শিরোনাম

প্রকাশিত : ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:৪৭ রাত
আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:৪৯ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নেতানিয়াহু কেন আমিরাতে ‘গোপন’ সফর করলেন?

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সংক্ষিপ্ত সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবু ধাবি গেছেন। সফরটি গোপনে সম্পন্ন হয় এবং গণমাধ্যমের নজর এড়িয়ে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি ছাড়াই তিনি দেশে ফিরে যান।

সফর শেষ হওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে এই গোপন বৈঠকের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। 

যদিও এটি কোনো পূর্বঘোষিত কর্মসূচি ছিল না, তবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানায়, এই বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করা এবং আঞ্চলিক অভিন্ন নানা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।

এই বার্তা এমন এক সময়ে এলো, যখন নেতানিয়াহুর কার্যালয় অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং হারেৎজ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের দাবি প্রত্যাখ্যান করে। 

advertisement

ওই প্রতিবেদনে সফরটির আরেকটি উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছিল। সেটি ছিল এমন একটি বর্ণনার বিরুদ্ধে আমিরাতের পক্ষ থেকে অস্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা, যেখানে বলা হয় যে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার প্রায় দেড় সপ্তাহ আগে বিন জায়েদ হামাসের আসন্ন হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন নেতানিয়াহুকে।

ফলে আলোচনা সরে গিয়ে সফরের কারণ এবং এর সময়ের গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন সামনে আসছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা সম্পর্কিত সাম্প্রতিক তথ্যফাঁস, নেতানিয়াহু ও বিন জায়েদের সম্পর্কের শীতলতা এবং তা মেরামতের প্রচেষ্টা, ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন, এবং আঞ্চলিক হিসাব-নিকাশের কেন্দ্রে ইরানের পুনরুত্থানের প্রেক্ষাপটে এই সফরটি অনুষ্ঠিত হলো।

কেন আমিরাতের প্রেসিডেন্ট ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক?

সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ড. জ্যাক নেরিয়ার মতে, বৈঠকের পটভূমি না বুঝলে এই সফরের তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।

নেরিয়া বলেন, তার বিশ্বাস নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য ছিল শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করা, যা কথিত একটি ফোনকলকে ঘিরে বিরোধের পর টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে।

নেরিয়ার মতে, নেতানিয়াহুর প্রকাশ্য অস্বীকৃতি দুই পক্ষের সম্পর্ককে একটি সংকটজনক পর্যায়ে নিয়ে যায়। বিশেষ করে আমিরাতি সূত্রগুলোর এই দাবির প্রেক্ষাপটে যে সংযুক্ত আরব আমিরাত হামাসের সম্ভাব্য একটি অভিযানের বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছিল।

অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ড. জ্যাক নেরিয়ার মতে, এই বৈঠক দুই নেতাকে সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে সরাসরি আলোচনা করার সুযোগ দিয়েছে, যাতে ভুল বোঝাবুঝি এবং সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব কমানো যায়।

বৈঠকের পর হারেৎজ যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাও এই বিশ্লেষণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সংবাদপত্রটির মতে, বৈঠকে নেতানিয়াহু শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদকে অনুরোধ করেছিলেন, ৭ অক্টোবরের আগে ইসরায়েলি নেতৃত্বকে সতর্ক করা হয়েছিল বলে যে বর্ণনা প্রচারিত হয়েছে, তা খণ্ডন করতে। অন্যান্য কয়েকটি গণমাধ্যমেও একই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

গোপন বৈঠকের খবর ফাঁস হলো কেন?

এখানেই গল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। সফরটি গণমাধ্যমের নজরের বাইরে আয়োজন করা হয়েছিল এবং ইসরায়েলি প্রতিবেদনের মতে, প্রতিনিধি দল ইসরায়েলে ফেরার পর এটি ঘোষণা করার পরিকল্পনা ছিল। একই সঙ্গে দুই পক্ষের একটি যৌথ ও সমন্বিত বিবৃতি দেওয়ার কথাও ছিল।

তবে নেতানিয়াহুর ফেরার আগেই সফরের খবর প্রকাশ্যে আসে।

বিশ্লেষক নেরিয়ার মতে, এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে– এই সফরের খবর প্রকাশ পাওয়া রাজনৈতিকভাবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর স্বার্থে ছিল কি না।

তিনি বলেন, নেতানিয়াহু বা তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের অজ্ঞাতে এ ধরনের সংবেদনশীল সফরের তথ্য ফাঁস হওয়া সম্ভব বলে তিনি মনে করেন না।

নেরিয়ার দৃষ্টিতে, সফরটি প্রকাশ্যে আসায় নেতানিয়াহু এই ধারণা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন যে সাম্প্রতিক মতপার্থক্য ও বিরোধ সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে তার সম্পর্ক অটুট রয়েছে এবং দুই পক্ষের যোগাযোগ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বন্ধ হয়ে যায়নি।

তবে এটি নেরিয়ার বিশ্লেষণ এবং নেতানিয়াহু নিজে সফরের তথ্য ফাঁস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। তা সত্ত্বেও, খবর প্রকাশের রাজনৈতিক সময়টি উল্লেখযোগ্য।

ইসরায়েলের নির্বাচন নির্ধারিত হয়েছে ২৭শে অক্টোবর এবং নেতানিয়াহু এমন এক সময়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন, যখন ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের হামলা-সংক্রান্ত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দায়বদ্ধতা নিয়ে দেশে অবিরাম বিতর্ক চলছে।

নেরিয়ার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আরব নেতা শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক বজায় রাখা একজন প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার জন্য উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক সুবিধাও এনে দিতে পারে।

ইরান প্রসঙ্গ

তবে ৭ অক্টোবরের বিষয়টিই নেতানিয়াহু আবু ধাবিতে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া একমাত্র প্রসঙ্গ ছিল না।

ইসরায়েলি সূত্রগুলো চ্যানেল ১৩ নিউজকে জানিয়েছে, বৈঠকে প্রধানত ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বিবিসির সঙ্গে আলাপচারিতায় নেরিয়াও এই বিষয়টির ইঙ্গিত দেন।

তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সামনের দিনগুলোয় ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য নতুন উত্তেজনা নিয়ে জল্পনা বাড়তে থাকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় ইসরায়েলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নেরিয়ার মতে, সৌদি আরব, কাতার এবং ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলো বিভিন্ন মাত্রায় তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে এবং অঞ্চলে নতুন সংঘাত এড়াতে চেষ্টা করছে। ফলে ইরানকে ঘিরে পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক ইসরায়েলের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

তবে ইরানের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক শুধু ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আবু ধাবি নিজেও তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সংলাপ বজায় রাখে, ইরানের সঙ্গে তার সরাসরি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থ রয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা হ্রাসের নীতি অনুসরণ করেছে।

সুতরাং ইরানকে ঘিরে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের যোগাযোগ ও পরামর্শের অর্থ এই নয় যে, ইরান মোকাবিলায় দুই দেশের অবস্থান বা কৌশল একই।

প্রকাশ্য বিবৃতি নিয়ে মতপার্থক্য

নেতানিয়াহু এবং শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের বৈঠক নিয়ে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বক্তব্যে অমিল দেখা দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়।

এর আগে এ বছর নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছিল যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে তিনি আল আইন শহরে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে একটি গোপন বৈঠক করেছিলেন।

তবে সে সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রকাশ্যে ইসরায়েলের সেই দাবি অস্বীকার করে।

আমিরাতি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছিলেন, আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের পর ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক একটি ঘোষিত ও স্বচ্ছ কাঠামোর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তা কোনো গোপন ব্যবস্থা বা পর্দার আড়ালের যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল নয়।

এই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক সফর এমন এক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ সংক্রান্ত খবর প্রকাশ, তা কীভাবে ঘোষণা করা হবে এবং এ ধরনের বৈঠকের খবর কে ও কীভাবে প্রকাশ করবে, তা একটি সংবেদনশীল বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

সফরের উদ্দেশ্য

আবু ধাবির বৈঠকে বন্ধ দরজার আড়ালে কী আলোচনা হয়েছে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া কঠিন। তবে এ পর্যন্ত যে তথ্য সামনে এসেছে, তা তিনটি সমান্তরাল দিকের ইঙ্গিত দেয়–

প্রথম দিক : ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্ক

এই দিকটি বেনিয়মিন নেতানিয়াহু এবং শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে, বিশেষ করে ৭ই অক্টোবরের আগে কথিত সতর্কতামূলক ফোনকল সংক্রান্ত প্রতিবেদনের জেরে যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল তা নিয়ে।

কিছু ইসরায়েলি ও আমিরাতি সূত্রের মতে, বিষয়টি দুই নেতার সম্পর্ককে একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং এই বৈঠককে সেই উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

দ্বিতীয় দিক : ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি

বিষয়টি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গেও সম্পর্কিত।

ইসরায়েলের নির্বাচন প্রায় এক মাস দূরে থাকায় নেতানিয়াহুর জন্য ভোটারদের কাছে এই ধারণা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ যে যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকট সত্ত্বেও তার আঞ্চলিক সম্পর্কগুলো শক্তিশালী ও কার্যকর রয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নেতানিয়াহুকে এই বার্তা দেওয়ার সুযোগ দেয় যে ইসরায়েল অঞ্চলটিতে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন নয় এবং আরব দেশগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক অটুট রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে আবু ধাবি সফরটি কেবল একটি কূটনৈতিক বৈঠক নয়, এর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে, কারণ এটি নেতানিয়াহুর আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা এবং পররাষ্ট্রনীতিতে তার অর্জনগুলো তুলে ধরার একটি উপায় হিসেবে কাজ করতে পারে।

তৃতীয় দিক : কৌশলগত গুরুত্ব

ইরান, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংঘাতের সম্ভাবনা এবং নতুন কোনো উত্তেজনা দেখা দিলে উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূমিকা ও অবস্থান।

সম্ভবত এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি এই প্রশ্নে নিহিত, যার স্পষ্ট উত্তর এখনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে পাওয়া যায়নি– বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কি অতীতের ফাটল মেরামত করতে আবু ধাবি গিয়েছিলেন, নাকি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির জন্য সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে? সম্ভবত এই প্রশ্নের উত্তর দুটি দিকেই হতে পারে। সূত্র- বিবিসি বাংলা 

 

  • সর্বশেষ