শিরোনাম
◈ পোশাকের পর যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানি পণ্য ফুটওয়্যার, এক বছরে রপ্তানি বেড়েছে ৫২% ◈ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে ঢাকায় আসছে ভারতের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল ◈ ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিতের রিটে আদেশ মঙ্গলবার ◈ জ্যো‌তি‌কে অ‌ধিনায়ক ক‌রে এশিয়া কাপ ও এশিয়ান গেমসের জন‌্য বাংলা‌দেশ নারী দল ঘোষণা  ◈ জ্বালানি সংকট দূর করতে নেওয়া হচ্ছে তিন পরিকল্পনা: সেতুমন্ত্রী ◈ পদোন্নতি পেয়ে উপসচিব হলেন ২৭৭ কর্মকর্তা ◈ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নতুন আশার আলো, স্বীকৃতি দিল মিয়ানমার ◈ ভারতীয় ভিসা নিয়ে হাইক‌মিশনের জরুরি সতর্কবার্তা ◈ ৮৪৫ কোটি টাকায় বার্সেলোনায় রদ্রি ◈ ঢাকা-চট্টগ্রামসহ চার রুটে লংমার্চ, সর্বাত্মক সফলতার আহ্বান জামায়াতের

প্রকাশিত : ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৮:৩৬ রাত
আপডেট : ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

পোশাকের পর যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানি পণ্য ফুটওয়্যার, এক বছরে রপ্তানি বেড়েছে ৫২%

ফ্যাশন ও দৈনন্দিন জীবনে জুতা ব্যক্তিত্ব, রুচি ও স্বাচ্ছন্দ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়ের সঙ্গে জুতার নকশা, মান ও বৈচিত্র্যের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহও বেড়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বাজারে দেশি-বিদেশি নানা ব্র্যান্ডের জুতার রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। সেই চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ। আধুনিক নকশা, মানসম্মত উপকরণ ও প্রতিযোগিতামূলক দামের কারণে বাংলাদেশের তৈরি জুতা জায়গা করে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায়।

ফুটওয়্যার ডিস্ট্রিবিউটর্স অ্যান্ড রিটেইলার্স অব আমেরিকার (এফডিআরএ) তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৫ সালে জুতা বিক্রির বার্ষিক মূল্য ১২১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। একই বছরে দেশটি মাথাপিছু প্রায় ছয় জোড়া করে জুতা আমদানি করেছে।

বিশাল এ বাজারের সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান এখনো ছোট। তবে গত বছর দেশটির বাজারে বাংলাদেশের তৈরি জুতার প্রবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের আওতাধীন দপ্তর দি অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলসের (ওটিইএক্সএ) প্রকাশিত হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফুটওয়্যার রফতানি হয়েছে ৩৮ কোটি ৭৭ লাখ ২০ হাজার ডলারের, আগের বছর যা ছিল ২৫ কোটি ৫২ লাখ ১০ হাজার ডলার। প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫২ শতাংশ।

বাংলাদেশের জন্য এ বাজারের গুরুত্ব শুধু প্রবৃদ্ধির হারেই নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পূর্ণ ১২ মাসের রফতানি তথ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে ফুটওয়্যারের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।

দ্বিতীয় শীর্ষ রফতানি পণ্য হিসেবে ফুটওয়্যার

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে ১২২ কোটি ২৭ লাখ ৮৪ হাজার ৬০৯ ডলারের ফুটওয়্যার রফতানি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গেছে ৩৮ কোটি ৬৮ লাখ ৩৪ হাজার ১৪৭ ডলারের। অর্থাৎ বাংলাদেশের মোট ফুটওয়্যার রফতানির প্রায় ৩১.৬৪ শতাংশের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র।

আর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের দিকে তাকালে ফুটওয়্যারের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। একই অর্থবছরে দেশটিতে মোট ৯০৪ কোটি ৮০ লাখ ৪৬ হাজার ৮৩৯ ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ফুটওয়্যারের অংশ ৪.২৭ শতাংশ। অর্থমূল্যের বিচারে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের মধ্যে ফুটওয়্যারের অবস্থান দ্বিতীয়, পোশাকের (নিট ও ওভেন) পর।

ফুটওয়্যারের এ বাজারের ভেতরেও বড় পরিবর্তন ঘটছে। চামড়ার জুতার পাশাপাশি রাবার, প্লাস্টিক, সিনথেটিক ও টেক্সটাইলের তৈরি জুতার চাহিদাও বাড়ছে। বাংলাদেশ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘অন্যান্য ফুটওয়্যার’ বা চামড়াবহির্ভূত জুতা রফতানি হয়েছে প্রায় ৫৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের। তবে আগের বছরের তুলনায় এ অংশের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১.৬ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিক খাতের প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি চামড়াবহির্ভূত জুতায় গতি ধরে রাখাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

মার্কিন ক্রেতার সোর্সিংয়ে বদল

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের ফুটওয়্যারের সাম্প্রতিক উত্থানের পেছনে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনও ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে চীন থেকে সোর্সিং কমিয়ে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছেন মার্কিন ক্রেতারা। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ফুটওয়্যার আমদানি ছিল ২ হাজার ৫১২ কোটি ডলার। এর মধ্যে ভিয়েতনাম একাই সরবরাহ করেছে ৯৪৩ কোটি ডলারের জুতা। চীন থেকে আমদানি কমে ৬০০ কোটি ডলারে নেমেছে। একই সময়ে ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও ভারত থেকেও আমদানি বেড়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ পরিবর্তনের সুযোগ আরও স্পষ্ট। মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের জুতার রফতানি ২০২৫ সালে ৫২ শতাংশ বাড়লেও এর পরিমাণ এখনো ভিয়েতনাম, চীন কিংবা ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় অনেক ছোট। অর্থাৎ বাজারে প্রবেশের জায়গা তৈরি হয়েছে, কিন্তু বাজার দখল করার বিষয়টি এখনো অনেক দূরের পথ।

বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য ও বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্যেও যুক্তরাষ্ট্রকে চামড়া ও ফুটওয়্যার খাতের অন্যতম প্রধান বাজার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চামড়াজাত ফুটওয়্যার রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ প্রায় ৩২ শতাংশ বলে সরকারি একটি খাতভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে ফিলা, এইচঅ্যান্ডএম ও ডেকাথলনের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের চামড়াবহির্ভূত ফুটওয়্যার সোর্সিংয়ের কথাও উঠে এসেছে।

স্টোরের তাক থেকে কারখানার উৎপাদন লাইনে

যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দোকানের তাকের একটি জুতার সঙ্গে বাংলাদেশের একটি কারখানার উৎপাদন লাইনের সম্পর্ক তৈরি হয় বহু ধাপ পেরিয়ে। নকশা, নমুনা অনুমোদন, কাঁচামাল, উৎপাদন, মান পরীক্ষা, প্যাকেজিং ও সময়মতো জাহাজীকরণ, প্রতিটি ধাপেই ক্রেতার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে হয়।

বাংলাদেশের বড় রফতানিকারকদের একটি হলো এপেক্স ফুটওয়্যার। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্যানুযায়ী, তারা মূলত অরিজিনাল ডিজাইন ম্যানুফ্যাকচারিং বা ওডিএম মডেলে কাজ করে এবং বাংলাদেশ থেকে চামড়ার জুতা রফতানিতে নিজেদের শীর্ষস্থানীয় অবস্থানের কথা জানিয়েছে। তাদের উৎপাদন ব্যবস্থায় পাঁচটি অ্যাসেম্বলি লাইন রয়েছে, যেখানে প্রতি শিফটে ৫ হাজার ৫০০ জোড়া পর্যন্ত উৎপাদন সক্ষমতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তর আমেরিকার বাজারে তাদের অংশীদারত্বের কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

চামড়ার জুতায় এখনো বড় শক্তি বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে চামড়ার জুতা থেকে। ২০২৫ সালে দেশটিতে বাংলাদেশ থেকে রফতানি হওয়া ৩৮ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের ফুটওয়্যারের মধ্যে ৩৪ কোটি ৩৭ লাখ ডলারই ছিল চামড়াজাত ফুটওয়্যার।

এর অর্থ বাংলাদেশের প্রচলিত শক্তি এখনো চামড়ার জুতায়। কিন্তু ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির বড় ক্ষেত্র হতে পারে চামড়াবহির্ভূত ফুটওয়্যার। কারণ বিশ্বব্যাপী স্পোর্টস, ক্যাজুয়াল ও লাইফস্টাইল জুতার বাজারে সিনথেটিক, টেক্সটাইল, রাবার ও প্লাস্টিকভিত্তিক উপকরণের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

বাংলাদেশেও এ সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। সরকারি খাতভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত এক দশকে চামড়াবহির্ভূত ফুটওয়্যার খাতের রফতানি ১২০ শতাংশ বেড়েছে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি থমকে প্রায় ১.৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হলেও বাংলাদেশের কারখানাগুলোকে এখন আরও বেশি ধরনের জুতা তৈরি এবং উচ্চমূল্যের সেগমেন্টে যাওয়ার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।

শুল্ক ও লিড টাইমের পরীক্ষাও বড়

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জুতার চাহিদা বাড়লেও প্রতিযোগিতার জায়গাটি সহজ নয়। শিল্পসংশ্লিষ্টরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের লিড টাইম, কাস্টমস প্রক্রিয়া, জ্বালানি ও অবকাঠামো, কাঁচামালের প্রাপ্যতা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়কে বড় বাধা হিসেবে তুলে ধরছেন।

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের ফুটওয়্যার রফতানি বাড়ার পরও শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আরও বড় বাজার ধরতে হলে স্পিড টু মার্কেট বাড়াতে হবে। কাস্টমস প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ সহজ করা না গেলে বাড়তি অর্ডারের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।

এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ফুটওয়্যার লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জুতা খাতের সম্ভাবনার পাশাপাশি কাঁচামাল, মূল্য নির্ধারণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিষয়গুলো সামনে এনেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে জুতা খাতে বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধির উল্লেখ করে তিনি চীন থেকে সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনের সুযোগ কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

মার্কিন বাজারে সুযোগ, বাংলাদেশে প্রস্তুতির চাপ

যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বাজারে ক্রেতা এখন একদিকে দাম ও অন্যদিকে মান, নকশা ও ব্যবহারিক সুবিধা বিবেচনা করে জুতা কিনছেন। বাজারটিতে বড় ব্র্যান্ডগুলোর আধিপত্য রয়েছে। ২০২৫ সালে নাইকি, অ্যাডিডাস ও স্কেচার্স মিলে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটওয়্যার খুচরা বাজারের প্রায় ২৪ শতাংশ দখলে রেখেছে। একই সঙ্গে অন রানিং ও সালোমনের মতো নতুন ব্র্যান্ডও বাজারে নিজেদের জায়গা তৈরি করছে।

এ বাজারের জন্য তাই বাংলাদেশকে শুধু বেশি জুতা তৈরি করলেই হবে না। ক্রেতার পরিবর্তিত পছন্দ অনুযায়ী দ্রুত নতুন নকশা তৈরি, ছোট ও মাঝারি আকারের অর্ডার দ্রুত সরবরাহ, টেকসই কাঁচামাল ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স বজায় রাখার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রফতানি পরিসংখ্যান বলছে, ফুটওয়্যার এখন আর কেবল চামড়া শিল্পের একটি উপখাত নয়। অর্থমূল্যে এটি দেশের অন্যতম বড় রফতানি পণ্য। যুক্তরাষ্ট্রে এর অবস্থান তৃতীয়। ফলে মার্কিন বাজারে ফুটওয়্যারের এ সম্প্রসারণ ধরে রাখতে পারলে তৈরি পোশাকনির্ভর রফতানি কাঠামোর বাইরে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় নতুন প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

সূত্র : বণিক বার্তা

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়