শিরোনাম
◈ পদোন্নতি পেয়ে উপসচিব হলেন ২৭৭ কর্মকর্তা ◈ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নতুন আশার আলো, স্বীকৃতি দিল মিয়ানমার ◈ ভারতীয় ভিসা নিয়ে হাইক‌মিশনের জরুরি সতর্কবার্তা ◈ ৮৪৫ কোটি টাকায় বার্সেলোনায় রদ্রি ◈ ঢাকা-চট্টগ্রামসহ চার রুটে লংমার্চ, সর্বাত্মক সফলতার আহ্বান জামায়াতের ◈ প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ প্রিন্স সালমানের ◈ কৃষিতে ঋণ বিতরণে ব্যাংকের বাধ্যবাধকতা বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক ◈ হাম উপসর্গে বাড়ছে মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ গেল আরও ৭ জনের ◈ জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে আরও সময় লাগবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ মেয়ের বিয়ের বাজারের টাকা হারিয়ে ফেললেন বাবা, পেয়ে ফিরিয়ে দিলেন পুলিশ

প্রকাশিত : ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:৫৬ বিকাল
আপডেট : ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:২৬ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নারায়ণগঞ্জে তৈরি উচ্চমূল্যের বিয়ের পোশাক যাচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকাসহ ৩৭ দেশে

আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) একটি কারখানায় বাংলাদেশি কর্মীরা তৈরি করছেন উচ্চমূল্যের বিয়ের গাউন ও সংশ্লিষ্ট সামগ্রী। এসব পণ্য রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাজারগুলোতে।

জার্মান বিনিয়োগে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেড ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে এই ইপিজেডে বিয়ের পোশাক তৈরি করছে। কারখানাটিতে বিভিন্ন ডিজাইনের ওয়েডিং গাউনের পাশাপাশি এক্সক্লুসিভ অ্যাকসেসরিজ, সাটিন ও লেসের পোশাক, বিয়ের ঘোমটা (ভেইল), পেটিকোট, স্যুট, জ্যাকেট, বোলেরো ও গয়না তৈরি করা হয়।

প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তাদের কার্যক্রম শুরু করে। এখন সেখানে ৩৫৭ জন কর্মী কাজ করছেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৫.২৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। চলতি অর্থবছরে তাদের রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ৮-৯ মিলিয়ন ডলার।

প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত পণ্য প্রথমে জার্মানিতে পাঠানো হয়। এরপর সেখান থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের প্রায় ৩৭টি দেশে সরবরাহ করা হয়। এই পুরো সরবরাহ প্রক্রিয়ায় প্রতিটি পোশাকে অটুট থাকে 'মেইড ইন বাংলাদেশ' পরিচয়।

বিদেশের বাজারে এসব বিয়ের পোশাক ৪০০-৫০০, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১ হাজার ডলারেও বিক্রি হয়। তবে বাংলাদেশ থেকে তৈরি হওয়া বেশিরভাগ বিয়ের পোশাকের দাম ৪০০ থেকে ৫০০ ডলারের মধ্যেই থাকে।

ইউবিএফ ব্রাইডালের চিফ অপারেটিং অফিসার মো. রবিউল হক সিদ্দিকী টিবিএসকে বলেন, এসব বিশেষায়িত বিয়ের পোশাক তৈরি করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে শুরুতে অভিজ্ঞ কর্মী ও ম্যানেজারের সংকটে পড়তে হয়েছিল।

তিনি বলেন, 'আমরা যখন বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করি, তখন এ ধরনের বিশেষায়িত ব্রাইডাল পোশাক তৈরিতে অভিজ্ঞ কর্মী পাওয়া যাচ্ছিল না। এমনকি এ ধরনের কাজে অভিজ্ঞ ম্যানেজারও পাওয়া কঠিন ছিল। তাই শুরুতে আমাদের নিজেদের উদ্যোগেই কর্মী ও ম্যানেজারদের প্রশিক্ষণ দিতে হয়েছে।' 

একটি ব্রাইডাল গাউন সাধারণত ডিজাইন অনুযায়ী কয়েকটি আলাদা অংশে তৈরি করা হয়। ওপরের বডিস, করসেট, স্কার্ট ও ট্রেনসহ বিভিন্ন অংশে সূক্ষ্ম লেস, ফুল ও অন্যান্য অলংকার সেলাই করে পরে সেগুলো একে একে জুড়ে দেওয়া হয়। কাপড়ের ওপর ছোট ছোট ফুলের কারুকাজ আর নিপুণ সেলাইয়ে ধীরে ধীরে পূর্ণতা পায় একটি বিয়ের পোশাক। 

সম্প্রতি কারখানাটি পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকরা কেউ মেশিনে কাপড় সেলাই করছেন, কেউ লেস ও অন্যান্য অলংকার সংযুক্ত করছেন। কেউ পোশাকের গুণগত মান পরীক্ষা করছেন, আবার কেউ রপ্তানির জন্য তৈরি পোশাক প্যাকেজিং করছেন। 

পাঁচতলা ভবনে অবস্থিত এই কারখানা মাত্র একটি প্রোডাকশন লাইন নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এখন তাদের প্রোডাকশন লাইনের সংখ্যা আট। আগামীতে এই সংখ্যা ১০ থেকে ১৩টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির, যেখানে প্রতিটি লাইনে প্রায় ২৩ জন করে অপারেটর কাজ করবেন।

বিয়ের পোশাকের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। এর অংশ হিসেবে আগামী দুই বছরের মধ্যে কারখানায় আরও ৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা আছে তাদের।

রবিউল জানান, সাধারণ পোশাকের তুলনায় বিয়ের পোশাকে ব্যবহৃত কাপড় অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে।

তিনি বলেন, 'ফ্যাব্রিক খুবই নরম; লাইনিং ও অর্গানজার মতো কাপড়ও রয়েছে। এগুলো খুব সতর্কতার সঙ্গে ও বিশেষ দক্ষতায় হ্যান্ডেল করতে হয়। তাই একজন নতুন কর্মীকে সরাসরি উৎপাদন লাইনে না দিয়ে প্রথমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সাধারণত প্রায় তিন মাস প্রশিক্ষণের পর তাকে উৎপাদন লাইনে যুক্ত করা হয়।'

কারখানাটিতে প্রায় তিন বছর ধরে কাজ করছেন খাদিজা বেগম। খাদিজা জানান, তিনি লেস ফিটিংয়ের কাজ করেন। এ কাজ শুরুর আগে তিনি প্রায় পাঁচ মাস প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।  এখানে চাকরি শুরুর সময় তার বেতন ছিল ১০ হাজার ৪০০ টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ১৯ হাজার ৩০০ টাকা।

চাঁদপুর থেকে কাজের জন্য এসেছেন শিখা আক্তার। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে তিনি এখানে চাকরি করছেন। শিক্ষা অডিটের কাজ করেন—পোশাক ঠিকভাবে তৈরি হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করেন। তিনি বলেন, 'এখানে কাজের পরিবেশ অনেক ভালো। এসির ভেতরে কাজ করি, সুযোগ-সুবিধাও ভালো।'

ইউবিএফের পোল্যান্ডেও কারখানা রয়েছে। রবিউল জানান, পোল্যান্ডে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কিছু পণ্য বাংলাদেশে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। ইতিমধ্যেই পোল্যান্ড থেকে প্রশিক্ষকরা বাংলাদেশে এসে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। 

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি ডিজাইনারদের তৈরি নকশায় পোশাক তৈরি করলেও ভবিষ্যতে দেশের স্থানীয় ডিজাইনারদের দিয়ে বিয়ের পোশাক তৈরিরও পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া দেশে এমব্রয়ডারি ও লেসের উৎপাদন বাড়িয়ে স্থানীয় বাজার থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে জুতা তৈরিরও পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের তথ্যানুসারে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে বিয়ের পোশাকের বাজারের আকার ছিল ৮২.৪ বিলিয়ন ডলার।  ২০৩০ সালের মধ্যে এ বাজারের আকার ১০৯.৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মানুষের ব্যয়যোগ্য আয় বৃদ্ধি এবং বিলাসবহুল ও কাস্টমাইজড বিয়ের পোশাকের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজারের আকার বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি ১৩.৫ শতাংশ হারে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

আদমজী ইপিজেডের ক্রমবর্ধমান রপ্তানি ভিত্তি

ঐতিহাসিক আদমজী জুট মিলের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর এর বিশাল শিল্পভূমিকে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নেয় সরকার। সেই জমিতেই ২০০৬ সালে যাত্রা শুরু করে আদমজী ইপিজেড। 

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত আদমজী ইপিজেডের আয়তন ২৯২.৬২ একর। গত দুই দশকে এখানে উচ্চমূল্যের পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পের একাধিক কারখানা গড়ে উঠেছে।

বেপজার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আদমজী ইপিজেডে ৭৬ হাজার ২৭ জন মানুষ কাজ করছেন। এই ইপিজেডে এখন পর্যন্ত ৮৪৭.০৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এসেছে। 

এখানকার কারখানাগুলো থেকে এ পর্যন্ত মোট ১১.১৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই ইপিজেডের কারখানাগুলো টমি হিলফিগার, রালফ লরেন, মাইকেল কর্স ও ভ্যান হিউসেনের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের জন্য উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরি করছে।

বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পোশাকের চাহিদা বাড়ায় আদমজী ইপিজেডে ব্রাইডাল ড্রেস উৎপাদনের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য নতুন বাজার ও উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি করছে।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়