বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরীর গবেষণার প্রশংসা করেছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা বিল গেটস। ৭ অক্টোবর প্রযুক্তি উদ্যোক্তা বিল গেটস তাঁর ফেসবুক ও লিংকডইনসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। সেই ভিডিওতে তিনি কলেরার টিকা নিয়ে কথা বলেন। বিল গেটসের সেই ভিডিওটি দেখার আগেই হয়তো তোমাদের অনেকে কলেরার টিকা নিয়ে নিয়েছ।
কারণ, বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশে কলেরা প্রতিরোধে একটি বড় টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। গত ২২ আগস্ট থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ কর্মসূচির ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজের টিকা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা, কিশোরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নির্ধারিত ১৪টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এই টিকাদান কার্যক্রম চলে।
এই কর্মসূচির আওতায় এক বছরের বেশি বয়সী শিশু থেকে শুরু করে সবার জন্যই টিকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের এই টিকা দেওয়া হচ্ছে না। কলেরা থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষার জন্য মোট দুটি ডোজ টিকা নিতে হয়। প্রথম ডোজের পর ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে দ্বিতীয় ডোজের টিকা। বিভিন্ন স্কুল ও এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো থেকে এই টিকা দেওয়া হয়।
টিকা দেওয়ার স্থান ও সময়সূচি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে ভিজিট করতে পারো এই ওয়েবসাইটে: https://vaxepi.gov.bd/
এবার আবার বিল গেটসের সেই ভিডিওর কথায় ফেরা যাক। ভিডিওতে তিনি শুরুতেই উল্লেখ করেন, কলেরা একটি মারাত্মক ডায়রিয়াজনিত রোগ। প্রধানত দূষিত পানির মাধ্যমে এই রোগের জীবাণু ছড়ায়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে কলেরা দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। বিল গেটস বলেন, বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী এই টিকা ব্যবহারের মাধ্যমে কলেরার প্রাদুর্ভাব থামানোর জন্য কাজ করছেন।
বাংলাদেশসহ যেসব দেশে মানুষের ঘনত্ব বেশি এবং যেখানে নিরাপদ খাবার পানি ও উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থার সুযোগ কম, সেখানে কলেরা ছড়ানোর ঝুঁকি বেশি থাকে। এই রোগ দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিরোধ করার জন্য নিরাপদ পানি ও ভালো পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা থাকা জরুরি।
তবে এ ধরনের বড় ব্যবস্থা গড়ে তোলা বেশ সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এ জায়গায় কলেরার টিকা খুব দ্রুত রোগ ঠেকানোর কাজ করে। এই টিকা তৈরি করা সহজ, দামেও সাশ্রয়ী ও ইনজেকশনের বদলে কেবল মুখে খেয়েই এটি নেওয়া যায়।
বিল গেটস আরও বলেন, সহজে গ্রহণযোগ্য এই টিকা কলেরার মতো মারাত্মক রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। এভাবে বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী ও তাঁর সহগবেষকদের গবেষণা ও কাজ অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে।
ভিডিওতে বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী জানান, বাংলাদেশে একটি জাতীয় কলেরা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা বা ‘কন্ট্রোল প্ল্যান’ রয়েছে। সেখানে কোন সময়ে ও কোথায় ভ্যাকসিন বা টিকা দিতে হবে, তার স্পষ্ট বিবরণ রয়েছে। সেই পরিকল্পনা ও রোডম্যাপ বাস্তবে প্রয়োগ করার জন্য প্রায় ১০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন প্রয়োজন।
শীতকালে ও বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে কলেরার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। পরিস্থিতি খারাপ হলে আক্রান্তের হার ৩০ শতাংশ থেকে এমনকি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। তাই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সময়মতো টিকা পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি।
বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে কম খরচে ওরাল বা মুখে খাওয়ার কলেরা ভ্যাকসিন উদ্ভাবন ও গবেষণায় সহায়তা করে আসছে। বিশেষ করে আইসিডিডিআরবি এবং ফিরদৌসী কাদরীর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে সাশ্রয়ী মূল্যের কলেরা ভ্যাকসিন সহজলভ্য করতে ভূমিকা রেখেছে। বিল গেটসের প্রকাশিত এই ভিডিওটি মূলত সেই সচেতনতামূলক টিকা ক্যাম্পেইন বা প্রচারণারই একটি অংশ ছিল।
বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক। তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার (২০১৩), র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার (২০২১) পেয়েছেন। তিনি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডাইরিয়াল ডিজিজ রিসার্চের (আইসিডিডিআরবি) মিউকোসাল ইমিউনোলজি এবং ভ্যাকসিনোলজি ইউনিটের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁকে নিয়ে বিল গেটসের এমন ভিডিও এবারই প্রথম নয়। এর আগেও বিল গেটস তাঁর নিজস্ব ব্লগ ও ওয়েবসাইট গেটস নোটে ফিরদৌসী কাদরীর গবেষণা ও অবদান নিয়ে বিশেষ ফিচার প্রকাশ করেছিলেন।