কলম্বিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২২৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে বহু মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে রাতভর অভিযান চালিয়েছেন উদ্ধারকর্মী, পুলিশ, সেনাসদস্য ও স্বেচ্ছাসেবীরা। কোথাও ভারী যন্ত্র দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়েছে, আবার কোথাও খালি হাতেই চালানো হয়েছে তল্লাশি।
সোমবার (১০ আগস্ট) ভোরে ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে কলম্বিয়া। কয়েক দশকের মধ্যে দেশটিতে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি এটি। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের কফি উৎপাদনকারী এলাকাগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় ভূমিকম্পটি। পেরেইরা ও কালি শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় বহুতল ভবন ধসে পড়ে। মানিজালেস শহরের একটি ক্যাথেড্রালের চূড়ার অংশও ভেঙে পড়ে।
উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে শব্দ ও জীবিত থাকার সম্ভাব্য কিছু সংকেত পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো পরীক্ষা করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে আটকে পড়া মানুষদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।
কলম্বিয়ান রেড ক্রসের কুইন্দিও শাখার অনুসন্ধান ও উদ্ধার বিভাগের প্রধান হোসে ফার্নান্দো উসমা বলেন, এখনো জীবিতদের উদ্ধারের যথেষ্ট আশা রয়েছে। তিনি জানান, আরও প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের জীবিত পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভূমিকম্পে প্রায় ২২ লাখ মানুষের শহর কালিতে অন্তত ৯৫ জন নিহত হয়েছেন। বহু ভবন ধসে পড়েছে, আবার কিছু ভবন এমনভাবে হেলে পড়েছে যে সেগুলো যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। আতঙ্কে শহরের বাসিন্দাদের অনেকেই রাস্তায় অবস্থান করছেন।
শহরের একটি হাসপাতালের ওপরের কয়েকটি তলা ধসে পড়েছে। এর মধ্যে শিশুদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত কিছু অংশও ছিল। হাসপাতালের পরিচালক ইর্নে তোরেস কাস্ত্রো জানান, কয়েকজন রোগী ভবনের ভেতরে আটকা পড়েছেন। এ ঘটনায় প্রায় ৬০০ রোগীকে হাসপাতালের বাইরে ধ্বংসাবশেষে ভরা রাস্তায় চিকিৎসা দিতে হয়েছে।
কালির বাসিন্দা ৪৩ বছর বয়সী কারমেন ইয়াসমিন গার্সিয়া উদ্ধার অভিযানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন। তিনি জানান, ধসে পড়া একটি ভবন থেকে তার দল সাতজনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। তবে আরও চারজন এবং একটি কুকুর তখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিল।
গার্সিয়া বলেন, কিছুক্ষণ আগেও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আঁচড়ানোর শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। এখন আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। তবু তারা আশা ছাড়ছেন না। উদ্ধারকাজে আরও মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, লাঠি, কোদালসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে যত বেশি মানুষ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবেন, উদ্ধারকাজ তত সহজ হবে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রিসারালদা অঞ্চলের রাজধানী পেরেইরায় ৭২ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। প্রতিবেশী ভালে দেল কাওকা অঞ্চলে, যার মধ্যে কালি শহরও রয়েছে, ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। আর ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের সবচেয়ে কাছের গ্রামীণ অঞ্চল চোকোতে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ১৩ জন।
পেরেইরায় ধ্বংসের চিত্র ছিল ভয়াবহ। পুরো আবাসিক এলাকা পরিণত হয়েছে কংক্রিটের স্তূপ ও বেঁকে যাওয়া লোহার কাঠামোয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং রয়টার্সের যাচাই করা ভিডিওতে দেখা যায়, ভূমিকম্পের সময় শহরের বিমানবন্দর ভয়াবহভাবে দুলছিল। এ সময় ছাদের বড় বড় অংশ ধসে পড়লে আতঙ্কে মানুষ আশ্রয়ের জন্য ছোটাছুটি করতে থাকেন।
ভূমিকম্পের পর কালিতে লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে। এ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা ভোরের মধ্যে শহরটিতে এক হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন। ভূমিকম্পের পর কালি ও পেরেইরা— দুই শহরেই রাতে কারফিউ জারি করা হয়।
সোমবার সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের প্রেসিডেন্ট বলেন, মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। দেশের মানুষের সুরক্ষা ও দুর্যোগের সময় একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শিক বিভাজন থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কলম্বিয়ার এবারের ভূমিকম্পের সঙ্গে ১৯৯৯ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের তুলনা করা হচ্ছে। ওই ভূমিকম্পেও দেশটির একই কফি উৎপাদনকারী অঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং প্রাণ হারিয়েছিলেন এক হাজারের বেশি মানুষ।
এদিকে প্রতিবেশী ভেনেজুয়েলায় জুনে আঘাত হানা ভয়াবহ ভূমিকম্পের কথাও স্মরণ করছেন অনেকে। ওই দুর্যোগে ছয় হাজার ৩শ'র বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সূত্র: কাঠমুন্ডু পোস্ট