সিএনএন: চীনে ক্রমাগতই কমছে শিশু জন্মহার। এ পরিস্থিতিতে জন্মহার বাড়ানোর চেষ্টায় এবার অভিনব সব ব্যবস্থা নিয়েছে চীন। নতুন বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জানুয়ারি থেকে দেশটিতে কনডমসহ সব ধরনের গর্ভনিরোধক পণ্যের ওপর ১৩ শতাংশ বিক্রয় কর কার্যকর হয়েছে।
বিপরীতে, তরুণ প্রজন্মকে সন্তান গ্রহণে উৎসাহিত করতে শিশু যত্ন (চাইল্ড কেয়ার) ও বিয়ে সংক্রান্ত সেবাকে করমুক্ত ঘোষণা করেছে বেইজিং। গত বছরের শেষের দিকে কর ব্যবস্থায় এই রদবদলের ফলে ১৯৯৪ সাল থেকে চলে আসা বহু করছাড় বাতিল হয়ে গেছে।
যেমন: নব্বইয়ের দশকে যখন চীনে কঠোর ‘এক সন্তান নীতি’ কার্যকর ছিল, তখন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য গর্ভনিরোধক পণ্যগুলোকে করমুক্ত রাখা হয়েছিল। কিন্তু এখন দীর্ঘ ৩২ বছর পর সেই সুবিধা তুলে নিল চীন।
বুড়িয়ে যাওয়া মানুষের বোঝা এবং খুঁড়িয়ে চলা অর্থনীতির মুখে চীন এখন তরুণ চীনাদের বিয়ে করতে উৎসাহ জোগানো এবং দম্পতিদেরকে বেশি সন্তান নিতে উৎসাহিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, টানা তিন বছর ধরে চীনে জন্মহার কমেছে। ২০২৪ সালে দেশটিতে জন্ম নিয়েছে মাত্র ৯৫ লাখ ৪০ হাজার শিশু, যা এক দশক আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।
বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষম মানুষের অভাব চীনের ভবিষ্যতের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতেই চীন এখন একদিকে, কনডম ও জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়িসহ অন্যান্য গর্ভনিরোধকের ওপর করারোপ করে এর ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করছে।
আবার অন্যদিকে, বাবা-মাকে আরও সহায়তা করার জন্য সরকার একই সঙ্গে শিশুর যত্ন প্রদানকারী, বয়স্কদের যত্ন নেওয়ার সুবিধা এবং বিবাহ-সম্পর্কিত পরিষেবাগুলি থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করছে।
তবে সরকারের এসব পদক্ষেপ, বিশেষ করে কনডমে করারোপ নিয়ে চীনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উইবো-তে ব্যাপক বিদ্রুপ চলছে। অনেক ব্যবহারকারী বলছেন, কনডমের দাম বাড়িয়ে জন্মহার বাড়ানো অসম্ভব।
একজন ব্যবহারকারী মজা করে লিখেছেন, ‘একটি কনডমের দাম আর একটি সন্তান লালন-পালনের খরচের মধ্যে পার্থক্য মানুষ ভালো বোঝে।’
হেনান প্রদেশের বাসিন্দা ৩৬ বছর বয়সি ড্যানিয়েল লুও বলেন, ‘আমার একটি সন্তান আছে, আর আমি আর নিতে চাই না। বছরে কনডমের জন্য বাড়তি কয়েক শ ইউয়ান খরচ হওয়াটা কোনও সমস্যা নয়, কিন্তু সন্তান মানুষ করার খরচ আকাশচুম্বী।’
জনসংখ্যাবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই পদক্ষেপের নেতিবাচক দিক নিয়ে সতর্ক করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ই ফুশিয়ান বলেন, ‘কনডমে কর বাড়িয়ে জন্মহার বাড়বে, এমন ভাবনাই অবাস্তব।’
বরং অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, গর্ভনিরোধক পণ্যের দাম বাড়লে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ এবং এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বেইজিংয়ের ‘ইউওয়া পপুলেশন রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ এর ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে সন্তান পালনের দিক থেকে চীন বিশ্বে সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশগুলোর অন্যতম।
প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা, চড়া জীবনযাত্রার ব্যয় এবং নারীদের একইসঙ্গে চাকরি ও সন্তান লালন-পালন সামাল দেওয়ার মতো চ্যালেঞ্জই তরুণ বয়সীদের সন্তান নেওয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে, যা কেবল কর সংস্কার দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয় বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।