নিজেদের আকাশসীমাকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও অভেদ্য করে তুলতে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে তুরস্ক। আঙ্কারায় চলমান ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি 'স্টিল ডোম' বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণা করেছেন।
তুরস্কের স্থানীয় প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংবাদমাধ্যম 'উলুসাভুন্মা'-এর বরাত দিয়ে জানা গেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে মোট জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে আঙ্কারা। উল্লেখ্য, ন্যাটোর পক্ষ থেকে সদস্য দেশগুলোর জন্য ২০৩৫ সালের মধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণের সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল, যা থেকে পাঁচ বছর আগেই লক্ষ্য অর্জনে বদ্ধপরিকর তুরস্ক। বর্তমানে দেশের নিরাপত্তা খাতের ব্যয় জিডিপির ১.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দ্রুত ৩.৫ শতাংশ এবং পরবর্তীতে ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে বলে জানিয়েছেন এরদোয়ান।
কী এই 'স্টিল ডোম' বা ইস্পাত গম্বুজ?
'স্টিল ডোম' কোনো একক অস্ত্র বা ক্ষেপণাস্ত্র প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি মূলত একটি বহুস্তরবিশিষ্ট, সমন্বিত ও নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক বিমান প্রতিরক্ষা স্থাপত্য। সহজ ভাষায় একে বলা হচ্ছে "সিস্টেম অব সিস্টেমস" বা 'ব্যবস্থার মহাপদ্ধতি'। এর কাজ হলো বিভিন্ন উচ্চতা ও পাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একটি কেন্দ্রীয় কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল কাঠামোর অধীনে এনে দেশের আকাশসীমাকে এক নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা। এর বিভিন্ন স্তরে রয়েছে।
খুব কম দূরত্ব: রাডার-নিয়ন্ত্রিত অটো-ক্যানন সমৃদ্ধ 'কোরকুট' ব্যবস্থা, যা একেবারে কাছ থেকে আসা ড্রোন বা স্বল্প দূরত্বের হুমকি মোকাবেলা করবে।
স্বল্প ও মাঝারি পাল্লা: এই স্তরের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে 'হিসার-এ+' এবং 'হিসার-ও+' ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।
দীর্ঘ পাল্লা ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা: সর্বোচ্চ স্তরের সুরক্ষায় থাকবে তুরস্কের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি আধুনিক 'সিপার' ব্যবস্থা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সর্বাধুনিক রাডার প্রযুক্তির ছোঁয়া
এই গোটা ব্যবস্থাকে সচল ও নিখুঁত রাখবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সমর্থিত একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যবস্থা। রাডার নেটওয়ার্ক ও ইলেকট্রো-অপটিক্যাল সেন্সর থেকে আসা রিয়েল-টাইম ডেটা বিশ্লেষণ করে এই এআই সিস্টেম মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ড্রোন, ক্রুজ মিসাইল, যুদ্ধবিমান বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করবে এবং তা ধ্বংস করতে সবচেয়ে উপযোগী ইন্টারসেপ্টরটি বেছে নেবে।
এতে ব্যবহৃত হচ্ছে সর্বাধুনিক এইসা রাডার প্রযুক্তি, যা যান্ত্রিকভাবে না ঘুরে বৈদ্যুতিক তরঙ্গের মাধ্যমে একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তু ট্র্যাক করতে পারে। এটি আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ 'স্যাচুরেশন অ্যাটাক' (একসঙ্গে ঝাঁক বেঁধে আসা অসংখ্য হামলা) দ্রুত নস্যাৎ করতে সক্ষম।
এরদোয়ান বলেন, "উৎপাদন এবং রপ্তানি সক্ষমতার দিক থেকে আমরা ইতিমধ্যে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় প্রবেশ করেছি। আমাদের জোটের যে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতার অভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছিল, তা পূরণে আমরা স্টিল ডোম প্রকল্পের মাধ্যমে অতিরিক্ত ২৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছি।"
প্রকল্পটির মূল দায়িত্বে রয়েছে তুরস্কের সর্ববৃহৎ প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিক্স প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান 'আসেলসান'। এছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাতা 'রকেটসান', রাষ্ট্রীয় অস্ত্র কারখানা 'এমকেই' এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'টুবিটাক সেজ' যৌথভাবে এতে কাজ করছে। ইতিমধ্যে আসেলসান এই প্রকল্পের জন্য বড় অঙ্কের চুক্তি সই করেছে, যার সরবরাহ ২০২৮ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবে।
ভাষণে এরদোয়ান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, জার্মানি এবং ইতালিকে ধন্যবাদ জানান, যারা অতীতে তুরস্কের মাটিতে প্যাট্রিয়টসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যাটারি মোতায়েন করে নিরাপত্তা নিশ্চিতে সাহায্য করেছিল। তবে এরদোয়ান স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই বিদেশি নির্ভরতা পুরোপুরি দূর করতেই 'স্টিল ডোম' তৈরি করা হচ্ছে।
পাশাপাশি, ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের বাধা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক প্রতিরক্ষা উদ্যোগের সমালোচনা করে তিনি সতর্ক করেন যে, তুরস্কের মতো অ-ইইউ ন্যাটো সদস্যকে বাদ দিলে তা সম্পদের অপচয় ঘটাবে এবং মহাদেশীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করবে। সূত্র: ইনকিলাব