ট্যাক্সি, ফিটনেস প্রশিক্ষক বা ফ্রিল্যান্স ডিজাইনার বুক করার মতোই এখন ঘণ্টা হিসেবে ‘বয়ফ্রেন্ড’ ভাড়া করার সেবাও ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। একসময় যা কেবল জাপানি নাটকের কল্পকাহিনি বলে মনে হতো, তা এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি ভারতেও বাস্তব ব্যবসায় পরিণত হচ্ছে।
ফেসবুক গ্রুপ, ইনস্টাগ্রাম পেজ, সঙ্গী খোঁজার অ্যাপ এবং অনলাইন প্রোফাইলভিত্তিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এখন ঘণ্টাপ্রতি নির্ধারিত পারিশ্রমিকে ‘মুভি পার্টনার’, ‘শপিং বাডি’ এমনকি ‘মেডিক্যাল সাপোর্ট কম্প্যানিয়ন’ হিসেবেও সেবা দেয়ার বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে।
জাপানের ‘রেন্টাল পারসন’ অর্থনীতি থেকে যাত্রা
‘রেন্ট-এ-বয়ফ্রেন্ড’ ব্যবসার সূচনা একদিনে হয়নি। এর শিকড় রয়েছে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে জাপানের ‘রেন্টাল পারসন’ অর্থনীতিতে। তখন অর্থের বিনিময়ে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, শ্রোতা কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে সঙ্গী হিসেবে মানুষ ভাড়া দেয়ার প্রচলন শুরু হয়।
মূল ধারণাটি ছিল সহজ- বাস্তব জীবনে কোনো সামাজিক পরিস্থিতি অস্বস্তিকর বা জটিল হয়ে উঠলে কয়েক ঘণ্টার জন্য একজন মানুষকে নির্দিষ্ট একটি সামাজিক ভূমিকায় ভাড়া নেয়া।
বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য সঙ্গী দরকার? ভাড়া করুন। সম্পর্ক ভাঙার পর কাউকে নিজের কথা বলতে চান? বুক করুন একজন শ্রোতাকে। পারিবারিক অনুষ্ঠানে একা যেতে না চাইলে তারও ব্যবস্থা ছিল। ২০১০-এর দশকের শুরুতে এসব সেবা ‘রেন্টাল গার্লফ্রেন্ড’ এবং ‘রেন্টাল বয়ফ্রেন্ড’ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে।
কী এই ‘রেন্টাল বয়ফ্রেন্ড’?
নামের কারণে অনেকের ভিন্ন ধারণা হতে পারে। তবে এসব সেবা সাধারণত যৌনসেবা হিসেবে প্রচার করা হয় না। গ্রাহক ও সঙ্গী সাধারণত ক্যাফে, পার্ক, জাদুঘর, রেস্তোরাঁ বা শপিং মলে দেখা করেন। অধিকাংশ সংস্থারই কঠোর নিয়ম রয়েছে- কোনো ধরনের যৌন কার্যকলাপ নয়। হোটেল কক্ষে যাওয়া যাবে না। নির্জন স্থানে দেখা করা যাবে না। রাতযাপন করা যাবে না। সব সময় ভদ্র আচরণ করতে হবে।
এই সেবায় অর্থের বিনিময়ে মূলত পাওয়া যায় সময়, কথোপকথন, মনোযোগ ও সঙ্গ।
কেন জনপ্রিয় হলো?
জাপানের সামাজিক সংস্কৃতিতে ভদ্রতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যের ওপর ব্যক্তিগত সমস্যা চাপিয়ে না দেয়ার প্রবণতা রয়েছে। ফলে অনেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত একটি সম্পর্কের মধ্যে নিজের কথা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে- একা বসবাসকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি, ব্যস্ত কর্মজীবন,শহুরে একাকীত্ব, এবং চাপমুক্ত সামাজিক যোগাযোগের চাহিদা।
ফলে বিষয়টি কৌতূহলের বদলে আধুনিক একাকীত্বের একটি বাস্তব সমাধান হিসেবে দেখা শুরু হয়।
টোকিওতে একজন রেন্টাল বয়ফ্রেন্ড বুক করতে সাধারণত প্রতি ঘণ্টায় ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার ইয়েন (প্রায় ১ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ ভারতীয় রুপি) খরচ হয়। খাবার, ভ্রমণ ও অন্যান্য কার্যক্রম যুক্ত হলে খরচ আরও বেড়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা
দীর্ঘদিন এটি জাপানের একটি সীমিত পরিসরের ব্যবসা ছিল। পরে ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মাধ্যমে বিষয়টি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠে। অনেক ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা “আমি টোকিওতে একজন বয়ফ্রেন্ড ভাড়া করেছি” শিরোনামে ভিডিও প্রকাশ করেন।
একজন ইউটিউবার দেখান, কীভাবে তিনি একটি কনভিনিয়েন্স স্টোরে ভাড়াকৃত সঙ্গীর সঙ্গে দেখা করেন, ঘণ্টাপ্রতি প্রায় ১০০ ডলার (প্রায় ৮ হাজার ৫০০ ভারতীয় রুপি) পরিশোধ করেন, একসঙ্গে ছবি তোলেন, হাত ধরে হাঁটেন, দুপুরের খাবার খান এবং সময় ভালো কাটায় বুকিংয়ের সময়ও বাড়িয়ে দেন।
একটি ভাইরাল ভিডিওতে এক রেন্টাল বয়ফ্রেন্ড জানান, তিনি প্রতি মাসে প্রায় ১০ জন বা তার বেশি গ্রাহকের সঙ্গে দেখা করেন। তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সদ্য বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া নারী এবং বিবাহিত নারীরাও রয়েছেন। এভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই সেবাকে সামাজিক পরিষেবার পরিবর্তে এক ধরনের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করে।
ভারতে যেভাবে ছড়াচ্ছে
ভারতে জাপানের মতো একই মডেল অনুসরণ করা না হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন মার্কেটপ্লেস এবং বিভিন্ন কম্প্যানিয়নশিপ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে।
এনডিটিভি তাদের অনুসন্ধানে দেখেছে, ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে পুরুষরা নিজেদের ‘রেন্টেড বয়ফ্রেন্ড’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বেড়ানো, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বা সময় কাটানোর জন্য বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন।
এছাড়া ‘কো-পার্টনার’ নামের একটি ওয়েবসাইট নিজেদের ‘প্রফেশনাল সোশ্যাল সাপোর্ট সার্ভিস’ হিসেবে পরিচয় দেয়। সেখানে ব্যবহারকারীরা প্রোফাইল তৈরি করে নির্দিষ্ট সেবার জন্য নিয়োগ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন।
ওয়েবসাইটটির নির্ধারিত কিছু সেবার মূল্য
একসঙ্গে সময় কাটানো: ঘণ্টায় ১,৫০০ রুপি, ক্লাবে যাওয়া: ঘণ্টায় ২,০০০ রুপি, সিনেমা সঙ্গী: ঘণ্টায় ২,০০০ রুপি, শপিং সঙ্গী: ঘণ্টায় ২,০০০ রুপি, হাসপাতালে সহায়তা: ঘণ্টায় ২,০০০ রুপি।
যদিও প্ল্যাটফর্মটি ‘ডেট’ বা ‘বয়ফ্রেন্ড’ শব্দ ব্যবহার না করে সামাজিক সহায়তা ও সঙ্গ হিসেবে সেবাগুলো উপস্থাপন করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এগুলোকে ব্যাপকভাবে ‘রেন্ট-এ-বয়ফ্রেন্ড’ বা ‘রেন্ট-এ-গার্লফ্রেন্ড’ সেবা হিসেবেই প্রচার করা হচ্ছে।
আরও প্ল্যাটফর্ম
‘নেল’ নামের আরেকটি প্ল্যাটফর্ম চাকরির ওয়েবসাইটের মতো কাজ করছে। সেখানে অনেক ভারতীয় পুরুষ নিজেদের সামাজিক অনুষ্ঠান, কথোপকথন বা বিভিন্ন আড্ডার সঙ্গী হিসেবে নিবন্ধন করেছেন।
আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট রেন্ট-অ্যা-বয়ফ্রেন্ড’ও একই ধরনের সেবা দিচ্ছে । সেখানে প্রতি ঘণ্টার পারিশ্রমিক সাধারণত ১১ থেকে ১৫ মার্কিন ডলার, এবং ভারত থেকেও বেশ কয়েকটি প্রোফাইল রয়েছে।
ইনস্টাগ্রামেও বাড়ছে প্রচার
ইনস্টাগ্রামে অনেকেই এখন নিজেদের রেন্টাল বয়ফ্রেন্ড হিসেবে প্রচার করছেন। কিছু প্রতিষ্ঠানও এ ধরনের সেবার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে।
‘রেন্ট ইওর ওন বয়ফ্রেন্ড ইন্ডিয়া’ নামের একটি ইনস্টাগ্রাম পেজে ১০ হাজারের বেশি অনুসারী রয়েছে। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ছবি, কফি ডেট, শপিং, গাড়িতে সেলফি এবং আকর্ষণীয় ক্যাপশনের মাধ্যমে সেবা প্রচার করা হয়েছে।
কিছু ব্যবহারকারী আবার টিন্ডার প্রোফাইলেও ‘অ্যাভেইলেবল ফর ইভেন্টস’, ‘ট্রাভেল কম্প্যানিয়ন’ এবং ‘পেইড কোম্পানি অনলি’- এর মতো বাক্য ব্যবহার করে নিজেদের সেবা প্রচার করছেন।
কারা এই সেবা নিচ্ছেন?
এ ধরনের সেবা প্রদানকারীদের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ রেন্টাল বয়ফ্রেন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা তরুণ পেশাজীবী, যারা অতিরিক্ত আয়ের জন্য এই কাজ করেন।
এনডিটিভি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মন্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখেছে, বিশেষ করে শহরের ২০-এর কোঠার নারীদের মধ্যে এই সেবার প্রতি আগ্রহ বেশি। কেউ কনটেন্ট তৈরির জন্য, কেউ কৌতূহলবশত, আবার কেউ সত্যিই একজন সঙ্গী খুঁজতে এই সেবা ব্যবহার করছেন।
অন্যদিকে সেবা প্রদানকারীরা এটিকে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, সপ্তাহে মাত্র কয়েকটি মুভি পার্টনার বুকিং পেলেই উল্লেখযোগ্য আয় করা সম্ভব।
একাকীত্বের নতুন ব্যবসা?
বিশ্লেষকদের মতে, দুই ঘণ্টার জন্য একজন শপিং সঙ্গী বুক করা মানেই প্রেমের সম্পর্ক খোঁজা নয়। অনেকেই এমন শহরে বসবাস করেন, যেখানে বন্ধুদের সময় নেই, পরিবার দূরে থাকে এবং একা খাওয়া এখনও সামাজিকভাবে অস্বস্তিকর বলে মনে করা হয়।
একইভাবে সিনেমা দেখা বা হাসপাতালে যাওয়ার জন্য একজন সঙ্গীও অনেকের কাছে ব্যবহারিক প্রয়োজন।
তবে ‘বয়ফ্রেন্ড’ শব্দটি এই সেবায় বাড়তি একটি আবেগের মাত্রা যোগ করে। ভাড়াকৃত সঙ্গীর কাছ থেকে যত্নশীল, ভদ্র, মনোযোগী ও আবেগগতভাবে উপস্থিত থাকার প্রত্যাশা করা হয়।
বর্তমানে ভারতে এই ব্যবসা এখনও বিচ্ছিন্ন এবং বড় কোনো নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় নয়। বেশিরভাগ সেবাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
তবু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে ঘণ্টাপ্রতি সঙ্গ দেয়ার সেবার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, যা ইঙ্গিত করছে- একসময়ের অদ্ভুত ধারণা এখন ধীরে ধীরে একটি নতুন ‘গিগ ইকোনমি’ বা সেবা-ভিত্তিক ব্যবসায় রূপ নিচ্ছে। অনুবাদ: মানবজমিন