আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটগ্রহণ চলাকালে কোনো ভোটকেন্দ্রে ব্যালট বাক্স নষ্ট, হারিয়ে যাওয়া বা জোরপূর্বক অপসারণের ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে ওই কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বন্ধ ঘোষণা করা হবে। এমন পরিস্থিতিতে ওই কেন্দ্রের ভোট গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে না এবং নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে নতুন তারিখ নির্ধারণ করে পুনঃভোটগ্রহণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) ইসির উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত এক পরিপত্র থেকে বিষয়টি জানা যায়। এতে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ২৪ অনুসারে রিটার্নিং অফিসাররা ভোটগ্রহণের দিন ও সময় উল্লেখ করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করবেন এবং স্থানীয়ভাবে তা প্রচারের ব্যবস্থা নেবেন।
এতে আরও বলা হয়, নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো কারণে ভোটগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হলে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুনরায় শুরু করা সম্ভব না হলে প্রিজাইডিং অফিসার ভোটগ্রহণ বন্ধ ঘোষণা করবেন। এক্ষেত্রে ব্যালট বাক্স অপসারণ, ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট হলে কিংবা ভোটের ফল নির্ধারণ অসম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ভোট বাতিল হবে। রিটার্নিং অফিসার কমিশনের অনুমোদন নিয়ে নতুন তারিখে পুনঃভোটের ব্যবস্থা নেবেন। যদি কোনো ভোটকেন্দ্রের ফল বাদ দিয়ে পুরো নির্বাচনী এলাকার ফল নির্ধারণ সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে পুনঃভোটের নির্দেশ দেবে। পুনঃভোটে ওই কেন্দ্রের সকল ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বলপ্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সুষ্ঠু নির্বাচন অসম্ভব হলে কমিশন যে কোনো পর্যায়ে ভোটগ্রহণসহ নির্বাচনী কার্যক্রম বন্ধ করার ক্ষমতা রাখে।
ডাকযোগে ভোট ও ফল পাঠানো
প্রবাসী ও নির্ধারিত শ্রেণির ভোটাররা ডাকযোগে (ওসিভি ও আইসিভি) আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে পারবেন। এ সংক্রান্ত পৃথক পরিপত্র অনুযায়ী ভোট গ্রহণ করা হবে। এছাড়া প্রিজাইডিং অফিসার ভোটকেন্দ্র থেকে সরাসরি ডাকযোগে জাতীয় সংসদ ও গণভোটের ভোটগণনার বিবরণীর এক কপি নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন। এজন্য প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে বিশেষ খাম সরবরাহ করা হবে এবং খাম পৌঁছাতে পোস্ট অফিস ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ভোটকেন্দ্রে ব্যানার ও প্রবেশাধিকার
এ পরিপত্রে ইসি আরও জানায়, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক সম্বলিত পরিবেশবান্ধব ব্যানার প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি কারা ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন—এ সংক্রান্ত ফেস্টুন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টানাতে হবে। অবাঞ্ছিত কেউ যাতে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে গণভোট সংক্রান্ত ব্যানার প্রদর্শন করতে হবে। এতে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং সংশ্লিষ্ট লিখিত প্রস্তাবসমূহ স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। ব্যানার মুদ্রণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেবে কমিশন।
ব্যালট পেপারের নিরাপত্তায় কঠোর পদক্ষেপ ইসির
এদিকে, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের ব্যালট পেপারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে ইসি। এক্ষেত্রে সরকারি মুদ্রণালয় থেকে জেলা, উপজেলা ও ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনি দ্রব্যাদি পরিবহন ও সংরক্ষণে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রিটার্নিং অফিসার ও প্রিজাইডিং অফিসারদের দায়িত্বে থাকছে সব ধরনের নির্বাচনি সামগ্রী নিরাপদভাবে বিতরণ করা এবং নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে কোনো ত্রুটি বা অসঙ্গতি হলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধন ও ইসি সচিবালয়কে জানাতে হবে।
বৃহস্পতিবার ইসির উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন স্বাক্ষরিত পৃথক পরিপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
ইসি জানায়, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর প্রতীক বরাদ্দ দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর তালিকা নির্বাচন কমিশনে পাঠানোর নির্দেশনা আগেই দেওয়া হয়েছে। পোস্টাল ব্যালটে (ওসিভি ও আইসিভি) নিবন্ধিত ভোটার বাদে অবশিষ্ট ভোটারের সংখ্যার ভিত্তিতে ব্যালট পেপার মুদ্রণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পোস্টাল ব্যালট মুদ্রণ ও প্রেরণ সম্পন্ন হয়েছে। ব্যালট পেপারসহ অন্যান্য সামগ্রী বিজি প্রেস, গভর্নমেন্ট প্রিন্টিং প্রেস ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস থেকে সরবরাহ করা হবে।
ব্যালট পেপার গ্রহণে ক্ষমতাপত্র বাধ্যতামূলক
নির্বাচন কমিশনের সময়সূচি অনুযায়ী রিটার্নিং অফিসার সংশ্লিষ্ট সিনিয়র জেলা/জেলা নির্বাচন অফিসারের একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা এবং নিজের একজন প্রতিনিধি ঢাকায় পাঠাবেন। ব্যালট পেপার গ্রহণকারী কর্মকর্তাকে অবশ্যই রিটার্নিং অফিসারের দেওয়া লিখিত ক্ষমতাপত্র সঙ্গে রাখতে হবে।
প্রেসে যাচাই ও ত্রুটি সংশোধন
প্রেস থেকে ব্যালট পেপার গ্রহণের সময় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নাম, প্রতীক ও ভোটার সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করতে হবে। এ জন্য প্রতিটি নির্বাচনি এলাকার প্রার্থীদের নাম ও প্রতীকের তালিকা (ফরম-৫) সঙ্গে রাখতে বলা হয়েছে। কোনো ত্রুটি ধরা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছে ইসি।
পরিবহন ও সংরক্ষণে কঠোর নিরাপত্তা
পরিপত্রে বলা হয়, সরকারি মুদ্রণালয় থেকে জেলা, উপজেলা হয়ে ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত ব্যালট পেপার ও নির্বাচনি দ্রব্যাদি পরিবহণে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ব্যালট পেপার, মার্কিং সিল ও অফিসিয়াল সিলের গোপনীয়তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রক্ষার কথা বলা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ব্যবহৃত ফরম, প্যাকেট, ম্যানুয়েল, পোস্টার ও অন্যান্য মুদ্রণ সামগ্রী নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে। স্ট্যাম্প প্যাড, অফিসিয়াল সিল, অমোচনীয় কালির কলমসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী ইতোমধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে। কোনো ঘাটতি বা অসংগতি ধরা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়কে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভোটের আগের দিন ব্যালট যাবে কেন্দ্রে
ইসি'র এ পরিপত্রে জানানো হয়, ভোটগ্রহণের আগের দিন নির্ধারিত সময়ে প্রিজাইডিং অফিসাররা ব্যালট পেপার ও নির্বাচনি মালামাল গ্রহণ করবেন। ওই দিনই নিরাপত্তার সঙ্গে সব ভোটকেন্দ্রে ব্যালট পেপার পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নিতে বলা হয়েছে। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ও নির্বাচনি সামগ্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
স্থানীয়ভাবে মনিহারী দ্রব্যাদি ক্রয়
বল পয়েন্ট কলম, কাগজ, প্লেকার্ড, দেয়াল-পত্রসহ কিছু মনিহারী দ্রব্যাদি স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ বা মুদ্রণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব সামগ্রী ক্রয়ের সময় গুণগত মান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ইসি। এ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের ভোট গ্রহণ করা হবে। সূত্র: সমকাল