শিরোনাম
◈ মব–গণপিটুনিতে জানুয়ারিতে নিহত বেড়ে দ্বিগুণ, বেড়েছে অজ্ঞাতনামা লাশ: এমএসএফের প্রতিবেদন ◈ মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলায় বিক্রি ৩৯৩ কোটি টাকা ◈ আর্থিক ধসের মুখে জাতিসংঘ, সদস্য দেশগুলোকে গুতেরেসের জরুরি চিঠি ◈ পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর নতুন বাসভবনের স্থান চূড়ান্ত, কাজ শুরু শিগগির ◈ জাইমা রহমানকে সামনে এনে কী বার্তা দিচ্ছে বিএনপি ◈ এ মৌসুমের জন্য শেষ হলো পর্যটকদের সেন্টমার্টিন যাত্রা, ফের ভ্রমণে ৯ মাসের নিষেধাজ্ঞা ◈ নির্বাচন ঘিরে পার্শ্ববর্তী দেশ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত: নাহিদ ইসলাম ◈ ১২ ঘন্টার মধ্যে ফলাফল ঘোষণা না হলেই বুঝবো অসৎ কোনো উদ্দেশ্য আছে : মির্জা আব্বাস  ◈ যারাই বিভ্রান্ত করতে আসবে দেখামাত্র বলবেন, ‘গুপ্ত’ তোমরা: তারেক রহমান (ভিডিও) ◈ এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বকেয়া উৎসব ভাতা নিয়ে জরুরি নির্দেশনা

প্রকাশিত : ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৩:০২ দুপুর
আপডেট : ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী ৭৮, অধিকাংশই রাজনৈতিক পরিবার থেকে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তত ৭৮ জন নারী প্রার্থী হয়েছেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের ইতিহাসে এটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংখ্যা। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিসংখ্যানই আসলে দেখিয়ে দেয়, রাজনীতিতে লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ এখনো কতটা পিছিয়ে রয়েছে।

আরও উদ্বেগজনক হলো, এই ৭৮ জন নারীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই স্বতন্ত্র রাজনৈতিক চরিত্র নন। তারা প্রভাবশালী কোনো পুরুষ রাজনীতিকের স্ত্রী, কন্যা কিংবা পরিবারের সদস্য। দলীয় নেতৃত্ব ও ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের সূত্রেই তাদের রাজনৈতিক উত্থান।

এই নারী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মাত্র ৬৭টি সংসদীয় আসনে। ফলে দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে সরাসরি নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিত্বের কোনো সুযোগই নেই।

দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হলেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে নারীর অংশ মাত্র ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই প্রতিনিধিত্ব অনেকটাই প্রতীকী এবং প্রধানত বংশানুক্রমিক।

৭৮ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে ৩০টি রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন পেয়েছেন ৬১ জন। বাকি ১৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, যেসব নারীর রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী পরিবার বা দাম্পত্য সম্পর্ক রয়েছে, তারা তুলনামূলকভাবে ভালো ফল করে থাকেন।


নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা এখনো গভীরভাবে পুরুষতান্ত্রিক।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে অধিকাংশ নারী রাজনীতিক বা সংসদ সদস্য পারিবারিক প্রভাবের মাধ্যমেই উঠে এসেছেন। একেবারে তৃণমূল থেকে সংগ্রাম করে উঠে আসা নারীর সংখ্যা খুবই কম। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে মাঠপর্যায়ে কাজ করে ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা নারী নেতৃত্ব প্রায় নেই বললেই চলে।

তিনি আরও বলেন, এর পেছনে সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোরও বড় ভূমিকা রয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সাধারণত মেয়েদের রাজনীতিতে যেতে উৎসাহ দেয় না। রাজনীতি এখনো নারীদের জন্য নিরাপদ নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই অনিরাপদ।

১৯৭২ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় পর্যায়সহ রাজনৈতিক দলগুলোর কমিটিতে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রায় সব দলই এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২১ সালে নির্বাচন কমিশন সময়সীমা বাড়িয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত করেছে।

জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জনতার দল, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোট, বাংলাদেশ কংগ্রেস, জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট ও বাংলাদেশ জাসদসহ অন্তত ৩০টি দল এবারের নির্বাচনে কেবল পুরুষ প্রার্থী দিয়েছে।

নারী প্রার্থী না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, তাদের দল তৃণমূলভিত্তিক প্রার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। পুরুষদের ক্ষেত্রে দল নির্দেশনা দেয়, আর নারীদের পরিবার ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, এবার নারী প্রার্থী দেওয়া হয়নি। ইনশাআল্লাহ, পরেরবার দেওয়া হবে।

এবার বিএনপি ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। ২৮ জানুয়ারি 'রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব: সংকট ও সম্ভাবনা' শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, মনোনয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত নারীদের গুরুত্ব দেয় না।

তিনি বলেন, যেসব নারীর বাবা, ভাই কিংবা স্বামী রাজনীতিতে আছেন, তাদেরই জয়ের সম্ভাবনা বেশি বলে দল মনে করে। বাস্তবতা হলো, এবারও তৃণমূল থেকে উঠে আসা কোনো নারী নেত্রী মনোনয়ন পাননি।

জেসমিন টুলী বলেন, দলগুলোর কাছে জয়ের সম্ভাবনাই মুখ্য। নারীদের আর্থিক সামর্থ্য ও পেশিশক্তি তুলনামূলক কম। তাই দলগুলো পুরুষ প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেয়। পারিবারিক নেটওয়ার্ক থাকা নারীরা এ ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পান।

পারিবারিক সম্পর্ক
বিএনপির ১০ জন নারী প্রার্থীর সবাই সরাসরি দলের শীর্ষ নেতাদের পরিবারের সদস্য।

এর মধ্যে রয়েছেন বিএনপির বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও মন্ত্রী কেএম ওবায়দুর রহমানের কন্যা শামা ওবায়েদ, তিনি ফরিদপুর-২ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নায়াব ইউসুফ ফরিদপুর-৩ আসনে প্রার্থী হয়েছেন। তিনি সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের কন্যা।

নাটোর-১ আসনের প্রার্থী ফারজানা শারমিন বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির বিশেষ সহকারী। তিনি ওই আসনের চারবারের বিএনপি সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের কন্যা।

যশোর-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবিরা সুলতানা মুন্নি। তিনি সাবেক বিএনপি সংসদ সদস্য নাজমুল ইসলামের স্ত্রী। নাজমুল ইসলাম ২০১১ সালে ঢাকায় অপহৃত হন এবং পরে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

ঝালকাঠি–২ আসনের ইসরাত সুলতানা এলেন ভুট্টো ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমুকে পরাজিত করেছিলেন। তিনি নিহত সংসদ সদস্য জুলফিকার আলী ভুট্টোর স্ত্রী।

মাদারীপুর-১ আসনের প্রার্থী নাদিরা আক্তার শিবচর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মিঠু চৌধুরীর স্ত্রী।

মানিকগঞ্জ-৩ আসনের প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা শিল্পপতি ও সাবেক মন্ত্রী হারুনার রশীদ খান মুন্নুর কন্যা।

শেরপুর-১ আসনের প্রার্থী সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হযরত আলীর কন্যা।

সিলেট-২ আসনের প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর লুনা গুমের শিকার সাবেক বিএনপি সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলীর স্ত্রী।

ঢাকা-১৪ আসনের প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলি। তিনি গুমের শিকার বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন। তিনি গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের একটি প্ল্যাটফর্ম 'মায়ের ডাক'-এর সমন্বয়ক। '

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) ১০ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে সীমা দত্ত (ঢাকা-৭) দলের নেতা মানস দত্তের স্ত্রী এবং তাসলিমা আক্তার (গাজীপুর-১) আরেক দলীয় প্রার্থী মাসুম রেজার স্ত্রী।

গণসংহতি আন্দোলন চারজন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। তাদের মধ্যে শ্রমিক নেতা ও আলোকচিত্রী তাসলিমা আখতার (ঢাকা-১২) আছেন, যিনি দলের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকির স্ত্রী।

দলীয় কর্মীরা জানান, বাসদের (মার্কসবাদী) সীমা দত্ত এবং গণসংহতির তাসলিমা বিয়ের আগেই তাদের ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তানিয়া রব (লক্ষ্মীপুর-৪), তিনি দলের সভাপতি আ স ম রবের স্ত্রী।

ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ ছয়জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। তাদের মধ্যে সাবিনা খাতুন (চট্টগ্রাম-১০) দলের নেতা এমদাদুল হকের স্ত্রী।

জাতীয় পার্টি ছয়জন নারী প্রার্থী দিয়েছে, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল পাঁচজন, গণঅধিকার পরিষদ তিনজন এবং গণফোরাম, জাতীয় নাগরিক পার্টি ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি দুটি করে নারী প্রার্থী দিয়েছে।

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে রুমিন ফারহানা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২) প্রয়াত ডেমোক্রেটিক লীগ নেতা অলি আহাদের কন্যা।

সামিরা আজিম (কুমিল্লা-৯) রাজনীতিতে আসেন তার বাবা ও সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ার উল আজিমের মৃত্যুর পর।

আখতার সুলতানা (ময়মনসিংহ-৬) সাবেক বিএনপি সংসদ সদস্য শামসুদ্দিন আহমেদের স্ত্রী।

হাসিনা খান চৌধুরী (ময়মনসিংহ-৯) সাবেক বিএনপি সংসদ সদস্য খুররম খান চৌধুরীর স্ত্রী।

অন্তরা সেলিমা হুদা (ঢাকা-১) সাবেক মন্ত্রী নজমুল হুদার কন্যা।

দীর্ঘ ও অসম ইতিহাস
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে কোনো নারী নির্বাচিত হননি। ১৯৮৬ সালে পাঁচজন এবং ১৯৮৮ সালে চারজন নারী নির্বাচিত হন।

১৯৯১ সালে ৪০ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং চারজন জয়ী হন। ১৯৯৬ সালের জুনে ৩০ জন নারী প্রার্থী হন এবং পাঁচজন নির্বাচিত হন।

২০০১ সালে ৩৮ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ছয়জন জয়ী হন। ২০০৮ সালে ৫৯ জন নারী প্রার্থী হন এবং ১৯ জন নির্বাচিত হন।

২০১৪ সালে ২৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৮ জন জয়ী হন। ২০১৮ সালে ৬৯ জন নারী প্রার্থী হন এবং ২২ জন নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালে ৯৯ জন নারী প্রার্থী হন এবং ২০ জন জয়ী হন।

২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলো একতরফা বলে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। অধিকাংশ বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করে এবং ডামি প্রার্থীর অভিযোগ ওঠে। ২০১৮ সালের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও ব্যালট ভর্তি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার অভিযোগে কলুষিত হয়।

দশকের পর দশক ধরে একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, নারীরা রাজনীতিতে প্রবেশ করছেন, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজেদের শর্তে নয়। তারা উত্তরাধিকার সূত্রে এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ঢুকছেন, যেখানে ক্ষমতা মাঠে অর্জিত হয় না, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হস্তান্তরিত হয়। আর সেই ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ এখনো মূলত পুরুষদের হাতেই। উৎস: ডেইলি স্টার।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়