পরিবারে কারো ডায়াবেটিস থাকলে সন্তানেরও এই রোগ হবে কিনা—তা নিয়ে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। অনেকেই ধরে নেন, বংশগত ইতিহাসের কারণে ডায়াবেটিস হওয়া অনিবার্য।
তবে এন্ডোক্রাইনোলজিস্টরা (হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ) বলছেন, জিনগত কারণে ঝুঁকি বাড়লেও কেবল জিনের ওপর ভর করে রোগটি হয় না। বরং শৈশবে গড়ে ওঠা জীবনযাত্রার অভ্যাস সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি মেটাবলিক বা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।
ভারতের ফরিদাবাদের অমৃতা হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান ড. নিশান্ত রাইজাদা বলেন, ‘পারিবারিক ইতিহাস ঝুঁকি বাড়ায়, তবে ডায়াবেটিস হওয়া অনিবার্য করে তোলে না। জিন কেবল একটি অংশ মাত্র। সন্তান কী খাচ্ছে, কতটা সক্রিয় থাকছে, কেমন ঘুমাচ্ছে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখছে কিনা—এই পরিবেশগত বিষয়গুলোই নির্ধারণ করে ভবিষ্যতে তার ডায়াবেটিস হবে কিনা।’
একই সুরে সিনিয়র কনসালটেন্ট ড. অনুপম বিশ্বাস বলেন, ‘বংশে ডায়াবেটিস থাকা মানেই সন্তানের এই রোগ হওয়া অবধারিত নয়। সঠিক জীবনযাত্রার মাধ্যমে টাইপ ২ ডায়াবেটিসকে আটকে দেওয়া বা দূরে রাখা পুরোপুরি সম্ভব।’
ডায়াবেটিস প্রতিরোধে চিকিৎসকদের দেওয়া প্রধান পরামর্শগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. শুরু থেকেই পুষ্টিকর খাবারের অভ্যাস
সন্তানকে কঠোর ডায়েট করানোর চেয়ে শুরু থেকেই স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। দৈনিক খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত:
পাশাপাশি কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও ফাস্টফুডকে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিয়ে মাঝেমধ্যে ‘ট্রিট’ হিসেবে রাখা যেতে পারে।
২. প্রতিদিন অন্তত ৬০ মিনিট শারীরিক পরিশ্রম
ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম স্থূলতা প্রতিরোধে দারুণ ভূমিকা রাখে। এর জন্য শিশুকে জিমে বা কঠোর নিয়মে বাঁধতে হবে না। তার চেয়ে তাদের পছন্দের অ্যাক্টিভিটি যেমন—সাইকেল চালানো, সাঁতার, দৌড়াদৌড়ি, নাচ কিংবা ফুটবল বা ক্রিকেটের মতো আউটডোর খেলাধুলায় উৎসাহিত করা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের প্রতিদিন অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে ভারী শারীরিক পরিশ্রম করা প্রয়োজন।
৩. পর্যাপ্ত ঘুম ও স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ
আজকাল শিশুরা ফোন, ট্যাবলেট বা টিভিতে প্রচুর সময় কাটায়। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের কারণে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বাড়ে, ঘুম নষ্ট হয় এবং ওজন বৃদ্ধি পায়।
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে ক্ষুধা ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের হরমোনগুলোর ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়, যা পরবর্তীতে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের দিকে ঠেলে দেয়। তাই রাতে ঘুমানোর আগে স্ক্রিন দেখার অভ্যাস বন্ধ করা জরুরি।
সতর্ক সংকেত: কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
বংশে ডায়াবেটিস থাকলে শিশুদের কিছু লক্ষণের দিকে কড়া নজর রাখতে হবে। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, শিশুরা মুখে বলার চেয়ে বাবা-মাকে যা করতে দেখে, তা বেশি অনুকরণ করে। যে পরিবারে বাবা-মা নিজেরা সুষম খাবার খান, নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন, সন্তানরাও প্রাকৃতিকভাবে সেই সুস্থ জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
অতএব, বংশগত ইতিহাসকে ভয় না পেয়ে একে আগেভাগেই সচেতন হওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ।