শিরোনাম
◈ সিঙ্গাপুর শীর্ষে, সম্ভাবনার বন্দর চট্টগ্রাম কেন বিশ্বসেরার তালিকায় নেই? উঠে এলো নানা কারণ ◈ কুয়েতে বাসস্থান হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বাংলাদেশি শ্রমিকরা, ৫০ ডিগ্রি তাপদাহে চরম দুর্ভোগ ◈ ফিফাকে টাকা পরিশোধের পরও ১৪০ কোটি টাকার অনিয়ম: সাবেক সরকারের বিরুদ্ধে তথ্যমন্ত্রীর অভিযোগ ◈ বেসরকারি স্কুল-কলেজে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য বড় সুখবর! ◈ বিশ্লেষণে নতুন সতর্কবার্তা: চীনের ৫০০ স্টেলথ যুদ্ধবিমানের বিপরীতে ভারতের হাতে নেই একটিও ◈ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট নিরাপত্তা জোরদার, সীমানা অতিক্রম করলেই বাজবে অ্যালার্ম ◈ চট্টগ্রামে বন্যার পানিতে নতুন আতংক সাপ, কামড়ের শিকার ১১৮ জন! ◈ স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে যে দেশের সরকার ◈ এবার জুলাইয়ের ভুয়া মামলা ঘটনায় ফাঁসছেন বাদীরা! ◈ ‌ডোনাল্ড ট্রা‌ম্পের স্বাক্ষ‌রের মূল‌্য নেই! সমঝোতা বাতিল? অন্তরাল থেকে মুখ খুললেন স‌র্বোচ্চ নেতা মোজতবা, মার্কিন বাহিনীকে হুঁশিয়ারি 

প্রকাশিত : ১৮ জুলাই, ২০২৬, ১০:৫৩ দুপুর
আপডেট : ১৯ জুলাই, ২০২৬, ১১:১২ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

শতাধিক কারখানা বন্ধ, তবু সরকারি নীতিতে আসছে নতুন বিনিয়োগ

ব্যাপক কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের পোশাক খাত। বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, গত ছয় মাসে দেশে ১০০-র বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই হয়েছে আরও অন্তত ৫০টি কারখানায়। এতে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষ। তবে কারখানা বন্ধের এই হিড়িকের মধ্যেও আশাব্যঞ্জক চিত্র দেখা গেছে। ব্যাংকঋণ নির্ভরতা এড়িয়ে একদল নতুন উদ্যোক্তা ও বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রায় ৭০টি নতুন কারখানায় কার্যক্রম শুরু করেছে বা চালুর অপেক্ষায় রয়েছে। এতে নতুন প্রায় ৬০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

অবশ্য বন্ধ হওয়া কারখানায় যে পরিমাণ শ্রমিক বেকার হয়েছেন, নতুন করে বিনিয়োগে আসা কারখানাগুলো সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না বলে জানিয়েছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। তা সত্ত্বেও আশা বাড়ছে। খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সরকার দায়িত্বে আসার পর বাজেট এবং এর আগে-পরে যেসব নীতিমালা নিয়েছে, তাতে বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা গেছে। 

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, বাজারে নতুন প্রতিষ্ঠান আসা এবং পুরনো প্রতিষ্ঠানের বিদায় নেওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। 

তিনি টিবিএসকে বলেন, 'কিন্তু গত দুই বছর ধরে শ্রমিক কমার প্রবণতা চলছে—এবং সর্বশেষ ছয় মাসে এসে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে।' 

তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন সরকার বন্ধ শিল্পকে চালু করতে ফান্ডিং, নগদ প্রণোদনা বাড়ানোসহ অন্যান্য যেসব পতখেপ নিয়েছে, তার প্রভাবে আগামী দিনগুলোতে কারখানা বন্ধের হার কমতে পারে। সেইসঙ্গে নতুন কারখানাও চালু হতে পারে বেশি।

বড় গ্রুপগুলোর সম্প্রসারণ, আসছে নতুন প্রযুক্তি

আগে পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি মূলত প্রাথমিক গার্মেন্ট অ্যাসেম্বলির ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু নতুন বিনিয়োগে ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দামি অ্যাকসেসরিজ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই নতুন ধারায় নেতৃত্ব দিচ্ছে এনভয় গ্রুপ ও হা-মীম গ্রুপের মতো এ খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। সেইসঙ্গে নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে ডিবিএল গ্রুপেরও। এনভয় গ্রুপ ইতিমধ্যেই সুতা ও ম্যান-মেইড ফাইবারের (কৃত্রিম তন্তু) দুটি নতুন কারখানায় বিনিয়োগ করছে। দিনে প্রায় ৪০ টন উৎপাদন সক্ষমতার এই ইউনিট দুটিতে নতুন করে ৫০০ জনের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

এনভয় টেক্সটাইলের কোম্পানি সেক্রেটারি এম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সরকারের সাম্প্রতিক কিছু নীতির কারণে তারা মনে করছেন দেশি ইয়ার্নের চাহিদা বাড়বে। 'এছাড়া এটি প্রয়োজনীয় পণ্য বলে বৈশ্বিকভাবে চাহিদা কমার কারণ নেই। বাংলাদেশ থেকেও আগামী দুই দশকে এই ব্যবসা কমার সম্ভাবনা দেখি না,' বলেন তিনি।

সাইফুল আরও বলেন, চীন এখন বেসিক পোশাক থেকে বের হয়ে প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনে মনোযোগ বাড়াচ্ছে। ফলে পোশাকের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা ঘুরেফিরে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতেই আসবে। 'এছাড়া আমাদের নিজেদের প্রচুর ইয়ার্নের প্রয়োজন হয়, যা বাইরে থেকে না কিনে নিজেদের প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করবে।'

একইভাবে নরসিংদীতে একটি পুরনো পাটকলের জমিতে চীনা অংশীদারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে সম্প্রতি হা-মীম চিং তাই পকেটিং অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ নামক একটি বড় কারখানা খুলেছে হা-মীম গ্রুপ'। ২০০ জন কর্মী নিয়ে সেখানে উৎপাদন শুরু হয়েছে। পুরোদমে চালু হলে এখানে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। জুনে এই কারখানার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কে আজাদ বলেছিলেন, এই কারখানা স্থাপনের ফলে লিড টাইম (পণ্য সরবরাহের সময়) অনেকটাই কমে আসবে। পাশাপাশি আমদানি বাবদ ডলার ব্যয় হবে না। এছাড়া অ্যাকসেসরিজ রপ্তানি থেকে ডলার আসবে দেশে।

ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার টিবিএসকে জানান, অন্তর্বাস ও পোশাকের অ্যাকসেসরিজ তৈরিতে তারা নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন।

এদিকে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্যমতে, গত ছয় মাসে ৪৪টি কারখানা উৎপাদনে এসেছে, যার বেশিরভাগই ছোট ও মাঝারি আকারের। 

নতুন বিনিয়োগ এলেও কর্মী ছাঁটাই অব্যাহত

বিজিএমইএ, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন' (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ১০০-র বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে বেকার হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক। 

আর একই সময়ে চালু হওয়া ৭০টি কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে বা হওয়ার অপেক্ষায় আছে ৬০ হাজার শ্রমিকের। 

অন্যদিকে একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে বন্ধ হয়েছে ৭৯টি কারখানা। যদিও এই সময়ে চালু হওয়া কারখানার সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি সেখানে। 

ওই একই সংস্থার তথ্য বলছে, পোশাক শিল্পের বাইরের অন্যান্য ক্ষেত্র ধরলে, গত দুই বছরে সবমিলিয়ে ৪৫৭টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে কত শ্রমিক বেকার হয়েছেন, কিংবা একই সময়ে নতুন কত কারখানা চালু হয়েছে বা কত শ্রমিক কাজ পেয়েছেন—সে তথ্য নেই। 

বিজিএমইএর তথ্যানুসারে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত অন্তত ২৩টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে, আর প্রায় ৫৭টি কারখানা কার্যাদেশ কমে যাওয়ায় শ্রমিক ছাঁটাই করেছে। সবমিলিয়ে এই ৮০টি কারখানা থেকে কর্মহীন হয়েছেন প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক। 

অবশ্য একই সময়ে নতুন করে ৪৪টি কারখানা উৎপাদনে এসেছে, যেখানে ১৬ হাজারের মতো নতুন শ্রমিকের কাজের ব্যবস্থা হয়েছে। 

বিকেএমইএর তথ্যমতে, গত ছয় মাসে যে পরিমাণ নিটওয়্যার কারখানা নতুন চালু হয়েছে, বন্ধ হয়েছে তার চেয়ে বেশি। এতে বেকার হয়েছেন প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক। তবে এর মাঝেই নতুন বিনিয়োগের সুবাদে প্রায় ১০ হাজার কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে।

বিটিএমএ বলছে, গত ছয় মাসে অন্তত ৬২টি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়েছে, যার ফলে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়েছেন। একই সময়ে ১৪টি কারখানা নতুন করে উৎপাদনে এসেছে, যেখানে নতুন প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। 

এর বাইরে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএপিএমইএ) সদস্যভুক্ত অন্তত ২০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, যেখানে আরও ২ হাজারের হাজারের বেশি শ্রমিক বেকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি মো. শাহরিয়ার।

নতুনরা আসছেন আশা নিয়ে, ব্যাংকঋণ-নির্ভরতা এড়িয়ে

ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা দেখা যাচ্ছে নতুন বিনিয়োগে আসা উদ্যোক্তাদের মধ্যে। 

স্টাইলোমোর লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াহিয়া খান এ শিল্পে প্রায় ১২ বছর কাজ করেছেন। এরপর অংশীদারদের সঙ্গে নিজস্ব মূলধন মিলিয়ে ভাড়া ভবনে মাঝারি পরিসরে কারখানা চালু করেছেন তিনি। 

ইয়াহিয়া টিবিএসকে বলেন, 'আশাবাদী হয়েই আমরা এই ব্যবসায় এসেছি। ছোট করে শুরু করেছি, কিন্তু ব্যাংকঋণ নিইনি। আমরা ক্রয়াদেশ পেতে শুরু করেছি। আশা করছি সফল হব।'

একই পথে হেঁটেছেন ফ্যাশন ফ্লোর বিডি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জসিম উদ্দিন। নিজস্ব সঞ্চয় ও পারিবারিক অর্থায়নের সাহায্যে নিজস্ব ভবনে ৯৫০ কর্মী নিয়ে কারখানা খুলেছেন তিনি।

জসিম বলেন, 'আমরা ব্যাংকঋণে যাইনি। বর্তমানে ব্যাংকঋণের সূদের হার প্রায় ১৫ শতাংশ, কিন্তু মুনাফা হয় এর অর্ধেকেরও কম। এজন্য ব্যাংকঋণ নিয়ে গার্মেন্টস ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন হবে।'

সরকারের পলিসিতে আস্থা ফিরছে, তবে বিনিয়োগকারীরা বাস্তবায়ন চান

এ খাতের নেতারা বলছেন, সরকারের নেওয়া বেশ কিছু বিনিয়োগবান্ধব পদক্ষেপ ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়িয়েছে। তবে টেকসই নতুন বিনিয়োগের জন্য এই উদ্যোগের যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তারা। 

বন্ধ হয়ে যাওয়া পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানা চালু করতে বাজেটে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া গত রোববার স্থানীয় ইয়ার্ন ব্যবহার করে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে নগদ প্রণোদনা ১.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। অন্যদিকে করছাড়ও দেওয়া হয়েছে কিছু খাতের জন্য। 

এসব কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। তবে এখনো অনেক কাজ বাকি বলে মনে করছেন তারা। 

ডিবিএল গ্রুপের এম এ জব্বার বলেন, 'সরকার, বিশেষত প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা আছে, তা পরিষ্কার। সম্প্রতি আমরা এর কিছু প্রতিফলনও দেখেছি, যা আমাদের মধ্যে আস্থা তৈরি করেছে।

'তবে এর প্রভাব দৃশ্যমান হতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করি। আর আমরা নীতি ঘোষণার পাশাপাশি যথাযথ বাস্তবায়নও দেখতে চাই।'

সূত্র: দ্য বিসনেস স্ট্যান্ডার্ড 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়