একসময় যে বর্জ্যকে কেবলই বোঝা ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা হতো, তা-ই এখন অত্যন্ত লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে চামড়ার ট্যানারিগুলো থেকে আসা রাসায়নিকযুক্ত কঠিন বর্জ্য খোলা জায়গায় ফেলা হতো। এতে মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছিল আশপাশের পরিবেশ। কিন্তু একটি চীনা গ্রুপের ১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ আজ সেই ঝুঁকিকেই নতুন সম্ভাবনায় রূপ দিয়েছে।
বাংলাদেশে দুটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে ট্যানারির বর্জ্যকে শিল্পের কাজে ব্যবহারযোগ্য প্রোটিন পাউডার ও ওষুধ শিল্পের উপযোগী জেলটিনে রূপান্তর করছে চীনের ওয়েনঝো ইউয়ানফেই গ্রুপ। ক্ষতিকর বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে গুরুত্বপূর্ণ জরুরি বাণিজ্যিক উপকরণ তৈরি করছে তারা।
গত বছর থেকে এ পর্যন্ত গ্রুপটি চীন, কম্বোডিয়া ও অন্যান্য দেশে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে প্রায় ১.৩ মিলিয়ন ডলারের জেলটিন ও ৩ লাখ ডলারের প্রোটিন পাউডার রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া এক চিঠির তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি হংকং থেকেও ৪ লাখ ডলারের জেলটিন পণ্যের ক্রয়াদেশ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে পাওয়ার পর গ্রুপটি এখন তাদের পণ্য তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রেও রপ্তানি করার পরিকল্পনা করছে। ওই দেশগুলোর বাজারে এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
ওয়েনঝো ইউয়ানফেই গ্রুপের অধীনে বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি লিমিটেড ও ইয়ংলি বায়োটেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠান দুটি সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কাছে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রায় ১০০ কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগে স্থাপিত কারখানা দুটিতে গত বছর থেকেই রপ্তানির উদ্দেশ্যে ট্যানারি বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ শুরু হয়।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে নিবন্ধিত ইয়ংলি বায়োটেকনোলজি শিল্প প্রোটিন পাউডার প্রস্তুতকারক এবং শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রধান কাঁচামাল হলো চামড়া শিল্পনগরী থেকে সংগ্রহ করা ওয়েট ব্লু ডাস্ট, চামড়ার ছাঁট ও অন্যান্য বর্জ্য।
ইউয়ানফেইয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যানুসারে, বাংলাদেশ জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন কোম্পানি ২০২৩ সালে ওয়েনঝো ইউয়ানফেই ও পিংইয়াং গ্রুপের যৌথ চীনা বিনিয়োগ উদ্যোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও বর্জ্য শোধনাগার বা এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে জেলটিন উৎপাদন শুরু করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির কারখানার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৫ হাজার টন জেলটিন, বৈদেশিক মুদ্রায় যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২২.৫০ মিলিয়ন ডলার। প্রতিষ্ঠানটি ট্যানারির বর্জ্য থেকে শিল্পের কাজে ব্যবহারযোগ্য প্রোটিন পাউডারও উৎপাদন করে।
কোম্পানি দুটি প্রতি বছর প্রায় ১৫ হাজার টন ট্যানারির বর্জ্য সংগ্রহ করে। এরপর আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে সেগুলো রিসাইকেল করে রপ্তানিযোগ্য শিল্প প্রোটিন পাউডার ও জেলটিন উৎপাদন করে।
এ খাতের বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রুপ ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. মাসুদ হোসেন খান বলেন, বর্তমানে এই বাজারে শুধু তাদের প্রতিষ্ঠানই কাজ করছে; দেশি কোনো কোম্পানি এখনও এই ব্যবসায় যুক্ত হয়নি।
তিনি বলেন, আগে ট্যানারির কাঁচা বর্জ্য খোলা জায়গায় ফেলা হতো, যা মারাত্মক পরিবেশ দূষণ করত। এখন এই দুই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সেই বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চ মূল্যের রপ্তানিমুখী পণ্য তৈরি করছে। এর মাধ্যমে তারা যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবদান রাখছে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রাও আয় করছে।
মাসুদ আরও বলেন, 'আমাদের কারখানাগুলোতে এরইমধ্যে প্রায় এক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
'চামড়া শিল্পনগরীতে উৎপন্ন সমস্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পূর্ণ সক্ষমতা আমাদের আছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) যদি শিল্পনগরীর ভেতরে আমাদের বিনামূল্যে জায়গার ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে আমরা ফ্লেশিং এবং অন্যান্য কঠিন বর্জ্যও রিসাইকেল করতে পারব।'
ফ্লেশিং হলো চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের (ট্যানিং) অন্যতম প্রধান উপজাত পণ্য। পশুর চামড়ার ভেতরের অংশে লেগে থাকা অতিরিক্ত চর্বি, টিস্যু ও মাংস চেঁছে বা কেটে ফেলে এটি তৈরি হয়।
মাসুদ সরকারের প্রতি কাঁচা চামড়ার ছাঁট রপ্তানি বন্ধ করার আহ্বান জানান। সেইসঙ্গে স্থানীয় ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ওয়েট ব্লু শেভিং ডাস্ট ও চামড়ার ছাঁট যেন অন্য কোনো দিকে চলে না যায়, সে ব্যাপারেও পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করেন।
গত বছরের এপ্রিলে ট্যানারির বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সহজ করতে ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করে জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন।
বর্জ্য শোধনাগার কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম শাহনেওয়াজ টিবিএসকে বলেন, ট্যানারির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট সমাধানের প্রচেষ্টায় এই উদ্যোগ একটি বড় মাইলফলক।
এই কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমের ফলে আমদানি করা জেলটিন ও ওষুধ শিল্পের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট উপকরণের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা কমার সম্ভাবনাও রয়েছে।
কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, শিল্প প্রোটিন পাউডার মূলত প্রক্রিয়াজাত চামড়াকে নরম করার কাজে ব্যবহৃত হয়। আর জেলটিন ব্যবহার করা হয় ওষুধের ক্যাপসুলের আবরণ তৈরিতে। বর্তমানে দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এসব পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকে।
কাঁচামাল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
এতসব অগ্রগতির পরও কোম্পানিগুলো বলছে, গরুর কাঁচা চামড়ার ছাঁট রপ্তানির কারণে তাদের কার্যক্রম ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। এই ছাঁট মূলত জেলটিন উৎপাদনের অন্যতম কাঁচামাল।
জুনের শেষে বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেয় জেডব্লিউ অ্যানিমেল প্রোটিন, যার একটি অনুলিপি টিবিএসের হাতে এসেছে।
চিঠিতে সাভার চামড়া শিল্পনগরী থেকে গরুর চামড়ার ছাঁট রপ্তানি নিষিদ্ধ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় কোম্পানিটি। পাশাপাশি দেশীয় জেলটিন উৎপাদন ও বিদেশি বিনিয়োগ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ারও অনুরোধ জানানো হয়।
কোম্পানিটি জানায়, বাংলাদেশে তারা এ পর্যন্ত প্রায় ৭৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এছাড়া তারা ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) নিবন্ধন এবং হালাল ও জিএমপি-সহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সনদ অর্জনের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করেছে।
কোম্পানিটির তথ্যমতে, তাদের ৫ হাজার টন জেলটিন উৎপাদনের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রায় ৩০ হাজার টন গরুর কাঁচা চামড়ার ছাঁট প্রয়োজন।
তাদের প্রাক্কলন অনুসারে, বাংলাদেশে প্রতি বছর এ ধরনের চামড়ার ছাঁট উৎপাদিত হয় মাত্র ২০ হাজার টনের মতো। অর্থাৎ তাদের পরিকল্পিত উৎপাদনের জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ আগে থেকেই অপর্যাপ্ত।
তবে সম্প্রতি কিছু দেশি ব্যবসায়ী এই ছাঁট রপ্তানি শুরু করেছেন বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি। এতে তাদের কারখানার কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ৩.৫ মিলিয়ন ডলার মূল্যের জেলটিন আমদানি করা হয়েছিল। ওষুধের ক্যাপসুলের আবরণ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে জেলটিন ব্যবহৃত হয়। চিঠির তথ্যমতে, ওই একই বছর দেশে ১.৯৮ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ক্যাপসুলের আবরণও আমদানি করা হয়েছিল।
রপ্তানি সামান্য হলেও সামনে অপেক্ষা করছে বড় বাজার
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুসারে, ২০২২-২৩ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশ সাতটি দেশে প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার ৪৪৬ ডলার মূল্যের জেলটিনের খালি ক্যাপসুল রপ্তানি করেছে। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা বিনিময় মূল্য ধরে হিসাব করলে বর্তমান বাজারে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২.৪০ কোটি টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছরে এই রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৭২ হাজার ৪০৮ ডলার, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৫২৫ ডলারে এবং এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে হয় ৬৭ হাজার ১৮৯ ডলার। সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও ২৩ হাজার ৩২৪ ডলারের খালি ক্যাপসুল রপ্তানি হয়।
বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানির তুলনায় এই অর্থের পরিমাণ খুবই সামান্য। তবে রপ্তানির গন্তব্য যেভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, তা এই খাতের বিকাশমান বাজারের ইঙ্গিত দেয়।
২০২২-২৩ অর্থবছরে খালি ক্যাপসুলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল মালয়েশিয়া, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পাকিস্তান ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জার্মানি। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সবচেয়ে বড় গন্তব্য হিসেবে মেক্সিকোর নাম উঠে আসে; মোট রপ্তানির ৯৪ শতাংশই গেছে এদেশে।
খালি ক্যাপসুলের বৈশ্বিক বাজারের আকার ২০২৫ সালের ৩.১৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০৩০ সাল নাগাদ ৪.১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ সময়ে বাজারটি বছরে ৫.৬ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে বড় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাজার গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মার্কেটসঅ্যান্ডমার্কেটস-এর এক গবেষণা অনুযায়ী, 'নিউট্রাসিউটিক্যালস (পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান) ও মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি বিশেষ সাপ্লিমেন্টের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, ওষুধ শিল্পের গবেষণা ও উন্নয়নের (আরঅ্যান্ডডি) প্রসার এবং ফাংশনাল ও মডিফায়েড-রিলিজ ক্যাপসুলের ক্ষেত্রে নতুন সব উদ্ভাবন' এই বাজারকে সামনের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, 'নিরামিষ ও স্বাস্থ্যসম্মত উপাদানের দিকে মানুষের ব্যাপক ঝোঁক এবং পরিবেশবান্ধব নীতিমালার কারণে এর গ্রহণযোগ্যতা আরও দ্রুত বাড়ছে'।
তাদের মতে, উদীয়মান বাজারগুলোতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন এবং পরিবেশে সহজে মিশে যায়, এমন ক্যাপসুলের উন্নয়ন থেকেই এই খাতের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। সূত্র: টিবিএস প্রতিবেদন