময়ে বিভিন্ন উচ্চতা, গতি ও গতিপথের একাধিক লক্ষ্যবস্তুর মোকাবিলা করতে হয়। নিচু দিয়ে ধীরগতিতে চলা ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মনোযোগ ও ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র আকর্ষণ করতে পারে। এ সুযোগে অন্য দিক থেকে ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করে প্রবেশ করতে পারে।

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের শেষ পর্যায়ে প্রতিহত করার জন্য তৈরি প্যাট্রিয়টের মতো ব্যবস্থাগুলো এ ধরনের সমন্বিত হামলা এবং বিশেষ করে নিচু দিয়ে উড়ে আসা লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা

দ্বিতীয় কারণ হলো ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। ইয়েমেনি ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নত ওয়ারহেড উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের সক্ষমতা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার হিসাবকে অত্যন্ত জটিল করে তোলে। কারণ, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে মুহূর্তের মধ্যে লক্ষ্যবস্তুর নতুন গতিপথ অনুমান করতে হয় এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার উপযুক্ত স্থান পুনর্নির্ধারণ করতে হয়। রাডার ও কমান্ড নেটওয়ার্ক সময়মতো এই পরিবর্তন শনাক্ত করতে না পারলে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তু থেকে বিচ্যুত হতে পারে।

এ ছাড়া, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব অতিক্রম করার ঘটনা থেকে বোঝা যায়, ইয়েমেনের সেনাবাহিনী তাদের অস্ত্রের পাল্লা ও নির্ভুলতা বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে সৌদি আরবের কৌশলগত গভীরতাও হুমকির মুখে পড়েছে।

আগাম সতর্কসংকেত ও গোয়েন্দা সমন্বয়ের দুর্বলতা

তৃতীয় কারণ হলো আগাম সতর্কসংকেত এবং গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে দুর্বলতা। হামলার আগে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেন প্রয়োজনীয় সতর্কসংকেত দিতে পারেনি, তা জানতে চায় রিয়াদ।

সময়মতো সতর্কসংকেত না পাওয়ার পেছনে রাডার নজরদারির ঘাটতি, নিচু দিয়ে উড়ে আসা লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার জটিলতা, ইলেকট্রনিক বিঘ্ন কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের দীর্ঘসূত্রতা কাজ করতে পারে।

অসম যুদ্ধের পরিস্থিতিতে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের মধ্যে কয়েক মিনিটের বিলম্বও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করার সুযোগ দিতে পারে।

এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহায়তার ওপর সৌদি আরবের নির্ভরতা এই দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে, ওয়াশিংটন যখন ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলা চালানো থেকে বিরত রয়েছে, তখন এ নির্ভরতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

সামরিক ব্যর্থতার অর্থনৈতিক প্রভাব

এই ব্যর্থতার প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যায় এবং সৌদি রাজধানীর আর্থিক এলাকার কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এর অর্থ, ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর হামলা সৌদি আরবের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রতীকী কেন্দ্রকে চাপের মুখে ফেলতে সক্ষম হয়েছে।

মক্কা ও মদিনা ছাড়া সৌদি আরবের অন্য বিমানবন্দরগুলোতে হামলার হুমকি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর আস্থা কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও বিমা ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। এতে রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরও সরাসরি সামরিক সহায়তা চাইতে বাধ্য হতে পারে।

বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে সম্ভাব্য ঝুঁকি 

এই পরিস্থিতির কৌশলগত পরিণতি আরও বিস্তৃত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে ইয়েমেনের সেনাবাহিনী বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে ইয়েমেনের উপকূলের কাছে অবস্থিত এই প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য এবং জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পারস্য উপসাগর থেকে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রেও এই জলপথের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।

বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল বিঘ্নের পাশাপাশি বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা সেখানে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে গেলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম আরও বাড়তে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২০২৬ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এ পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। যুদ্ধের বিস্তার ঘটলে মূল্যস্ফীতি এবং পেট্রল ও ডিজেলের দাম নিয়ে অসন্তুষ্ট ভোটারদের ক্ষোভ বাড়তে পারে। এতে রিপাবলিকান পার্টি নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

উপসংহার

প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইয়েমেনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সৌদি আরবের ব্যর্থতা দেশটির ইয়েমেন নীতির ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত ব্যবহার সৌদি আরবের ভূখণ্ডের গভীরে যুদ্ধের চাপ নিয়ে যাচ্ছে এবং দেশটির আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

বারবার ব্যর্থতার মুখে সৌদি আরবকে বর্তমান প্রতিরক্ষা কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন, আগাম সতর্কসংকেত ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ড্রোন মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হতে পারে।

তবে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোকাবিলায় সৌদি আরব নতুন কোনো পদক্ষেপ নিলে ইয়েমেনের সেনাবাহিনীও নতুন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, কৌশল ও অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে তার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

  • সর্বশেষ