এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন : বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের কুখ্যাত দস্যু বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর তিন সক্রিয় সদস্য অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। এ সময় তাদের হাতে অপহৃত হয়ে ১৫ দিন ধরে জিম্মি থাকা এক জেলেকেও উদ্ধার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকালে মোংলায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন বেইজে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি, র্যাব, বিজিবি ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কোস্ট গার্ড সূত্র জানায়, অন্ধকার জগত ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার লক্ষ্যে বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ওই তিন সদস্য আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তারা দুটি দেশীয় একনলা বন্দুক, একটি দেশীয় পাইপগান এবং ৪০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মাদ মেসবাউল ইসলামের কাছে জমা দেন।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড জানায়, সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাহিনীটি সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, সতর্কতা ও কঠোর অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের নির্দেশনায় সুন্দরবন অঞ্চলে সক্রিয় বনদস্যু বাহিনী নির্মূল এবং উপকূলীয় অঞ্চলের জেলে, বাওয়ালি ও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক ও সফল অভিযানের ফলে সুন্দরবনে সক্রিয় বিভিন্ন দস্যু বাহিনী বর্তমানে ব্যাপকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। কঠোর নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং নিয়মিত অভিযানের কারণে দস্যুরা তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর তিন সক্রিয় সদস্য দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
আত্মসমর্পণকারী তিনজন হলেন আলামিন হোসেন (৪০), বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার বাসিন্দা; তৈবুর রহমান (২৪), সাতক্ষীরার তালা উপজেলার বাসিন্দা; এবং মনিরুজ্জামান মামুন (২০), খুলনার কয়রা উপজেলার বাসিন্দা। তারা দীর্ঘদিন ধরে বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্য হিসেবে সুন্দরবনে ডাকাতি, জেলে ও বাওয়ালিদের অপহরণ এবং মুক্তিপণ আদায়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
এর আগে গত ২১ মে সুন্দরবনের আরেক কুখ্যাত দস্যু দল ছোট সুমন বাহিনীর প্রধান ছোট সুমনসহ সাত সদস্য অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
কোস্ট গার্ড জানায়, জব্দকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংরক্ষণ, আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের পুনর্বাসন এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম গ্রহণের পাশাপাশি উদ্ধারকৃত জেলেকে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড জাহাজ বিসিজিএস কামরুজ্জামানের নির্বাহী কর্মকর্তা কমান্ডার মো. মানসুর মাহদীন বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে পরিচালিত দস্যুদমন অভিযানে এ পর্যন্ত ৪৯টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০ রাউন্ড তাজা গোলা, ৩১৬ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ১০৮ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১৯৪ রাউন্ড এয়ারগানের গুলি এবং দুটি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে ৪২ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়।
তিনি আরও বলেন, দস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা ৪১ জনকে জীবিত উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা প্রদান শেষে নিরাপদে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া ছোট সুমন বাহিনীর প্রধানসহ সাতজন সদস্য অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেছেন।
কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের জোনাল কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন মোহাম্মাদ মেসবাউল ইসলাম বলেন, কোস্ট গার্ডের নিরলস অভিযান এবং কঠোর অবস্থানের কারণেই সুন্দরবনে সক্রিয় দস্যু বাহিনীগুলো অনেকাংশে দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তিনি সকল সক্রিয় দস্যুকে দস্যুবৃত্তি পরিহার করে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে ইচ্ছুক, আত্মসমর্পণের পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ প্রদান করা হবে। অন্যদিকে যারা আত্মসমর্পণ না করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখবে, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আলোকে আরও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনকে সম্পূর্ণরূপে দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে কোস্ট গার্ডের নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। সরকারের নির্দেশনা, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।