দেশের প্রায় ৪০/৫০ ভাগ কৃষি ও খাদ্যপণ্য উৎপন্ন হয় হিমালয়ের পাদদেশ রংপুর বিভাগে। এই বিভাগের উৎপাদিত শাক-সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং বিদেশেও রপ্তানি করা হয়। সৈয়দপুর বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক কার্গো বিমান পরিচালনা করা হলে এখানকার উৎপাদিত পণ্য ভারতের সেভেন সিস্টারস, নেপাল, মালদ্বীপ, ব্রুনাই, কোরিয়া, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া, ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, আমেরিকা, কানাডাসহ অনেক দেশে রপ্তানি করা সহজ হতো। সেই সঙ্গে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে যোগ হতো কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। এই অঞ্চলের সবজি ও ফল রপ্তানিকারকদের দীর্ঘদিনের দাবি সৈয়দপুর থেকে কার্গো বিমান চালু করা হোক। কিন্তু সেই দাবি যুগ যুগ ধরে উপেক্ষিত হচ্ছে।
জানা গেছে, রংপুর বিভাগে শীত আসে দুই মাস আগে এবং যায় দুই মাস পরে। এ বিভাগের মাটি অধিক উর্বর। যার পরিপ্রেক্ষিতে এখানে বছরে ৪টি ফসল উৎপন্ন হয়। শীতকালীন সবজি আলু, পটোল, টম্যাটো, করলা কমদামে পাওয়া যায়। যানবাহন সুবিধাসহ অনেক কারণে এখানকার উৎপাদিত শাক-সবজি এবং ফলের প্রায় ৩০/৪০ ভাগ নষ্ট হয়। অনেক সময় রপ্তানির জন্য ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছতেও প্রায় ৪০/৫০ ভাগ নষ্ট হয়ে যায়।
এখানকার উৎপাদিত জাতীয় ফল কাঁঠাল অনেক সময় পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে। এ ছাড়া মৌসুমের শুরুতে ২০ টাকায় এক কেজি আম পাওয়া যায়। দিনাজপুরের লিচু এবং কলার সুখ্যাতি পৃথিবীব্যাপী। তরমুজসহ সব ফলই সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে রপ্তানি করা যায় সহজেই।
রপ্তানিকারকরা জানায়, সৈয়দপুর বিমানবন্দরে দেশিবিদেশি কার্গো বিমান পরিচালনা করা হলে রংপুর বিভাগ তথা উত্তরবঙ্গের সবজি এবং ফল রপ্তানি করে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনা যেত খুব সহজেই। রপ্তানিকারকরা আরও জানায়, অনেক বিদেশি ক্রেতা ফ্রোজেন, ড্রায়েড, ডিহাইড্রেটেড, পাউডার ফর্মের সবজি ও ফল কিনতে আগ্রহী। কিন্তু পরিবহন সংকটের কারণে অনেক আমদানিকারক আগ্রহ হারাচ্ছেন।
জানা গেছে, পঞ্চগড়ে উৎপাদিত গ্রীষ্মকালীন তরমুজ জাপান, ব্রুনাই, কোরিয়ায় রপ্তানির জন্য চূড়ান্ত হয়েছিল। দাম ঠিক হয়েছিল প্রতি কেজি প্রায় ৫ মার্কিন ডলারে। পরিবহন সংক্রান্ত জটিলতার কারণে রপ্তানি করতে না পেরে কৃষক তার তরমুজগুলো মাত্র ৪০/৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি করে স্থানীয় বাজারে।
পঞ্চগড়ের আমদানি ও রপ্তানিকারক শামস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মু. আবদুস ছালাম জানান, তিনি ১৯৯৮ সাল থেকে বিষমুক্ত নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য পণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি ব্যবসায় জড়িত। সয়াবিন, কাজুবাদাম, সুগারবিট, জাপানি মিষ্টি আলু, তরমুজ, মরুভূমির ফসল শাম্মাম প্রভৃতি ফসল রপ্তানি করে আসছেন। কিন্তু ঢাকার বিমানবন্দর থেকে এসব রপ্তানি করতে খরচ বেশি হচ্ছে। আবার প্রক্রিয়াজাতকরণ সমস্যার কারণে পথে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা বিষয়টি বাণিজ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছি।
রংপুর বিভাগের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ২ লাখ হেক্টর পতিত জমিতে ১৪ লাখ টন কাজুবাদাম উৎপাদন করে ৩ লাখ টন রপ্তানি করে ৩০ হাজার কোটি টাকা আয়ের সুযোগ রয়েছে। চীনাবাদামের হেডকোয়ার্টার হিসেবে পরিচিত রংপুর বিভাগের প্রায় ১৫ লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩০ লাখ টন চীনাবাদাম থেকে ২০ লাখ টন দানা রপ্তানি করে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা অর্জন সম্ভব।
এ ছাড়া বিলুপ্ত প্রায় উপকারী অনেক ফসল বাকহুইট, কাউন, সরগাম, যব, তিসি, গাছআলু, কেশুর, শাপলা-শালুক উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাত করে দেশেবিদেশে বাজারজাত করে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। রংপুরের কারুপণ্য, শতরঞ্জি, চীনামাটির তৈজসপত্র, মৃৎশিল্প, বেত ও বাঁশশিল্প প্রভৃতি পণ্য রপ্তানি করে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। তবে এর জন্য চাই সরকারের সদিচ্ছা। সৈয়দপুর থেকে আন্তর্জাতিক কার্গো বিমান চালু করা হলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি পাল্টে যাবে।
সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক একেএম বাহাউদ্দিন জাকারিয়া বলেন, সৈয়দপুর থেকে কার্গো বিমান চলাচল করছে না। তবে এখানে আন্তর্জাতিক কার্গো বিমান চালু করা গেলে খুব সহজেই এখান থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শাক-সবজি, ফলসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি সহজ হতো। সূত্র: বিডি প্রতিদিন