নেপালের তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন এলাকার রাসুয়া জেলায় সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় এখন পর্যন্ত ৫৭০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন। বরফ ও পাথরের ধস নেমে বুধবারের এ বন্যার পর এখন পর্যন্ত নিখোঁজ আছেন পর্যটকসহ হাজারের বেশি মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একাধিক সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, হিমালয় রেঞ্জের পর্বত থেকে হিমবাহ ভেঙে লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দিয়েছিল। পরে কাদা, পাথর ও পানি প্রচণ্ড বেগে নদী অববাহিকা ছাড়িয়ে যেতে থাকে। গালছি এলাকায় ৩০ মিনিটে নদীর পানির উচ্চতা ৯ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
ভোতেকোশি থেকে নারায়ণী নদী পর্যন্ত ১০ ঘণ্টায় ধ্বংসাত্মক রূপ নেয় বন্যা। পানির গতি এত দ্রুত ও উঁচু ছিল যে নদীর স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলো সংকেত পাঠানোর আগেই ধ্বংস হয়ে যায়।
অনেক এলাকার মানুষ নিরাপদ স্থানে সরার কোনো সুযোগই পাননি। অন্যদিকে মালেখু ও দেবঘাটের মতো ভাটির এলাকার বাসিন্দারা সতর্কবার্তা পৌঁছানোর পর নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য সময় পেলেও পাহাড়ি ঢল, কাদা ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের কারণে বাস্তবে তাদের পক্ষেও দ্রুত সরে যাওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন।
এ অঞ্চলের সমন্বিত পর্বত ব্যবস্থাপনা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) বলছে, হিমমণ্ডলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে স্পষ্ট। লেন্দে খোলার এ বন্যা আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এলো, যেখানে এ ধরনের আন্তঃসীমান্ত বিপর্যয় মোকাবিলায় সরকারগুলোর যৌথ ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সেন্টারের পরিচালক বসন্ত রাজ অধিকারীর মতে, হিমালয় অঞ্চলে বহুমাত্রিক দুর্যোগের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। ভাটি অঞ্চলের ঝুঁকির মাত্রা ও প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে। স্থানীয় নীতি-নির্ধারকদের কাছে বাস্তব সময়ের ঝুঁকির তথ্য পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি।
ভূ-তত্ত্ববিদরা বলছেন, হিমালয় রেঞ্জের হিমবাহ গলে প্রাকৃতিক হ্রদের পাশ থেকে ভেঙে বা পানি উপচে বিশাল জলরাশি প্রবল গতিতে নিচের দিকে নেমে আসার কারণেই এই আকস্মিক বন্যা। একে বলা হয় গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা গ্লফ।
হিমালয় থেকে উৎপন্ন নেপালের নদী ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও হাইড্রোলজিক্যাল সংযোগ রয়েছে।
নেপালের এই পাহাড়ি ঢল ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী হয়ে নেমে ভারত সীমান্তের কাছে নারায়ণী–গণ্ডক নদী ব্যবস্থায় পড়বে। এরপর গণ্ডক নদী ভারতের বিহারে ঢুকে গঙ্গায় মিশবে।
অর্থাৎ, এই পানি সরাসরি বাংলাদেশে না এলেও গঙ্গার প্রবাহের মাধ্যমে ফারাক্কা বাঁধ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে।
তবে ভূ-তত্ত্ববিদদের মতে, এই আকস্মিক ঢল পাহাড়ি এলাকায় প্রচণ্ড বিধ্বংসী হলেও, সমতল ভূমিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে পানি আশপাশে ছড়িয়ে এর তীব্রতা অনেকটাই কমে আসে।
বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্যেও আগামী ১০ দিনে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় পানি সমতল বিপদসীমা অতিক্রমের সম্ভাবনা দেখা যায়নি।
কিন্তু, হিমবাহ গলে প্রাকৃতিক হ্রদ ভেঙে গ্লফের মতো আকস্মিক বন্যা, বিশেষ করে ত্রিশূলী-নারায়ণী–গণ্ডক নদীর পানিবৃদ্ধির প্রভাব গঙ্গা-পদ্মা প্রবাহে পড়ার সম্ভাবনা রয়েই যায়।
২০২৩ সালের অক্টোবরে ভারতের সিকিমের উত্তরের দক্ষিণ লোনাক হ্রদে বিস্ফোরিত হয়ে এমন একটি গ্লফের কথা স্মরণ করিয়ে দেন বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মুশফিকুস সালেহীন।
ওই বন্যার পানি সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পং, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং জেলা হয়ে তিস্তা নদী দিয়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে নীলফামারী ও কুড়িগ্রামে প্রবেশ করে অববাহিকার বহু গ্রাম ও চর এলাকা প্লাবিত করে।
নেপালের এই বন্যায় বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন এই গবেষক। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নিয়মিত নদীর পানির স্তরের তথ্য রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
আইসিআইএমওডি ও ইউএনডিপির এক যৌথ গবেষণায় হিমালয় রেঞ্জে তিব্বত, নেপাল ও ভারতের অববাহিকায় ৪৭টি হ্রদকে ঝুকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলো যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাতে পারে।
ড. মুশফিকুস সালেহীন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'নেপালের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো নিশ্চয়ই জানতো যে লাংটাং লিরুং পর্বতের কাছে বিশাল এলাকাজুড়ে পানি আটকে আছে। এটা মনিটরিংটা খুব জরুরি ছিল। কাছাকাছি দূরত্বে আরও গ্লেসিয়ার লেক আছে। এগুলো নিয়মিত মনিটরিং করলে হয়তো ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা হলেও এড়ানো যেত।'
'এই পানিটা এখন নিচে নেমে ভারতে ঢুকে গঙ্গায় পড়বে বিহারে এসে। বিহার পর্যন্ত এসে ওই পানি ছড়িয়ে যাওয়ার কথা। এরকম হলে নদীর পানির স্তর স্বাভাবিকের চেয়ে খুব একটা বাড়বে না,' বলেন তিনি।
বাংলাদেশে এ বন্যার ফলে সরাসরি বড় বিপর্যয়ের কোনো সম্ভাবনা না দেখলেও, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে সতর্ক নজরদারি বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ (জিএসবি) অধিদপ্তরের গবেষক মো. আজাহার হোসেন।
তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, বন্যার পানি মূলত নেপালের গণ্ডক অববাহিকা, তারপর ভারতের উত্তর প্রদেশ দিয়ে ঢুকে গঙ্গা অববাহিকার বিভিন্ন অংশ ঘুরে ঘুরে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। নেপালের এই বন্যার উৎপত্তিস্থল থেকে বাংলাদেশ নদীপথের গতিপথ প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার দূরে। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় পানি প্রচুর পরিমাণে পলি নিয়ে আসবে, যার ফলে পানির গতিবেগ অনেক কমে যাবে। ঘূর্ণিঝড় যেভাবে উপকূলে আসার পর দুর্বল হয়ে যায়, একইভাবে এই বন্যার পানিও বাংলাদেশে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শান্ত হয়ে যাবে।'
'সরাসরি বন্যার পানি বড় ক্ষতি না করলেও, আগামী ৫-৭ দিনের মধ্যে দেশের উজানে ভারী বৃষ্টিপাত হলে তা একটি সেকেন্ডারি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে,' বলেন তিনি।
বুয়েট গবেষক ড. সালেহীন বলেন, 'আমরা ভারতের কাছ থেকে বন্যা ও নদীর পানির স্তরের ডেটা পাই। ওই ডেটা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করলে বুঝতে পারব যে তাদের ওখানে কতটুকু পানি এসেছে। আমাদের বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র সেই ডেটা মনিটরিং করে আমাদের সতর্কবার্তা দিতে পারবে। আমাদের নিয়মিত ও নিবিড়ভাবে ভারতের বন্যার সতর্কবার্তা ও উজানে বৃষ্টির তথ্য মনিটর করা দরকার।'
জিএসবির ভূ-তত্ত্ব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মূল্যায়ন বিভাগের সহকারী পরিচালক আজাহারের মতে, সামনের কয়েকদিন আমাদের উচিত ভারতের বিহার ও আসামের বৃষ্টিপাতের খবর রাখা।
তিনি বলেন, 'আমরা কোনো দুর্যোগ পরিস্থিতিতে পড়তে পারি কি না, সেটা জানতে আমাদের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ফারাক্কা ব্যারেজ, তিস্তা ব্যারেজ এবং অন্যান্য ট্রান্স-বাউন্ডারি নদীগুলোর ওয়াটার স্টেশনগুলো নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। বিশেষ করে ভারতের বিহার ও উত্তরপ্রদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের গঙ্গা অববাহিকার বৃষ্টিপাত ও নদীর তথ্য প্রদানকারী স্টেশনগুলোর ওপর নিয়মিত নজর রাখা প্রয়োজন।'
'সর্বোপরি যেহেতু আমরা ভাটিতে আছি, তাই আমাদের বন্যা না হলেও জলাবদ্ধতার একটা সম্ভাবনা রয়ে যায়। এর জন্য আবার আমাদেরই দায় থেকে যায়। নদী-খালের স্বাভাবিক গতিপথ আটকে নগর-শহর তৈরি করার মাধ্যমে আমরা আমাদের বিপদ নিজেরাই ডেকে এনেছি। সেক্ষেত্রে আমি বলব অববাহিকার দেশ হিসেবে আমাদের উচিত নদী কিংবা প্রকৃতিকে ক্ষতি না করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করা। বড় ধরনের প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই পরিবেশবিদ, ভূ-তত্ত্ববিদসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত,' বলেন এই গবেষক।