প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরকালে গত ২৫ জুন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা স্মারকে সই করেছে বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি। প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ-বিষয়ক উপদেষ্টা, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সেন্ট্রাল কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিং সমঝোতা স্মারকে সই করেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান উপস্থিত ছিলেন। এটি ছিল দুই দেশের রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রথম সমঝোতা স্মারক।
দুই দলের রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, তরুণ নেতাকর্মীদের অভিজ্ঞতা বিনিময়, শাসনব্যবস্থা, উন্নয়ন বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়ে এই চুক্তিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে উভয় পক্ষ। অবশ্য এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনও তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সেই সমঝোতার পর প্রথমবারের মতো গত ৩ নভেম্বর ঢাকায় সফরে আসেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের সদস্য ও মন্ত্রী লিউ হাইশিং।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল।
ঢাকায় সফরকালে লিউ হাইশিং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এছাড়া সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকসহ বেশ কিছু কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। ক্ষমতাসীন দল ছাড়াও প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন অংশীজনদের সঙ্গেও বৈঠক করেন তারা।
মূলত,বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বৈঠকে নেওয়া বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্পায়ন ও জ্বালানি সহযোগিতার জন্য সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন এবং দুই দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতেই তার এ সফর বলে জানিয়েছে বিএ্নপির দলীয় সূত্র।
তবে চীনের ক্ষমতাসীন দলটির সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল বিএনপির সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হবে বা এর অগ্রগতি কোন পথে? এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আছে। এর আগে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে বিদেশি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের রেওয়াজ দীর্ঘ দিনের। কিন্তু দুই দেশের রাজনৈতিক দলের মাঝে সরাসরি এ ধরনের সমঝোতা সই এই প্রথম বলে জানা গেছে। তাই চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকা সফর নিয়ে রাজনীতিতে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ সামনে আসছে।
সরকার পক্ষ মনে করছে, দেশের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বিবেচনায় এ সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এই সমঝোতার আলোকে প্রথমবারের মতো দেশটির মন্ত্রী লিউ হাইশিং বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। এর মাধ্যমে পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার হবে।
অবশ্য বিরোধী দলও মনে করে, বিষয়টি ইতিবাচক। কারণ তারা নিজেরাও একাধিকবার চীন সরকারের আমন্ত্রণে সে দেশে সফরে গেছেন। তবে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে কী কী আছে, তা সরকার বা বিএনপি প্রকাশ করেনি। তাই এর মাধ্যমে আসলেই বাংলাদেশ কতটুকু লাভবান হবে, তাও পরিষ্কার করতে হবে। অন্যথায়, এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
খোলাসা না করায় ধোঁয়াশা
চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও দেশটির সরকারের সঙ্গে বিএনপির সমঝোতা স্মারক সই নিয়ে আপত্তি জানায়নি বিরোধী দল। তবে এর বিষয় বস্তু সংসদে আলোচনা করা উচিত ছিল বলে মনে করে তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ও দলটির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘চীন আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। দ্বি-পাক্ষিক নানা ইস্যুতে তাদের সঙ্গে আমাদের রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের। তবে বিএনপি বা সরকার তাদের সঙ্গে কী ধরনের সমঝোতা করেছে— তা দেশের মানুষকে জানায়নি। অথচ এতে দেশের স্বার্থবিরোধী বিষয়ও থাকতে পারে। তাই বিষয়টি নিয়ে জেনেশুনে মন্তব্য করা ভালো।’’
একই ধরনের প্রশ্ন তোলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি এবং দলটির প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘চীনের সঙ্গে আমাদের দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। একটি দেশের সঙ্গে আরেকটি দেশের যেকোনও সমঝোতা হতেই পারে। কিন্তু জনগণকে তা জানাতেই হবে। বিশেষ করে জুলাই সনদ অনুযায়ী যেকোনও দেশের সঙ্গে চুক্তি বা সমঝোতা সই করার আগে অবশ্যই সংসদকে জানাতে হবে। কিন্তু সরকার তা অনুসরণ করেনি, এমনকি অংশীজনদেরকেও কিছুই জানায়নি। তাই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। বিশেষ করে সর্বশেষ জাপানে কী নিয়ে চুক্তি হয়েছে, সেটিও সরকারের পক্ষ থেকে পুরোপুরি জানানো হয়নি। সংসদেও কোনও ধরনের আলোচনার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি সরকার।’’
তাই চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে বিএনপির চুক্তি কতটুকু কার্যকর হবে তা বলা কঠিন, বলেন এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
কীভাবে লাভবান হবে বাংলাদেশ?
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হলেও বিষয়টিকে নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। যদিও কী বিষয়ে সমঝেতা হয়েছে, এবং ঢাকায় সফররত চীনা কমিউনিস্ট পার্টি নেতার সঙ্গে কী আলোচনা হলো— তা বলতে নারাজ দলটির নেতারা।
তারা মনে করেন, এর মাধ্যমে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু বিষয় আরও শক্তিশালী হবে। বিষয় বস্তু দুই দেশের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই ধীরে ধীরে খোলাসা হবে বলে মনে করেন তারা।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এমপি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সমঝোতাটি হয়েছে মূলত দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে। কারণ চীন দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের সহযোগী দেশ। বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে তারা বাংলাদেশকে সহযোগিতা করে আসছে। আমার মনে হয়, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যে ধরনের উন্নয়ন প্রত্যাশা করছে— এই সমঝোতার মাধ্যমে তা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। এটি কার্যকর ও ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি।’’
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে চুক্তি হয়েছে, নাকি সরকারের সঙ্গে হয়েছে—বিষয়টি এভাবে বলা ঠিক হবে না।অতীতে ভারতের সঙ্গে গঙ্গা চুক্তির সময় ফারাক্কা নিয়ে যে চুক্তি হয়েছিল, সেটি দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে হয়েছিল, নাকি সরকারের সঙ্গে হয়েছিল, সেটি আগে বুঝতে হবে।
চীনের আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিংয়ের সফরের মধ্য দুই সঙ্গে চুক্তির অগ্রগতি কতটু ফলপ্রসূ হয়েছে, এমনটি জানতে চাইলে সেলিমা রহমান বলেন, এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট শাখা নিশ্চয়ই ব্যাখা দেবে।তবে আমি মনে করি এটি সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়ার প্রথম ধাপ।
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন