জন্মদাতা পিতার দেওয়া নাম পরিবর্তন করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহু। বর্তমানে তার পরিবর্তিত নাম ‘ইয়োনাথান হুন’। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। অতীতেও ‘হুন’ পদবি ব্যবহার করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে ‘ইয়াইর হুন’ নামেও পরিচয় দিতেন।
বুধবার (৮ জুলাই) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইস্যু করা কর-সংক্রান্ত নথিতে তার নাম ছিল ‘ইয়াইর নেতানিয়াহু’। তবে চলতি বছরের নথিতে একই পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে নতুন নাম ‘ইয়োনাথান হুন’ ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে ঠিকানা হিসেবে আগের মতোই ‘বালফোর ০’ উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঠিকানা ‘কাল্পনিক’ বলেই বেশি পরিচিত।
ইয়াইর অতীতেও ‘হুন’ পদবি ব্যবহার করেছেন বলে জানিয়েছে হারেৎজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি নিজেকে ‘ইয়াইর হুন’ নামেও পরিচয় দিতেন। ‘হুন’ ছিল তার মা ও নেতানিয়াহুর দ্বিতীয় স্ত্রী সারা নেতানিয়াহুর বাবা শমুয়েলের পারিবারিক পদবি। এই পদবি পরবর্তীতে পরিবর্তন করে ‘বেন-আরতজি’ রাখা হয়।
নাম বদলান বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও
তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর পরিবারের সদস্যদের নাম পরিবর্তনের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ইয়াইরের ছোট ভাই আভনার নেতানিয়াহু প্রায় পাঁচ বছর আগে নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘আভি সেগাল’ রাখেন বলে দাবি হারেৎজের।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমের দাবি, নজর এড়ানোর উদ্দেশ্যে এই নাম ব্যবহার করে তিনি ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে ৫ লাখ ২ হাজার পাউন্ড (প্রায় ৬ লাখ ৭২ হাজার মার্কিন ডলার) নগদে একটি অ্যাপার্টমেন্ট কেনেন।
নেতানিয়াহুর মা এবং ইয়াইর ও আভনারের দাদি জিলার পারিবারিক পদবি ছিল ‘সেগাল’। বেনজিয়ন নেতানিয়াহুকে বিয়ের আগে তিনি এই পদবিই ব্যবহার করতেন। ১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ‘বেন নিতাই’ নামে পরিচিত ছিলেন। পরে তিনি বলেছিলেন, সে সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের কথাও বিবেচনা করেছিলেন।
নেতানিয়াহু পরিবারের নাম পরিবর্তনের ইতিহাস আরও পুরোনো। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বাবা বেনজিয়ন নেতানিয়াহুর পারিবারিক পদবি ছিল ‘মিলেইকোভস্কি’। ১৯২০-এর দশকে পোল্যান্ড থেকে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত ফিলিস্তিনে যাওয়ার পর তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘বেনজিয়ন নেতানিয়াহু’ রাখেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, সে সময় ইউরোপীয় পদবি পরিবর্তন করে হিব্রু নাম গ্রহণ করা জায়নবাদী আন্দোলনের একটি প্রচলিত ধারা ছিল। নতুন ভূখণ্ডে জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলার অংশ হিসেবেই অনেক ইহুদি অভিবাসী এ ধরনের নাম গ্রহণ করেছিলেন।
ইসরায়েলের আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতা একই পথ অনুসরণ করেন। দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের জন্মনাম ছিল ডেভিড গ্রুয়েন। ইসরায়েলের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী ও প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোশে শারেটের জন্মনাম ছিল মোশে শেরটোক, তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী লেভি এশকলের নাম ছিল লেভি ইৎজাক শকলনিক এবং চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্বের চতুর্থ নারী প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারের নাম ছিল গোল্ডা মাবোভিচ।
এ ছাড়া ইসরায়েলের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী ও লিকুট পার্টির নেতা ইৎজাক শামিরের জন্মনাম ছিল ইৎজাক ইয়েজেরনিৎস্কি, নবম প্রেসিডেন্ট ও দুইবারের প্রধানমন্ত্রী শিমন পেরেজের জন্মনাম ছিল সিমন পেরস্কি, এহুদ বারাকের জন্মনাম ছিল এহুদ ব্রগ এবং এরিয়েল শ্যারনের জন্মনাম ছিল আরিক শাইনারম্যান।
নেতানিয়াহুর ছেলের নাম পরিবর্তনের নেপথ্যে
হারেৎজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এমন সময় ইয়াইর নেতানিয়াহুর এই নাম পরিবর্তনের তথ্য সামনে এলো, যখন নেতানিয়াহু পরিবার দেশ-বিদেশে রাজনৈতিক ও আইনি নানা বিতর্কের মুখে রয়েছে।
গাজায় যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পারিবারিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও ধনী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে অতীতে ইয়াইরও বিতর্কের মুখে পড়েছেন।
২০১৮ সালে ইসরায়েলি টেলিভিশনে প্রচারিত একটি অডিও রেকর্ডিংয়ে ইয়াইরকে একটি স্ট্রিপ ক্লাবের বাইরে বলতে শোনা যায়, তার বাবা এক ধনকুবেরের স্বার্থে বহু বিলিয়ন ডলারের একটি গ্যাস চুক্তি এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছিলেন। ওই রেকর্ডিং প্রকাশের পর ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
এরপর থেকে ইয়াইর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং বিভিন্ন রক্ষণশীল ও উগ্র-ডানপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এদিকে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেও ইসরায়েলে একাধিক দুর্নীতির মামলার বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি রয়েছেন।
সূত্র: এশিয়া পোস্ট