বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রফতানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও অন্যান্য পণ্য রফতানি হয় দেশটিতে। এমন বাস্তবতায় আবারও নতুন শুল্কের ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশের রফতানি খাত। জোরপূর্বক শ্রমে (ফোর্সড লেবার) উৎপাদিত পণ্য বা কাঁচামালের আমদানি প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতর (ইউএসটিআর)।
যদিও এই প্রস্তাব এখনও চূড়ান্ত হয়নি, তবে এটি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নতুন করে চাপে পড়তে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ অতিরিক্ত শুল্কের অর্থ শেষ পর্যন্ত মার্কিন আমদানিকারকদেরই পরিশোধ করতে হবে— যা বাংলাদেশি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কম শুল্কের দেশগুলোর দিকে ঝুঁকতে পারেন।
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি নতুন শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতির বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ভবিষ্যতে কোনও দেশের বাজারে প্রবেশাধিকার শুধু শুল্কহার দিয়ে নয়, বরং শ্রম অধিকার, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা, মানবাধিকার এবং শিল্পনীতির মতো বিষয় দিয়েও মূল্যায়ন করা হবে।
মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ শুনানি: প্রস্তাবিত শুল্ক নিয়ে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) প্রকাশ্য শুনানি করবে ইউএসটিআর। এর আগে আজ সোমবার (৬ জুলাই) পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দেশ, ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও অংশীজনদের লিখিত মতামত জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
শুনানিতে উপস্থাপিত তথ্য, লিখিত মতামত ও বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করে ইউএসটিআর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। তদন্ত শেষে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে কিনা, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে।
বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই শুনানি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানেই বাংলাদেশ তার শ্রমমান, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের বিষয়ে শক্তিশালী অবস্থান তুলে ধরতে পারতো।
শুনানিতে অংশ নিচ্ছে না বাংলাদেশ: সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইউএসটিআরের এই প্রকাশ্য শুনানিতে বাংলাদেশ সরকার অংশ নিচ্ছে না। সরকারের অবস্থান হলো— প্রকাশ্য শুনানির পরিবর্তে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনার মাধ্যমেই বিষয়টির সমাধান করা হবে।
তবে অনেক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যখন সরাসরি জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের অভিযোগ নেই, তখন শুনানিতে অংশ নিয়ে তথ্য-উপাত্তসহ দেশের অবস্থান তুলে ধরা হলে তা ইতিবাচক বার্তা দিতো। এতে তদন্ত প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের যুক্তিগুলো আরও শক্তিশালীভাবে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হতো।
কেন নতুন করে তদন্ত: গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। ইউএসটিআরের অভিযোগ, এসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য বা কাঁচামালের আমদানি নিষিদ্ধ করতে কিংবা কার্যকরভাবে সেই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে।
সংস্থাটির ভাষ্য, এ কারণে মার্কিন শ্রমিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান অন্যায্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ প্রয়োজন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, যেসব দেশ আংশিক বা পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তাদের ওপর ১০ শতাংশ এবং যেসব দেশ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি, তাদের ওপর সাড়ে ১২ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। যদিও দেশভিত্তিক চূড়ান্ত হার প্রকাশ করা হয়নি, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে।
বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ কতটা বাস্তব?: বাংলাদেশ সরকার এবং তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা শুরু থেকেই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। তাদের দাবি, দেশের কোনও রফতানিমুখী শিল্পে জোরপূর্বক শ্রমের চর্চা নেই। বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য বা কাঁচামাল আমদানি করে না বাংলাদেশ। এমনকি তৈরি পোশাক শিল্পসহ কোনও খাতেই জোরপূর্বক শ্রমের চর্চা নেই।’’
তার মতে, আন্তর্জাতিক ক্রেতা, আইএলও, বিভিন্ন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের কঠোর কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম নজরদারির আওতায় থাকা শিল্প।
‘বাংলাদেশের প্রতি ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে’: বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশ বরাবরই বলে আসছে, আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প বা অন্য কোনও রফতানিমুখী খাতে জোরপূর্বক শ্রমের কোনও চর্চা নেই। আন্তর্জাতিক শ্রমমান ও ক্রেতাদের কমপ্লায়েন্স মানদণ্ড মেনেই আমাদের শিল্প পরিচালিত হচ্ছে। তাই আমরা মনে করি, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বাংলাদেশের প্রতি ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে।’’
তিনি বলেন, ‘‘এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র যথাযথভাবে তুলে ধরা। সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা, শ্রম আইন বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের বিষয়ে তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা দিলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।’’
ট্রাম্পের নতুন বাণিজ্য কৌশল: বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এখন শুল্ককে শুধু রাজস্ব আহরণের উপায় হিসেবে নয়, বরং বাণিজ্য ও শিল্পনীতি বাস্তবায়নের কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
প্রথমে বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ, পরে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের বিভিন্ন ধারা ব্যবহার করে নতুন তদন্ত শুরু— সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য কৌশলের পথে হাঁটছে।
এর অর্থ হলো, ভবিষ্যতে কোনও দেশের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে শুধু বাণিজ্য ঘাটতি নয়— শ্রম অধিকার, পরিবেশ, শিল্প সক্ষমতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের মতো বিষয়ও সমান গুরুত্ব পাবে।
বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি কোথায়: যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় একক বাজার। নতুন শুল্ক কার্যকর হলে বাংলাদেশি পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ভিয়েতনাম, ভারত, মেক্সিকো কিংবা মধ্য আমেরিকার বিকল্প সরবরাহকারীদের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
একইসঙ্গে নতুন ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। রফতানি আয় কমলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগও প্রভাবিত হতে পারে। বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের প্রাক্কালে এ ধরনের চাপ বাংলাদেশের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
আরেকটি তদন্তও চলছে: জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুর পাশাপাশি বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে ‘স্ট্রাকচারাল এক্সেস ক্যাপাসিটি’ বা অতিরিক্ত শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা নিয়েও পৃথক তদন্ত করছে ইউএসটিআর।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূলত তৈরি পোশাক ও সিমেন্ট শিল্পকে এই তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা বিশ্ববাজারে মূল্য বিকৃতি তৈরি করছে। যদিও বাংলাদেশের দাবি, শিল্প সম্প্রসারণ হয়েছে বৈশ্বিক চাহিদা ও বেসরকারি বিনিয়োগের কারণে, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির কারণে নয়।
এখন করণীয় কী: বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে কেবল কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। একই সঙ্গে শ্রমমান, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা এবং কমপ্লায়েন্স বিষয়ে তথ্যভিত্তিক প্রস্তুতি আরও জোরদার করতে হবে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি ইউএসটিআরের তদন্তে প্রয়োজনীয় তথ্য ও ব্যাখ্যা দ্রুত উপস্থাপন করতে হবে, যাতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনও ভুল ধারণা তৈরি না হয়।
নতুন বাস্তবতার মুখে বাংলাদেশ: বিশ্ব বাণিজ্যের বর্তমান বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন শুধু কম দামে পণ্য উৎপাদন করলেই আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখা সম্ভব নয়। দায়িত্বশীল উৎপাদন, শ্রমিকের অধিকার, পরিবেশগত মান, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স— সব কিছুই রফতানি সক্ষমতার অংশ হয়ে উঠছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইউএসটিআরের তদন্ত বাংলাদেশের জন্য যেমন একটি সতর্কবার্তা, তেমনই নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরারও সুযোগ। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে সরকার, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং রফতানিকারকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় রফতানি বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নতুন করে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে। উৎস: বাংলাট্রিবিউন।